মতামত

জনশক্তির অপচয় রোধে...

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

সাধন সরকার

বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’ কিন্তু সাংবিধানিক এই নিয়ম সব ক্ষেত্রে রক্ষা করা হচ্ছে কি? বর্তমানে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ১৮ থেকে ৩০বছর। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ বছর, নার্সদের ৩৬ বছর এবং চিকিৎসকদেরও ৩০ কছরের বেশি। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অধিদফতর ও বিভাগে ‘বিভাগীয় কোটায়’ বিভিন্ন চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনেক বেশি বয়সেরও বিধান আছে। কর্মের সুযোগের স্বাধীনতা তো সবার সাংবিধানিক অধিকার। তবে শুধু সাধারণের ক্ষেত্রে ভিন্ন নিয়ম কেন? এক দেশে দুই নীতি চলতে পারে না। আর ৩০ বছরের বেশি বয়সে (বিভিন্ন কোটায় ও পেশায়) চাকরিতে প্রবেশ করে যদি অন্যান্যরা রাষ্ট্রকে সেবা দিতে পারে তাহলে সাধারণ ছেলে-মেয়েরাও পারবে না কেন? বিশ^বিদ্যালয় বা কলেজের একাডেমিক লেখাপড়া শেষ করতে সেশনজট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রভৃতি কারণে ২৬ থেকে ২৭ বছর লেগে যায়। বর্তমানে অনার্স কোর্স ও ডিগ্রি কোর্সের মেয়াদও এক বছর করে বাড়ানো হয়েছে। অথচ সরকারি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির প্রজ্ঞাপনে আবেদন করার বয়স ২১ বছর রাখা হয়েছে; যা হাস্যকর! গড় আয়ু ৫০বছর ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ১৯৯১ সালে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ করা হয়। বর্তমানে গড় আয়ু প্রায় ৭২ বছর। গড় আয়ুর কারণ দেখিয়ে ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা ৫৭ থেকে বাড়িয়ে ৫৯ করা হয়েছে। আরো বাড়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। আবার ‘যুবনীতি-২০১৭’-তে যুবাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ রাখা হয়েছে। তাহলে কেন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ রাখা হবে? গত ২৬ বছরে (১৯৯১ সালের পর) চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা কয়েক দফা বাড়ানো হলেও দুঃখের বিষয় প্রবেশের বয়সসীমা বাড়েনি। যতই দিন যাচ্ছে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বেকারত্ব এখন এক গভীর ও জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭’ অনুসারে বর্তমানে প্রায় ২৭ লাখ বেকার। এদের প্রায় অর্ধেক অংশই স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ করা চাকরিপ্র্রত্যাশী। বেকারত্বের জ¦ালা সহ্য করতে না পেরে অনেকে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন! অনেকে সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। অনেক মেধা আবার বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়কালে বিভিন্ন পেশায় কর্মকর্তাদের অবসরের বয়স বেড়েছে, অথচ নিচের দিকে প্রবেশের বয়স বাড়েনি। ফলে ভারসাম্য না রাখার ফলে শুধু বেকারত্ব বেড়েছে ও বেড়েছে তরুণদের হতাশা। দেশের নীতিনির্ধারকরা জনসংখ্যাকে জনসম্পদ বলে আত্মতুষ্টি লাভ করলেও বাস্তবে এর বিপরীত অবস্থা দেখা যাচ্ছে। গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের উপরে উন্নীত হলেও বেকারের সংখ্যা কিছুতেই কমছে না। অনেকে একে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি বলে উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার! কিন্তু এই শিক্ষিত তরুণেরা দেশের বোঝা নয়, মূলত দেশের সম্পদ! বেকার নারী-পুরুষ হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছেন কিন্তু তারা পাচ্ছেন না। পরিবারের মা-বাবা হয়তো পড়াশোনা শেষ করা শিক্ষিত সন্তানের পথ চেয়ে বসে আসে কখন তারা পরিবারে স্বচ্ছলতা আনবে ও তাদের মুখে হাসি ফোটাবে। একজন বেকারের নিরব যন্ত্রণা কেউ অনুভব করে না, কেউ বোঝে না তাদের মনের কথা। বিশ^ তাদের শিক্ষিত সন্তানদের কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আর আমরা ৩০-এর দেয়াল তুলে দিয়েছি চাকরিপ্রত্যাশীদের ওপর। বেকার চাকরিপ্রার্থীরা তাদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ চায়। তারা তাদের মেধা কাজে লাগিয়ে দেশকে কিছু দিতে চায়। অভিজ্ঞতায় বলে, প্রায় সব চাকরির সার্কুলার থেকে শুরু করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে ২ থেকে ৩ বছর লেগে যাচ্ছে। আবার একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করতে করতে এবং চাকরির পড়াশোনা শুরু করতে করতে বয়স ৩০ পার হয়ে যাচ্ছে। ফলে চাকরিপ্রার্থীরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত চাকরি পাচ্ছেন না।

প্রায় সব ক্ষেত্রে উন্নত রাষ্ট্রকে অনুসরণ করলেও চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কেন উদাহরণ টানা হয় না? উন্নত সব দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ এর অধিক। উদাহরণস্বরূপ, পার্শ^বর্তী দেশ ভারতে ৩৫ বছর (রাজ্যভেদে এর বেশিও আছে), যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ৫৯ বছর, ফ্রান্সে ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ৪০ বছর, শ্রীলঙ্কায় ৪৫ বছর, মালয়েশিয়ায় ৩৫ বছর। তথ্যমতে, পৃথিবীর ১৬০টির অধিক দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ এর অধিক। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশই তরুণ ও কর্মক্ষম। কিন্তু সব তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কি কাজে লাগানো যাচ্ছে? একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করতে করতে এবং চাকরির পড়াশোনা শুরু করতে করতে বয়স ৩০ পার হয়ে যাচ্ছে। ফলে লক্ষ লক্ষ তরুণ চাকরি না পেয়ে বা কাক্সিক্ষত চাকরি না পেয়ে হতাশায় ভুগছেন। বাস্তবতা হলো, বর্তমানে লক্ষ লক্ষ ছেলে-মেয়ের উচ্চশিক্ষা আছে, সনদ আছে কিন্তু চাকরি নেই। অথচ আমরা মধ্যম আয়ের ও উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখছি! তরুণ-যুবকদের বেকার রেখে তাদের মেধার সদ্ব্যবহার না করে কোনো দেশ কী উন্নতি লাভ করতে পেরেছে? দিনে দিনে তরুণ শ্রমশক্তির অপচয় হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন করতে হলে সবার আগে মানবসম্পদের ক্ষেত্রে টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ালে বাড়তি টাকার অপচয়ও হবে না। সব চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ছিল, আছে ও থাকবে। যে যার মতো মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাবে। বিভিন্ন রাষ্ট্রে বেকার তরুণদের জন্য বেকার ভাতা চালু আছে। কিন্তু আমাদের দেশে বেকার ভাতা না হোক, অন্তত চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে তরুণদের বেকারত্বের হাত থেকে তো মুক্তি দেওয়া যেতে পারে! ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন, ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ প্রণীত ১৭টি ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ (এসডিজি) অর্জন ও সর্বোপরি উন্নত বাংলাদেশ গড়তে সব শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানো আবশ্যক। চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে তরুণ সমাজ। সম্প্রতি সব দিক বিবেচনা করে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার সুপারিশ করেছে জনপ্রসাশন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। আশার কথা, এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা শোনা যাচ্ছে। তরুণ সমাজের প্রাণের দাবি, সময়ের দাবি অতি দ্রুত চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩২ কিংবা ৩৩ নয় সরাসরি ৩৫ করা হোক (৪০তম বিসিএস সার্কুলারের আগেই)। এতে করে বেকারত্ব ঘুচবে, মেধার অপচয় বন্ধ হবে ও কাক্সিক্ষত অগ্রযাত্রায় দেশ এগিয়ে যাবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadonsarker2005@gmail.com

 

"