পর্যালোচনা

শিশু ও ডিজিটাল স্ক্রিন

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

অলোক আচার্য

প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের আচরণ ও অভ্যাসে পরিবর্তন আসছে। সেই পরিবর্তন কতটা ইতিবাচক, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। যুগের অগ্রগতি চলতেই থাকবে কিন্তু সেই সঙ্গে যেন নৈতিকতা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি না থাকে, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। দুই থেকে তিন দশক আগেও যখন একটি শিশু জন্ম নিত, তখন সেই শিশু প্রকৃতির স্পর্শ পেত। সে বড় হতো প্রকৃতির স্পর্শে। তার খেলার সাথি হতো গাছপালা, নদী, পুকুর, ফুল ও পাখি এসব। ফলে শিশুর মনোবিকাশ ঘটার কৌশল ছিল এক রকম। কিন্তু আজ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার ব্যতিক্রম ঘটছে। খেলার জন্য সে জায়গাও খুঁজে পাওয়া কঠিন আর পেলেও সেসব খেলায় আগ্রহ নেই বললেই চলে। এখন জন্মের পর শিশু মোবাইল, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপকে বিনোদনের প্রধান উপকরণ হিসেবে চিনতে শেখে। এ জন্যই খুব ছোটবেলা থেকেই এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা বেশ দক্ষ হয়ে ওঠে। তবে স্মার্টফোন কম্পিউটারের ক্ষুদ্র সংস্করণ হয়ে হাতে হাতে উঠে এসেছে। কম্পিউটারের যুগ থেকে বেরিয়ে আমরা এখন মূলত স্মার্টফোন যুগে প্রবেশ করেছি। আগের চেয়ে বেশি একা, আত্মকেন্দ্রিক এবং অহংকারী।

আজকাল উঠতি বয়সী সব ছাত্রছাত্রীর হাতেই স্মার্টফোনের দেখা মেলে। যার সবই এন্ড্রোয়েটচালিত। ছোটখাটো একটা কম্পিউটার নিয়ে ওরা সব সময় ঘুরে বেড়ায়। মোবাইল ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক সময়কালীনই অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এই বয়সী ছেলেদের মোবাইল ব্যবহারের কারণ তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ নয়। এরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমস এসবই বেশি অভ্যস্ত। ট্যাবলেট বা ল্যাপটপ ও ডেক্সটপেও এরা গেম খেলাতেই বেশি আগ্রহী। এক প্রকার মা-বাবার সঙ্গে জিদ করেই তারা এসব প্রযুক্তি আদায় করে। অনিচ্ছা থাকলেও মা-বাবাও কিনে দেন। মোবাইল ফোনেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেম খেলে যায়। চোখ একটুর জন্য সরে না। এতটা নেশায় পেয়ে বসে এ সময়। এটা কিছুটা নেশার মতো হয়ে গেছে বলে অভিভাবকরাও আজকাল খুব বকাঝকা করেন না। আবার এমন অনেক অভিভাবক আছেন যারা সন্তানের বাইরে খেলাধুলাকে বেশি সমর্থন করেন না। তার থেকে তারা মনে করেন তার সন্তান বাড়িতেই থাকুক। তার আশপাশেই থাকুক। বাইরে আজকাল অনেক বিপদ। সেসব আগাম বিপদের কথা চিন্তা করেই মূলত তাদের এ রকম সিদ্ধান্ত। তারা যেসব গেম খেলে সেসব গেমের প্রায় সবই উত্তেজনাকর।

গেমসের প্রতিটি ধাপে তাদের জন্য বিস্ময় অপেক্ষা করে। তারা একের ভেতর একধাপ পার হয়। তারপর আবার গেমসের ভেতরে পয়েন্ট। যত পয়েন্ট তত ধাপ এগোবে। বাসে, রেলে যেখানেই তাকান, দেখা যাবে উঠতি বয়সী পড়–য়া ছেলেমেয়েরা মোবাইলে গেমস খেলায় ব্যস্ত। এসব অনেক গেমসই আত্মঘাতীও করতে পারে। আত্মঘাতী না হলেও সন্তান মানসিক বৈকল্য হতে পারে। সে নিজেকে ভিষণভাবে নিঃসঙ্গ মনে করে এবং চরমভাবে নিজেকে মোবাইল বা প্রযুক্তিনির্ভর মনে করে। এর বাইরেও যে একটি জগৎ আছে, প্রকৃতিও যে খেলার সাথি হতে পারে, সে বিষয়টি এ প্রজন্ম পুরোপুরিই ভুলতে বসেছে। কিছুদিন আগে ব্লু হোয়েল নামের একটা গেম নিয়ে দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। ব্লু হোয়েল নামটি নীল তিমি থেকেই এসেছে বলে ধরা হয়। এসব গেম নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু একটা গেম যদি সরাসরি কারো মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রসঙ্গটা ভিন্ন। এই গেমটির শেষ পরিণতি নাকি আত্মহনন। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ গেমের সমাপ্তি হয়। সত্যি খুব অবাক হলাম যে, এই গেম তৈরির উদ্দেশ্যই ছিল মৃত্যু। এই গেম খেলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কয়েক শ কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যা করেছে। এমনকি আমাদের পাশের ভারতেও এই গেম খেলে আত্মহত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। আমাদের দেশেও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল। তারপর থেকে অভিভাবকরা সচেতন হয়েছে। আমার দৃষ্টিতে এটি বিশ্বের ভয়ংকরতম খেলার একটি। মোট কথা, এ গেমসগুলোই বিভিন্নভাবে আমাদের শিশুদের মনোজগতে ক্ষতি করে। এই গেমসটির মতো আরো একটি গেমস রয়েছে, যেটিকে বেশ মারাত্মক বলেই বিশ্লেষকরা বলছেন। মোমো নামের একটি গেমস খেলে পাশের দেশ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে হইচই হয়েছে। কয়েক শিশুর মনোবিকৃতি এবং কেউ কেউ আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছে। সে দেশের একটি সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। আমরা যেহেতু পাশের দেশ তাই আমাদের বেশ সতর্ক থাকতে হবে। কোনো অঘটন ঘটার আগেই বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে আগেই সতর্ক হওয়া উচিত। এ রকম একের পর এক আত্মঘাতী গেমস আসতেই থাকবে। আর যদি তা আত্মঘাতী না-ও হয়, তাও পড়ালেখা বন্ধ করে সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে স্ক্রিনে গেমস খেলাটাও এক ধরনের অভ্যাসের ভেতর পড়ে। যার কারণে শিশুর মনে বিরূপ প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।

আমেররিকান একাডেমি অব পেডিকস্ট্রিকস ২ থেকে ৫ বছরের শিশুদের ডিজিটাল স্ক্রিনের প্রতি সময়সীমা ৬০ মিনিট নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাদের মতে, সব শিশু বা ছোটদের যেকোনো উপায়ে প্রযুক্তির আসক্তি থেকে দূরে রাখতে হবে। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ উন্নত করা দেশটি শিশুদের প্রযুক্তির আসক্তির দিকটি বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি যে শিশুর জন্য মঙ্গলজনক নয়, তা আমাদেরও বুঝতে হবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা তুলনামূলকভাবে কম ঘুমায় এবং স্মার্ট ডিভাইসের সঙ্গে অধিক সময় ব্যয় করে। গবেষণায় আরো দেখা যায়, প্রতি এক ঘণ্টায় প্রায় ১৫ মিনিট স্মার্ট ডিভাইস শিশুদের দখলে থাকে, এ কারণে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের ঘুম নষ্ট করে। অন্য একটি গভেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ সময়ই শিশুরা স্মার্ট ডিভাইসের প্রতি আসক্ত থাকে। এ ধরনের শিশুরা অনেক দেরিতে কথা বলতে শিখে। এই প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমাদের দেশেও মোবাইলে শিশুর আগ্রহ এবং সময়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্মার্টফোনের পর্দায় শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বর্তমান সময়ে মা-বাবার ব্যস্ততাও থাকে বেশি। শিশুর বেড়ে ওঠার দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময়ও থাকে কম। তা ছাড়া বাইরে শিশু বের হলেই থাকে বিপদের সম্ভাবনা। রাস্তা পারাপার, পাচারকারীর কবলে পড়া, চাঁদাবাজির শিকার হওয়াসহ এ রকম আরো অনেক বিপদের আশঙ্কা থাকে। তা ছাড়া পড়ালেখার ক্ষতি হবে বলে মনে করেন অনেক অভিভাবকরা। এসব কারণে সন্তানের বাইরে গিয়ে খেলাধুলা করাটা পছন্দ করেন না। তা ছাড়া আমাদের খেলার মাঠগুলোও চলে যাচ্ছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দখলে। ফলে খেলার জায়গায়ও সীমিত। এর ফলে শিশু মুক্ত মাঠে খোলা আকাশের নিচে ঘুরে বেড়াতে ভুলে যাচ্ছে। যন্ত্রনির্ভর একটা জীবন নিয়ে এরা বড় হয়ে উঠছে। বড় হয়েও যখন তারা বন্ধুদের সঙ্গে বসে কোথাও আড্ডা দেয়, তাহলেও তারা চোখটা স্মার্ট ডিভাইসেই রাখে।

বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর যুগ। আমরা এই যুগে প্রযুক্তির বাইরে থাকতে পারব না। সন্তানদেরও প্রযুক্তির বাইরে রাখতে পারব না। কারণ জন্ম নেওয়ার পর যখন বেড়ে ওঠে, তখন তার চারপাশে প্রযুক্তির ব্যবহার দেখে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শিশুর সেখানে আগ্রহ জন্মে। আগ্রহ থেকেই সে মোবাইল ট্যাবের স্ক্রিনে চোখ রাখে। তারপর বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে সে প্রযুক্তির সাহচর্য পায়। দিনের অধিকাংশ সময়ই মোবাইলেই তার সময় কেটে যায়। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক

ভয়াবহ নিঃসঙ্গতা নিয়ে বড় হবে, তা হতে দেওয়া যায় না। এরপর আবার মাঝেমধ্যেই আত্মহত্যায় প্ররোচনাদানকারী গেমস শিশু-কিশোর মনে প্রভাবিত করে জীবন ধ্বংস করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটবে। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে, সাবধান হতে হবে। সন্তানকে বড় হয়ে ওঠার সুন্দর পরিবেশ দিতে হবে। এটাই হোক আজকের মা-বাবার স্বপ্ন এবং বাস্তব চিন্তাসূত্রে অনুশীলন।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

"