মতামত

নারীর ক্ষমতায়নে সরকার

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আবুল বাশার শেখ

বর্তমানে বাংলাদেশে নারীরা ভূমিকা রাখছেন কৃষিতে, কল-কারখানায়, প্রশাসন ও পোশাকশিল্পে, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ক্রীড়া, সাংবাদিকতা, জাতিসংঘ শান্তি মিশন এবং সবশেষ পর্বতারোহণের মতো চ্যালেঞ্জিং উদ্যোগেও। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সরকার সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এখন প্রতিবেশী দেশ থেকে অনেক এগিয়ে।

নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিবেচনা করা যায়। প্রথমত, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন যার মাধ্যমে নারীর অর্থনীতির মূল ধারায় পূর্ণ অংশগ্রহণকে বোঝায়। এতে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হয় তার মধ্যে অন্যতম হলোÑসিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা, যেকোনো ভালো কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ, পরিবারকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় যে কোনো কাজে পুরুষের মতো সমান সুযোগ লাভের অধিকার ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত, সামাজিক ক্ষমতায়ন বলতে নারীর ব্যক্তিগত অধিকারকে বোঝানো হয়, গ্রামগঞ্জে এখনো সালিসে নারীদের মতামতের কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এ অবস্থা থেকে দ্রুতই বেরিয়ে আসতে হবে নিরপেক্ষ সমাজব্যবস্থার স্বার্থেই। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, যার মাধ্যমে নারীরা পুরুষদের মতো রাজনৈতিক দলগুলোয় সমান সুযোগ লাভের অধিকার পায়।

নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের সরকার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদে মাত্র ১৫ জন নারী সংসদ সদস্য ছিলেন, ১৯৯৭ সালে স্থানীয় সরকার আইনে সাধারণ আসনে নারীর প্রার্থী হওয়ার অধিকার অক্ষুণœ রেখে প্রতি ইউনিয়নে তিনটি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধান রাখায় তৃণমূলে নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ তৈরি হয়। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে স্বাধীনতার পর থেকে নারীরা ধীরে ধীরে সফলতা লাভ করেছেন। ১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে মাত্র পাঁচজন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন কিন্তু বর্তমানে সংসদে ৭২ জন নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন, যার মধ্যে ২২ জন সরাসরি প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। বর্তমান সংসদে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ উপনেতা, স্পিকার এবং বিরোধীদলীয় নেত্রীসহ চারজন মন্ত্রী নারী থাকা সত্ত্বেও সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনে কেন্দ্র থেকে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে দেওয়া হলেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল অতীব নগণ্য। সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার সময়ও নারীর তুলনায় পুরুষের ব্যাপক প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়।

রাজনৈতিক দলগুলোর চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের ১০ জন সদস্যের মধ্যে ৩ জন নারী এবং দলটির সভাপতিও একজন নারী। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ১৭ জন, যার মধ্যে নারী সদস্য মাত্র ১ জন, যদিও দলটির সভাপতি একজন নারী। অন্যদিকে বর্তমান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামের সদস্য ৩৯ জন, নারী সদস্য মাত্র ৪ জন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে নারীকর্মীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের মেধাবী নারীকর্মীর লক্ষ্যে গরিব মেধাবীদের বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। আইটি খাতে নারীদের উপস্থিতি বৃদ্ধিতে আইটি পার্কগুলোয় নারীদের সর্বোচ্চ সুযোগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিগত বছরে গ্রামপর্যায়ে নারীদের প্রয়োজনীয় কিছু শিক্ষা ও সহযোগিতা করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল জেন্ডার গেস রিপোর্ট অনুযায়ী নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে সপ্তম স্থানে। বর্তমানে বিচারপতি, সচিব, উপাচার্য, ডেপুটি গভর্নর, রাষ্ট্রদূত, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মানবাধিকার কমিশনসহ ক্ষেত্রে নারীরা কাজ করছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখ নারী। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১৬,৬৯৭ জন। বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ৭৬ লাখ প্রবাসীর মধ্যে ৮২,৫৫৮ জন নারী। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধানতম ক্ষেত্র গার্মেন্ট খাতের ৮০ ভাগ কর্মীই নারী। দেশের ৯০ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণ ব্যবহারকারীও নারী। নানা প্রতিকূলতা, বাধা ডিঙিয়ে নারীরা এখন কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ যোগ্যতা এবং প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগকে প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি করছেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা সংস্থা ‘দ্য স্ট্যাটিসটিক্স’ তাদের প্রতিবেদনে বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে মনোনীত করেছেন। নারীশিক্ষা ও নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রগতি অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ‘গ্লোবাল সামিট অব উইমেন’-এর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ’ অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের সভায় নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ এবং ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ দুটি বড় অর্জন।

বর্তমান সরকার সামাজিক নিরাপত্তা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মেইনস্ট্রিমে নিয়ে আসার জন্য বহুমুখী প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। গ্রামের নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য সরকারের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া হয় মাত্র ৫ শতাংশ সেবা মূল্যের বিনিময়ে। নারী উদ্যোক্তারা ক্ষুদ্র উদ্যোগ তহবিলের ১০ শতাংশ এবং বাণিজ্যিক খাতের ১০ শতাংশ পেয়ে থাকেন। বর্তমানে ৩০ লাখের বেশি নারী কেবল তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। এ খাত থেকেই বৈদেশিক মুদ্রার অধিকাংশই আসে। নারী উদ্যোক্তারা এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল থেকে বিশেষ সুবিধাযুক্ত ১০ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছে। পুনঃঅর্থায়নে তহবিলের ১৫ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য। নারীরা ২৫ লাখ পর্যন্ত এসএমই ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন জামানতদার ছাড়াই।

পরিশেষে বলা যায়, নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সুস্থ, সুন্দর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় নারীদের আরো আত্মপ্রত্যয়ী, দেশের জন্য উদ্যোমী হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাবে। একই সঙ্গে নারীরা যাতে অবাধে সামনের দিকে আরো এগিয়ে যেতে পারে, তার জন্য সম্মিলিত সহযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই নারীর ক্ষমতায়ন হবে সফল ও সার্থক।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

basharpoet@yahoo.com

 

"