বিশ্লেষণ

প্রাকৃতিক জলাশয় সুরক্ষা

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

সম্প্রতি সবার ভ্রান্ত ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন ঢাকার সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফখরুল আলম সমর। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় দখল-দূষণে হারিয়ে যেতে বসা একটি খাল উদ্ধারে তিনি যে অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তা সত্যই প্রশংসার দাবিদার এবং প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সারা দেশে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ জয়নাবাড়ী খালটি দখল করে শতাধিক ভবন ও আধাপাকা স্থাপনা তৈরি করা হয়েছিল। ৩০ বছর ধরে দখলের এ প্রক্রিয়া চলে। এতে খালটির অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছিল। অথচ খালটিতে একসময় নৌকা চলাচল করত। জেলেরা মাছ ধরত। মানুষ গোসল করত এর স্বচ্ছ পানিতে। খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় জাদুরচর, মোল্লাপাড়া, জয়নাবাড়ী, হেমায়েতপুর, ব্যাপারীপাড়া, নন্দখালী, ভরালি, নিমেরটেক, সুগন্ধা হাউজিংসহ আশপাশের এলাকার কয়েক হাজার মানুষকে ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতে ওইসব এলাকার জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো। খাল দখল করে বিভিন্ন দোকানপাট ও ঘরবাড়ি নির্মাণ করে সাধারণ মানুষকে ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত প্রভাবশালীরা। ইউপি নির্বাচনের সময় ফখরুল আলম সমর ভোটারদের এ খাল উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতি পূরণে তিনি প্রথমে অবৈধভাবে নির্মিত শতাধিক ভবন ও আধাপাকা স্থাপনা চিহ্নিত করার কাজটি করেন নির্মোহভাবে। বল প্রয়োগ ছাড়া অবৈধ স্থাপনা অপসারণে মালিকদের নিয়ে বৈঠক করেন একাধিকবার। খাল ভরাটের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বুঝিয়ে তাদের স্থাপনা অপসারণের রাজি করান। অনেক মালিক নিজেরাই স্থাপনা সরিরে নেন। আবার পরিষদ থেকেও অনেক স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। খালটি প্রভাবশালীদের হাত থেকে দখলমুক্ত করায় চেয়ারম্যানের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে এলাকাবাসী। এ বিষয়ে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফখরুল আলম সমরের বক্তব্য হলোÑপর্যায়ক্রমে হেমায়েতপুর এলাকায় সব সরকারি খাল উদ্ধার করা হবে। খাল দখলকারীদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হবে।

নদীকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর ইতিহাস গড়ে উঠেছে। প্রাচীনকাল থেকে নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সভ্যতা। নদী ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মোচন করে। এই নদীকে রক্ষা করা সবারই কর্তব্য। নদী আমাদের মা। নদী রক্ষার প্রয়োজনে আর একটা যুদ্ধ করতে হবে। নদী আন্দোলন ব্যর্থ হলে দেশের উন্নয়ন ব্যর্থ হবে। সম্প্রতি ‘রিভারাইন পিপল’ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজনে ‘নদী রক্ষায় তরুণদের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হালদার এসব কথা বলেন। তার মতে, তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নদী রক্ষা আন্দোলনকে সফল করে তুলতে পারে। নদী রক্ষা ইস্যুতে কারো কাছে মাথা নত নয়। কাউকে নদী দখল করতে দেওয়া নয়। নদী রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। স্বাধীনতার পর দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ছিল ১৩০০টি। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭০০টিতে। এর মধ্যে প্রবাহমান নদীর সংখ্যা সাড়ে তিনশ’র বেশি হবে না। তাই ঢাকার আশপাশ এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত দূষণ রোধে জরুরি ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া দরকার। পাশাপাশি তা ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করাও জরুরি। নদী রক্ষায় সরকারের কাছে ১৬ দফা সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন। সংগঠনটির স্বল্পমেয়াদি সুপারিশের মধ্যে রয়েছেÑ নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-কৃত্রিম লেক, সমুদ্রসৈকতে ইঞ্জিনচালিত নৌকার পোড়া মবিল, তেল, গৃহস্থালি বর্জ্য, হাটবাজার, রাস্তাঘাটের ময়লা-আবর্জনা, প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ইত্যাদি ফেলা বন্ধ কল্পে আইনগত পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নদী সীমানা রক্ষায় স্থায়ী সার্ভে কমিটি গঠন করে তিন মাস অন্তর নদীর পাড় সরেজমিনে পরিদর্শনপূর্বক নৌমন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদফতর ও পরিবেশবাদী সংগঠনের কাছে রিপোর্ট জমা দেওয়া এবং অবৈধ দখল থেকে নদী রক্ষায় দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

স্থানীয় সরকার গবেষকদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালিত হলে, বাংলাদেশে এনজিওগুলোর কাজ করার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। স্থানীয় সরকারের তৃণমূলে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ। ইউনিয়ন পরিষদের আছে ১০টি বাধ্যতামূলক ও এবং ৩৮টি ঐচ্ছিক কাজ। ইউনিয়ন পরিষদের ১০টি বাধ্যতামূলক কাজের মধ্যে, জনগণের সম্পত্তি যথাÑরাস্তা, ব্রিজ, বাঁধ, খাল, টেলিফোন, বিদ্যুৎ ইত্যাদি সংরক্ষণ করা অন্যতম। এ ছাড়া ঐচ্ছিক কাজের মধ্যে আছে, ইউনিয়নের পরিচ্ছন্নতার জন্য নদী, বন, ইত্যাদির তত্ত্বাবধান, স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থার উন্নয়ন। সরকার ইউনিয়ন পরিষদকে প্রাকৃতিক জলাশয় রক্ষার জন্য যতেষ্ট ক্ষমতা প্রদান করেছে। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। প্রাকৃতিক জলাশয় বিশেষ করে দেশের খাল-বিলগুলো এক শ্রেণির প্রভাবশালী, ভূমিখোর ও আবাসন ব্যবসায়ীদের ভরাট, দখলের কারণে আশপাশের জনবসতিগুলোয় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তাঘাট বিনষ্ট হচ্ছে। ময়লা-আবর্জনা ও পয়োবর্জ্য মিশে দূষিত হচ্ছে পানি ও পরিবেশ। ডায়রিয়া, কলেরা ও জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট যাটজটের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে মানুষের অবর্ণনীয় সমস্যা। এ ছাড়া এক শ্রেণির অতিলোভী শিল্পপতিরা ইটিপি ব্যবহার বন্ধ রেখে শিল্প-কারখানার তরল বর্জ্য সরাসরি নিক্ষেপ করছে নিকটবর্তী খাল-বিলে। এতে খাল-বিলের পানি দূষিত হয়ে মারা যাচ্ছে মাছ, জলজপ্রাণি ও উদ্ভিদ। বিনষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। এসব খাল-বিলের দূষিত পানি বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে পাশের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। বিপদে পড়ছে গ্রামের নিরীহ কৃষক। জলাশয় ভরাটের কারণে বৃষ্টির পানি দ্বারা ওইসব এলাকার ভূনিম্নভাগ রিচার্জের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে এবং পানির স্তর প্রতি বছরই ক্রমান্বয়ে নিচে চলে যাচ্ছে। এতে সুপেয় পানির সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ভূপৃষ্ঠের নিম্নভাগ থেকেও সুপেয় পানি পাওয়া করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে।

নদীর অবৈধ দখল, পানি ও পরিবেশদূষণ, শিল্পকারখান কর্তৃক সৃষ্ট নদীদূষণ, অবৈধ কাঠামো নির্মাণ ও নানাবিধ অনিয়ম রোধ কল্পে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নদীর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং নৌ-পরিবহনযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজনে নবগঠিত নদী রক্ষা কমিশন সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করবে। শুধু সুপারিশের মাধ্যমেই কি দেশের প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো রক্ষা করা সম্ভব হবে? জেলা নদী রক্ষা কমিটি নদী রক্ষায় কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তাও আমাদের ভেবে দেখতে হবে। যেহেতু প্রত্যেকটি প্রাকৃতিক জলাশয়ই কোনো না কোনো স্থানীয় ইউনিটে অবস্থিত এবং ওই স্থানীয় ইউনিটই হলো জনগণের নিকটবর্তী সরকার, তাই প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোকে প্রাকৃতিক জলাশয় রক্ষার একক ক্ষমতা প্রদান ও জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। এ জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশেনের মেয়রগণকে সভাপতি করে প্রাকৃতিক জলাশয় সুরক্ষা কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটি স্থানীয় জনগণের সহায়তায় প্রাকৃতিক জলাশয় সুরক্ষা, দখল ও দূষণমুক্ত রাখার ব্যাপারে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবে। এই আন্দোলনে স্কুল-কলেজের তরুণ শিক্ষার্থীসহ সব পেশার লোকজনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কমিটি অবৈধ দখলদারকে প্রকৃত তালিকা তৈরি করবে এবং স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতায় প্রাকৃতিক জলাশয় উদ্ধার ও সংরক্ষণে জন্য আলোচনা সভা, পোস্টার, লিফলেট বিতরণের মতো জনসচেতনতামূলক কাজ করবে। এ ছাড়া কমিটি অবৈধ স্থাপনা মালিকদের নির্দিষ্ট সময়ে স্থাপনা অপসারণের জন্য চিঠি দেবে এবং ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে অবৈধ স্থাপনা অপসারণের জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। এ ছাড়া প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে প্রাকৃতিক জলাশয়ে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য একটি শক্তিশালী স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকতে হবে। স্থানীয় ইউনিটের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ওই স্ট্রাইকিং ফোর্স জেলা প্রশাসকের অনুমোদন সাপেক্ষে অবেধ স্থাপনা উচ্ছেদের ব্যাপারে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে স্থাপনা উচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গে তার দুই তীর বাঁধাই এবং বৃক্ষরোপণ এবং রোপিতবৃক্ষ পরিচর্যারও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া যে যাই বলুক, দেশের প্রাকৃতিক জলাশয় সুরক্ষা করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

netairoy18@yahoo.com

 

"