স্মরণ

সম্ভবামি যুগে যুগে

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মিহির রঞ্জন তালুকদার

‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাতœানং সৃজাম্যহম্। পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্। ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।’ অর্থাৎ পৃথিবীতে যখনই ধর্মের গ্লানি হয় এবং পাপ বৃদ্ধি পায়, তখনই আমি শরীর ধারণ করিয়া পৃথিবীতে অবতীর্ণ হই। আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হইয়া সাধুদিগের পরিত্রাণ, পাপিদের বিনাশ এবং ধর্ম সংস্থাপন করি।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল দ্বাপর যুগে ৩২২৮ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে ১৮ জুলাই। হিন্দু পঞ্জিকা মতে, সৌর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে যখন রোহিণী নক্ষত্রের প্রাধান্য হয়, তখন জন্মাষ্টমী পালিত হয়। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের মতে, প্রতি বছর মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য সেপ্টেম্বরের মধ্যে জন্মাষ্টমীর উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এ বছর ২ সেপ্টেম্বর জন্মষ্টমী পালন করা হচ্ছে। পৃথিবীতে যখন অন্যায়, অত্যাচার বেড়ে যায় তখনই ভগবান বা ঈশ্বর কোনো না কোনো রূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। তেমনি দ্বাপর যুগের রোহণী নক্ষত্রের অষ্টমী তিথিতে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। অধর্ম, অন্যায়, অত্যাচার থেকে দেশকে রক্ষা করতে এবং কংস আর জরাসন্ধের মতো অত্যাচারী রাজাদের দমন করার জন্য দ্বাপর যুগের আজকের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।

বস্তুত পৃথিবী থেকে অধার্মিক ব্যভিচারী ও দুষ্ট লোকদের দমন করে মানবপ্রেম সৃষ্টি এবং শিষ্টের রক্ষা করার জন্যই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মহাবতার রূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। আবার পৃথিবীতে ধর্মের মহিমা এবং ভক্তের প্রতি ভগবানের প্রেমের মহিমা বাড়ানোর জন্যই শ্রীকৃষ্ণ ও রাধা মর্তে মানবরূপে জন্ম নিয়েছিলেন। এ জন্যই তিনি সবার কাছে প্রেমাবতার নামেও পরিচিত।

তখন মথুরার রাজা ছিলেন উগ্রসেন এবং তার ছেলে ছিলেন কংস। রাজা উগ্রসেন ছিলেন ধার্মিক কিন্তু কংস ছিলেন অধার্মিক ও অত্যাচারী। কংসের বোন দেবকীর বিয়ের পর তাকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাওয়ার পথে কংস দৈব বাণীতে শুনতে পায়, দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতেই কংসের মৃত্যু হবে। তাই কংস দেবকী ও তার ভগ্নিপতি বাসুদেবকে কারাগারে বন্দি করে রাখেন এবং একে একে তাদের সপ্তম সন্তানকে হত্যা করেন। উল্লেখ্য, কংস তার পিতা উগ্রসেনকে বন্দি করে রাজা হয়েছিলেন। অবশেষে পাপী কংসকে বধ করার জন্য কৃষ্ণ দেবকী ও বসুদেবের সন্তান হিসেবে কারাগারেই জন্মগ্রহণ করেন। তখন অলৌকিকভাবে তারা শৃঙ্খলমুক্ত হলেন এবং কারারক্ষীরাও সবাই ঘুমিয়ে পড়লেন। জন্মমাত্র বসুদেব গোপনে কৃষ্ণকে অনেক দূরে বৃন্দাবনে জনৈক নন্দ গোপের ঘরে রেখে তার মেয়েকে নিয়ে আসেন। সেখানেই দৈব ইচ্ছায় পদ্মার গর্ভে জন্ম নেয় রাধা। বালিকা বয়সেই আয়ান গোপের (ঘোষের) সঙ্গে রাধার বিয়ে হয়। আয়ান গোচারণে গেলে বড়ায়ি (আয়ানের পিসি) রাধার দেখাশোনা করতেন।

অন্যদিকে কংস ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। শিশুকালেই শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য পতুনা রাক্ষসকে পাঠিয়ে বৃন্দাবনের সব শিশুকে হত্যা করে, অবশেষেই শিশু কৃষ্ণের হাতেই পতুনা রাক্ষসীর মৃত্যু হয়। এভাবে বিভিন্ন উপায়ে শ্রীকৃষ্ণকে মারার পরিকল্পনা করতে থাকেন কংস।

অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন শ্রীকৃষ্ণকে বাড়িতে ডেকে এনে হত্যা করবেন। তাই কংস অংকুরকে পাঠালেন শ্রীকৃষ্ণকে নিমন্ত্রণ করতে। শ্রীকৃষ্ণ ও তার বড় ভাই বলরাম নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে মথুরার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেন এবং পথিমধ্যে শ্রীকৃষ্ণ রাধার সঙ্গেও দেখা করলেন। রাধাকে দেখে অংকুর শ্রীকৃষ্ণের কাছে রাধার পরিচয় জানতে চাইলে শ্রীকৃষ্ণ বলেন, ‘এ হচ্ছে রাধা, জগতে সবাই আমার কাছে আসে কিন্তু আমি তার কাছে যাই’ এখানে রাধার প্রতি শ্রীকৃষ্ণের অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রকাশ পায়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধর্মের মহিমা বাড়ানোর পাশাপাশি পৃথিবীতে প্রেম আর ভালোবাসার এক গভীর দৃষ্টান্তও স্থাপন করে গেছেন। রাধা কৃষ্ণের অমর প্রেম কাহিনিতে তাদের অনেক লীলাও আমরা জানি। যেমন রাধা ও অন্য গোপীরা যখন যমুনাতে জল আনতে যায়। কৃষ্ণ যমুনার জলে নেমে হঠাৎ ডুব দিয়ে আর ওঠে না। সবাই মনে করে কৃষ্ণ ডুবে গেছে। এদিকে কৃষ্ণ লুকিয়ে কদমগাছে বসে থাকে। রাধা ও সখীরা জলে নেমে কৃষ্ণকে খুঁজতে থাকে। কৃষ্ণ নদীতীরে রাধার খুলে রাখা হার চুরি করে আবার গাছে গিয়ে বসে।

বৃন্দাবনে যমুনা নদীর জল ছিল খুবই বিষাক্ত। এ নদীতে কেউ কোনো কাজ করতে পারত না। কারণ সেখানে বাস করত কালিয় নামে এক বিষধর, যার নাম ছিল কালিয়নাগ। শ্রীকৃষ্ণ কালিয়নাগকে দমন করার জন্য বন্ধুদের যমুনা থেকে তাদের ফেলে দেওয়া খেলার বল এনে দেওয়ার কথা বলে জলে ঝাপ দেয়। শ্রীকৃষ্ণ কালিয়নাগকে বস করে এবং তাকে এ স্থান ছেড়ে দক্ষিণ সাগরে চলে যেতে বলে। কৃষ্ণ যখন যমুনায়র জলে ঝাপ দেয়, তখন রাধার বিশেষ কাতরতা প্রকাশ পায়। আবার রাধাকে আকৃষ্ট করার জন্য সময়-অসময়ে কৃষ্ণ বাঁশি বাজাত। এদিকে শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম মথুরায় এসে উপস্থিত হলেন, তখন কংসের নির্দেশে তাদের পাগলা হাতির সামনে নিয়ে যাওয়া হলো কিন্তু হাতি তাদের কিছুই করল না। তখন কংস খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ল এবং তাদের মথুরার বড় বড় মল্লযুদ্ধাদের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করা হলো। বড় বড় মল্লযুদ্ধারা সবাই শ্রীকৃষ্ণ ও বলরামের শক্তির সঙ্গে পরাজিত হলো। এ দেখে কংস রাগে ক্ষোভে জ্বলছিল। তখন শ্রীকৃষ্ণ কংসের মঞ্চের ওপর লাফিয়ে উঠে কংসের চুলের মুঠি ধরে মাটিতে নামিয়ে এনে কংসকে হত্যা করে। পরে শ্রীকৃষ্ণ তার বাবা-মাসহ উগ্রসেনকে মুক্ত করে তাকে রাজ্য ফিরিয়ে দিলেন।

এ ঘটনার পর কংসের শ্বশুর জরাসদ্ধ শ্রীকৃষ্ণের প্রতি খুবই কুদ্ধ ছিলেন। তাই পরে শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করাই হয়ে উঠেছিল মূল লক্ষ্য। তাই জরাসদ্ধ বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে বারবার মথুরা আক্রমণ করত এবং বারবারই পরাজিত হতো। পরে একবার শ্রীকৃষ্ণ দৈব অস্ত্রের সহায়তায় জরাসদ্ধকে বন্দি করে। বলরাম তাকে হত্যা করতে চাইলেও শ্রীকৃষ্ণ তাকে ছেড়ে দিলেন। এর পরও জরাসদ্ধ বারবার মথুরা আক্রমণ করত। অবশেষে শ্রীকৃষ্ণ অতিষ্ঠ হয়ে ভীমকে সঙ্গে নিয়ে জরাসদ্ধকে হত্যা করেছিল। এভাবেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীতে ধর্ম স্থাপনের জন্য অনেক অধার্মিককে হত্যা করেছে। পৃথিবীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হয়ে অনেক দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করেছিলেন। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সব অন্যায়-অত্যাচার দূর হয়ে পৃথিবীতে নেমে আসুক সুখ ও শান্তি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথিতে এই আমাদের প্রার্থনা।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

"