বিশ্লেষণ

পরাশক্তি হতে কি চীন প্রস্তুত

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

আবু তাহের

চীনের ইতিহাস অনেক পুরনো। খ্রিস্টপূর্ব ২০৭০ অব্দ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত (২ হাজার বছর) প্রায় ২৭টি সাম্রাজ্য চীন শাসন করেছে। এর মধ্যে বিশাল এলাকাজুড়ে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ও প্রতিপত্তি বিস্তার করে তাং সাম্রাজ্য। সপ্তম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত চীন ছিল বিশ্বের সবচেয়ে অগ্রসর সভ্যতা। কাগজ, ছাপাখানা, বারুদ, চীনামাটি, রেশম এবং দিকনির্ণয়ের কম্পাসÑ সবই চীনে প্রথম উদ্ভাবিত হয়। নৌ-বাণিজ্যে বিশ্ব দখলনীতি সে সময় থেকেই চীনের দখলে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন খুব দ্রুত তার সামরিক শক্তিতে অনেকদূর এগিয়েছে। আর তাদের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আচরণ একটি ভিন্ন ধরনের মডেল হিসেবে বর্তমান বিশ্বে উপস্থাপন করেছে। সর্বত্র এর লক্ষণগুলো পরিলক্ষিত হয়। অনেকের কাছে অদ্ভুত ঠেকলেও বর্তমানে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি। ইতিহাস অনেক সময় এই সুপার অর্থনীতির রেকর্ড রাখে না। বিশেষ করে বর্তমানে বিশ্বের অবস্থা দেখতে গেলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক অশান্তি এমনকি ইউরোপের ঘটনাগুলো। যেমনÑ ইতালিতে মার্চে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি, ব্রেক্সিট ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্যে চিরস্থায়ী অশান্তি, রাশিয়ার অস্তিত্বের জানান দেওয়া ইত্যাদি। আর এই পটভূমির বিপরীতে চীনের অবস্থান পাহাড়ের চূড়ায় প্রশান্তির একটি বাড়ির মতো মনে হয়।

চীন সম্পূর্ণ এক ভিন্ন নীতিতে এগোচ্ছে। যেখানে বিশ্ব মোড়লরা ছড়ি ঘোরাচ্ছে সেখানে চীন নীরবে তার শক্তি জানান দিচ্ছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তি অন্যতম চাবি এখন চীনের হাতে। তাই ওয়াশিংটনের পাশে নীরবে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন। দুই দশক আগেও যা ছিল কল্পনার বাইরে। একটা জিনিস যথেষ্ট স্পষ্ট, যদি কেউ চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো আশা করে, তবে তারা মারাত্মক আশাহত হবে। কারণ প্রায় চার দশক আগে সংস্কারের প্রথম যুগের থেকে চীন এটা পরিষ্কার করেছে যে তারা একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হতে চায় না। তাই তারা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মডেল ব্যবহার করতে চায়নি। ১৯৯০ ও ২০০০ এর দশকে তখন বহু প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারিত হয়েছিল। চীন ধীরে ধীরে একটি সুপার পাওয়ারে পরিণত হচ্ছে তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের অনুকরণে নয়। একটি দেশের সাংস্কৃতিক, প্রযুক্তিগত, সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রগুলোতে যখন অন্যদের ওপর বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তার করে তখনই তা পরাশক্তি বলে বিবেচিত হয়। আর চীন সে অবস্থানের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্ধী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে পৃথিবীর মহাশক্তি হিসেবে রয়েছে। কিন্তু কিছু বিষয় চীনকে পরবর্তী বিশ্ব মহাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। বর্তমানে চীনের বিমানের বিশাল বহর, বিরাট আকারের সব রণতরী আর পরমাণু শক্তির আধুনিকায়ন তার শক্তির অস্তিত্ব। সমসাময়িক সময়ে চীনের এ অপ্রতিরোধ্য ধাবমান অগ্রগতিই বলে দিচ্ছে একুশ শতকের মধ্যেই অর্ধেক বিশ্ব চলে আসবে চীনের মুঠোয়। চীন বর্তমানে ব্যবসা নীতিতে এগোচ্ছে। আর তাতেই আধিপত্য বাড়ছে প্রতিবেশী ও মিত্র দেশগুলোতে। পাকিস্তান, মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। এর মধ্যে শ্রীলংকা তো ‘চায়না কোলোনি’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে বিশ্ব মহলে। শুধু কি প্রতিবেশী দেশগুলোতে, বিশ্বের ও প্রান্তেও নোঙর ফেলেছে চীনের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের বহর। ওয়াশিংটন-ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন এবং ন্যাশনাল সায়েন্স বোর্ড তাদের দ্বিবার্ষিক ‘বিজ্ঞান ও প্রকৌশল সূচক’ প্রকাশ করেছে। বিস্তর তথ্য-উপাত্ত, গবেষণাসহ প্রকৌশলী নেভিগেশন ঘটনা এবং পরিসংখ্যান আছে তাতে। কিন্তু প্রতিবেদনটির প্রধান উপসংহারে এক জায়গায় ছিল, ‘চীন হয়ে উঠেছে একটি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত মহাযজ্ঞ।’ যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক, আসল সংখ্যাটি যে গতির সঙ্গে ঘটেছে তার জন্য যত উত্তেজনা।

এক চতুর্থাংশ শতাব্দী আগেও চীনের অর্থনীতি ছিল ক্ষুদ্র। আর তার উচ্চ কারিগরি সেক্টর শুধুমাত্র অস্তিত্ব হিসেবে ছিল। তারপর থেকে কী ঘটে চলছে? চীন দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি। চীন তার প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ঘটিয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উভয়ই বায়োমেডিকেল বিষয়ে আরো গবেষণা করে, চীন প্রকৌশল গবেষণা পরিচালনা করে। চীন তার প্রযুক্তিগত কাজের বাহিনীকে নাটকীয়ভাবে বিস্তৃত করেছে। ২০০০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রকৌশল ব্যাচেলর ডিগ্রি স্নাতকদের বার্ষিক সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫৯ হাজার থেকে ১ দশমকি ৬৫ মিলিয়ন। একই সময়ের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকগুলোর তুলনামূলক সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার থেকে ৭ লাখে ৪২ হাজার পর্যন্ত। বর্তমানে এমন কোনো পণ্য নেই যা এ দেশটি তৈরি করে না। আর এসব পণ্য রফতানির জন্য প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে নতুন বাণিজ্য পথ। হাজার হাজার মাইল দূরের আফ্রিকার কেনিয়া, সিয়েরা লিয়নেও এখন চীনের আধিপত্য। মোমবাসা থেকে নাইরোবি পর্যন্ত ৩ দশমকি ৮ বিলিয়ন ডলারের রেললাইন প্রজেক্টের কাজ করছে চীন। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজর কেনীয় শ্রমিক কাজ করে চীনের অধীনে। চীন পৃথিবীর শীর্ষ রফতানিকারক ও ট্রেডিং দেশ। তাই ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় শূন্য দশমকি ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রফতানি করে। চীনও আমেরিকার পূর্ববর্তী মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছে। এটি একটি বিশ্বব্যাপী বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিনিধিত্বমূলক একটি কার্যকর জনসাধারণের খেলা। ১৯৮৯ সালের পর থেকে চীনের অর্থনীতি ছড়িয়ে পড়েছে এবং সীমা অতিক্রম করেছে। বৈশ্বিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সন্দেহ, বিরোধ ও অনিশ্চয়তার একটি অবস্থার মধ্যে ক্রমশই পতিত হয়েছে; যা চীনের বেল্ট এবং রোড ইনিশিয়েটিভকে সামনে রেখে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৯ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় চীনের অবস্থান বা তার দাবি বিশ্বব্যাপী গভর্নেন্সে তার সঠিক স্থান। চীনও তার বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক নেতৃত্বকে হস্তান্তর করতে চায় না।

আর তাই বাণিজ্যিকভাবেই নয়, সামরিক ক্ষেত্রেও সমান তালে এগোচ্ছে চীন। যুক্তরােেষ্ট্রর দেখাদেখি অন্যের ভূখ-ে নিজেদের সেনাঘাঁটি বসানো শুরু করেছে চীন। আফ্রিকার জিবুতিতে বসিয়েছে, পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরেও আরেকটি বসানোর উদ্যোগ চলছে। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে উত্তর চীন সাগর, ভারত মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত নিজেদের প্রভাবের আওতায় নিয়ে এসেছে চীনা সামরিক বাহিনী। ভারত মহাসাগরজুড়ে কয়েক ডজন নৌবন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। চীনের ডিজিটাল পেমেন্ট মার্কেটটি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ৫০ গুণ বড়। চীনের রয়েছে দুটি বৃহত্তম ইন্টারনেট কোম্পানি, আলিবাবা গ্রুপ এবং টেনসেন্ট হোল্ডিংস। অনলাইন গেমিং, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ই-কমার্সের নেতারা রয়েছে এখানে। এ ছাড়াও বাণিজ্যিক ড্রোন বাজারের ৭০ শতাংশ থেকে বেশি নিয়ন্ত্রিত হয় চীন থেকে। আর তাই আমেরিকান কোম্পানি যেমনÑ ফেসবুক, গুগল তাদের বিভিন্ন নীতিতে পরিবর্তন এনে বারবার চীনা বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করেছে।

চীনের হঠাৎ এমন আগ্রাসী নীতির মূলে রয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চলতি বছরের মার্চেই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদের ব্যাপারে সংবিধানের যে বাধ্যবাধকতা তা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সম্রাট যেমন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ক্ষমতার মসনদ আকড়ে থাকেন, ঠিক একইভাবে আজীবন প্রেসিডেন্ট পদে থাকবেন তিনি। তার চিন্তা ও ভাবাদর্শও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন নিজের ভাবাদর্শ অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করতে সক্ষম হবেন তিনি। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে চীনকে শক্তিশালী দেখতে চান জিনপিং। একইসঙ্গে সামরিক ক্ষেত্রেও উচ্চাশা পোষণ করেন তিনি। কিন্তু এতকিছুর পরেও চীনের পরাশক্তি হওয়ার জন্য বিশ্বব্যাপী যে সমর্থন প্রয়োজন, তা বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের অংশটি ১৯৪৪-এর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্রাটন উডস কনফারেন্সের কারণে ছিল, যেখানে সারা বিশ্ব থেকে প্রতিনিধিরা সম্মত হয়েছিলেন যে বিনিময়হার সোনা হবে, মার্কিন ডলারের সাথে রিজার্ভ মুদ্রা থাকবে। এই ডলার বিশ্বের সবচেয়েগুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা রেন্ডার এবং ফলস্বরূপ, মার্কিন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিশ্বের ভিত্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু চীনের বিশ্ব মুদ্রা হিসেবে ইউয়ান প্রত্যাশা পূরণের দৌড়ে কতটুকু এগিয়ে রয়েছে- তা দেখার বিষয়।

চীনের বর্তমান জনসংখ্যার ১ বিলিয়ন মানুষ যা দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে। একটি শিশু নীতি, যা ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ছিল, চীনের জনসংখ্যায় একটা বিশাল প্রভাব ফেলে। চীনের অনেক যুবক বিভিন্ন সময়ে বিদেশ চলে যাচ্ছে, যার ফলে চীনের শ্রমশক্তিটি সঙ্কুচিত হচ্ছে। এটা সত্য যে, চীন বিশ্বায়নের দিকে দ্রুত এগোচ্ছে। প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও। তবুও চীন স্থায়ী এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর বিষয়ে যে অবস্থায় রয়েছে তাতে ইঙ্গিত করে যে তারা এখনো বিশ্ব আধিপত্যের জন্য প্রস্তুত নয়।

লেখক : কলামিস্ট ও শিশুসাহিত্যিক

abutaher16@gmail.com

 

"