মতামত

নৈতিকতার লাইসেন্স

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

সাঈদ চৌধুরী

বড় অসময়ে বসবাস আমাদের। চারদিকে এত বেশি হইহুল্লোড় যে কেউ কারো খবর রাখাই ভুলে যাচ্ছে মানুষ। যখন ঈদ আসে, তখন অনেক আনন্দ হয় চারদিকে। সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হলো, সবাই একসঙ্গে ঈদ করার জন্য বাড়ি ফেরা। এই আনন্দ এতটাই বেশি যে, যেকোনো মূল্যেই যেতে হবে বাড়ি, প্রিয়জনের কাছে। আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখি এই আনন্দ একেবারে অনেক সময় ইচ্ছে করে আগুনে পতিত হওয়ার মতো হয়ে দাঁড়ায়! প্রতিবার যখন ঈদ আসে, তখন আরেকটি ব্যাপারও আসে আর তার নাম হলো মৃত্যুর মিছিল। রাস্তায় একটি বড় যান দুর্ঘটনা আর তার পাশে অনেকগুলো রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকা যেন একটি নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে যাচ্ছে! তবে কি ভালোবাসার প্রকাশের বিপরীত পাশে এমনটাই নিয়ম!

প্রাচীনকালে মানুষ ভূত-পেতœী বিশ্বাস করত। অনেক অনৈতিক ঘটনাকে চালিয়ে দেওয়া হতো ভূত-পেতœীর কাজ বলে। এমনও বলা হতো পূর্ণিমার রাতে বাইরে গেলে সন্তানসম্ভাবা মায়েরা সন্তান হারাতে পারে, একটি নির্দিষ্ট দিনে বাইরে গেলে ভূতে ধরতে পারে আর এখন সে বিশ্বাসগুলোই আবার আমাদের ওপর জেঁকে বসতে যাচ্ছে! ঈদ আসছে তো মৃত্যুও আসছে! এ যেন এক অমোঘ নিয়ম! যাচ্ছেতাইভাবে সড়কে মানুষ মরছে। এই ঈদেও মৃত্যুর সংখ্যা অনেক। এর পেছনে দায় অনেকের মাঝে আছে আরেকটি বড় দায় আর সেটা হলো চালক ও হেলপারদের অমানবিক ও অমনোযোগী হয়ে ওঠা!

এই তো ঈদের দুদিন আগেই প্রথম শ্রেণির একটি দৈনিকের শিরোনাম ছিল এমনÑ‘গাড়ির সহকারীর হুঙ্কার, ও...রে দে মাইরা, বামে চাপ দিয়া দে!’ আমি নিজেও এমন অনেক ঘটনা স্বচক্ষে দেখেছি। কোনো ছোট যানবাহন দেখলেই হেলপাররা সরাসরি বলে দেয় এই সর সর নইলে উঠাইয়া দেবো, ...দার চো...রে পিষা দে এই ধরনের কথাবার্তা! অনেক সময় এমনও হয়, নারীরা রিকশায় যাচ্ছে টিজ করার জন্য গাড়িটা একটু চাপিয়ে বিভিন্ন খারাপ কথা বলে চলে যাচ্ছে! শুধু তা-ই নয়, প্রচ- রকম নেশা করেও গাড়ি চালাচ্ছে অনেকে। মোবাইল ফোনে কথা বলা তো সেখানে খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপারই ধরে নিচ্ছে এরা!

এসব অবাক করা ঘটনাগুলো আপনি যখন পথে চলবেন, তখনই দেখতে পারবেন। কিন্তু বলতে যাবেন, তখন আপনিই অপরাধী এ মানুষগুলোর কাছে। দুর্ঘটনায় শুধু যে যাত্রী মারা যাচ্ছে তা কিন্তু নয়, মারা যাচ্ছে চালকরাও। মৃত্যুর পর কে আর কার খবর রাখে। আইন মানা, লাইসেন্স প্রদান সবই আপনি করতে পারবেন হয়তো কিন্তু নমনীয়তা আর নৈতিকতার লাইসেন্স দেবে কে? চালকদের কে বোঝাবে যে সব কাজই ঠিক নয়। রাস্তায় যত চালক আছে, তার মধ্যে কতজন চালক বা হেলপার মানুষের ওপর মায়া নিয়ে গাড়ি চালায় বা চালাতে পারে? অনেক চালককে বলতে শুনেছি, একটি কুকুরকেও আমরা ইচ্ছে করে মারি না। তবে কারা অমানবিক? হ্যাঁ, অমানবিক চালক খুঁজে বের করা খুব দরকার।

গত কদিন আগে যখন বাসটির সঙ্গে লেগুনার সংঘর্ষ হয়, তখন লেগুনার চালক ছিল মোবাইলে ও বাসটি ছিল খুব দ্রুতগতির। ফলাফল দাঁড়াল অনেকগুলো মানুষের মৃত্যু! আমরা যতটা না বধির হয়েছি, তার চেয়েও বেশি হয়ে গেছি বোধহীন। কোনো কথায় কারো কিচ্ছু যায় আসে না। যত নীতিকথাই বলুন, যার যার ক্ষেত্রে তার তার কাজটুকু করে যাওয়াই এখন বড় ক্ষমতা মনে হয়। অসততা আর অনমনীয়তার যে বড় বড় ভূত-পেতœী মানুষের মধ্যে আছর করে ফেলছে, দিন দিন তা যেমন স্পষ্ট, তেমনি স্পষ্ট আমরা অসহনীয় হচ্ছি আর তার ফল গুনছে প্রাণগুলো। যত লাইসেন্স বা আইনের কথাই বলা হোক না কেন, মানসিকতার উন্নয়নই বড় বেশি প্রয়োজন এখন। যতক্ষণ না পর্যন্ত অন্য মানুষের প্রতি একজন সহনশীল না হবে, ততক্ষণ আইনের ব্যবস্থা কঠোর করেও সঠিক ফলাফল পাওয়া প্রায় অসম্ভব। চালকদের মানসিকতার উন্নয়নে হাইওয়ে পুলিশদের কাউন্সিলিংয়ের ভার দেওয়া হোক। প্রয়োজনে চালকের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনটি গাড়ি চালানোর সময় সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার ব্যাপারে কঠোরতা বাড়ানো হোক। দূরপাল্লার গাড়িগুলোয়

বিআরটিএর নির্দিষ্ট ডিভাইস রাখার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে, যাতে কোনো গাড়ি নিয়মের বাইরে চালালেই তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেওয়া যায়। মৃত্যু আর অনিয়ম যখন

সমান হয়, তখন তা থেকে পরিত্রাণের উপায় আবার সব নতুনভাবে শুরু করা। কিছু ব্যাপার বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে হলেও এখন ভারসাম্যে ফেরার সময় হয়েছে। আশা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আমাদের সবার সহযোগিতা ও সচেতনতায় আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারব একটা সময়।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

"