বিশ্লেষণ

অনিয়মের ভুঁইফোড়ে নিয়মের বাণী

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

এস এম মুকুল

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার সম্প্রতি বলেছেন, বিদেশে ৯৮ শতাংশ মানুষ আইন মানলেও আমাদের দেশে ৯০ শতাংশ মানুষ ট্রাফিক আইন মানে না। তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাপারটি অপ্রিয় হলেও সত্য। অতিসম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহত হওয়াকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের নজিরবিহীন অনন্য এক আন্দোলন আমাদের ভোতা হয়ে যাওয়া বোধের দড়জায় টোকা দেয়। বলতে দ্বিধা নেই, আবেগের উত্তেজনায় যে শিক্ষার্থীরা সড়কে শৃঙ্খলা আনয়নে বড়দের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, সদিচ্ছা থাকলে নিয়ম কার্যকর করা সম্ভব। আশ্চর্যের ব্যাপারটি হচ্ছেÑআন্দোলনকে ঘরে পাঠিয়ে দেশে চলমান ট্রাফিক সপ্তাহ চললেও দৃশ্যত কোনো শৃঙ্খলার অবস্থা যেন চোখে পড়েনি। আসলে সমাজে আইন না মানার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। কথায়-কথায় মানুষ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। যারা সুযোগমতো আইন মান্য করার বিষয়ে ভালো কথা বলছেন, তারাই নিজের প্রয়োজনের স্বার্থে সেই আইন অবলীলায় ভঙ্গ করছেন। সাধারণ মানুষের বেলায় একই কথা। এমন যে শিক্ষার্থীরা আইনশৃঙ্খলার অনন্য নজির স্থাপন করে দেখিয়েছে, তারাও অনেক ক্ষেত্রে আইন ভঙ্গ করছে। আবার সাধারণ মানুষের পাশাপাশি যারা আইনের রক্ষক তারাও আইন অমান্য করে আইনের প্রতি সর্বসাধারণের ভীতশ্রদ্ধবোধকে যেন অভয় দিচ্ছেন।

পথ চলতে মানুষ প্রতিনিয়ত ট্রাফিক আইন ভাঙছেন। আইন ভেঙে উল্টোপথে গাড়ি চালাচ্ছেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী-এমপি, ভিআইপি এবং শিক্ষার্থীরাও। ভাড়া আদায়ে গণপরিবহনে চলছে অরাজকতা। খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মেশাচ্ছেন অসাধু অতিলোভী মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা। হাসপাতাল-ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিভিন্ন রোগের পরীক্ষা, ভর্তি ফি এবং শয্যা ভাড়া ইচ্ছামতো আদায় করা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথেচ্ছাচারভাবে চলছে টাকার খেলা। ফাঁস হচ্ছে প্রশ্নপত্র। ফেসবুকে চলছে বেপরোয়া আইন অবমাননাকর প্রচারণা। সরকারি দফতরে চলছে ঘুষের খেলা। কোনো ব্যক্তিকে আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে সোপর্দ করার বিধান থাকলেও তা মানছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আইন হাতে তুলে নিয়ে একের পর এক পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে। ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, খুনখারাবির মতো নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ যেন আইন ভাঙার প্রতিযোগিতা। সিগন্যাল না মেনে রাস্তায় চলাচল, ওভারব্রিজ থাকার পরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড পার হওয়া। ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানো নিষেধ হলেও অবাধে চালানো। পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষেধ থাকা সত্ত্বেও হরদম চলছে যত্রতত্র ধূমপান। মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কোথায় ঘুমিয়ে আছে আইন! মুখে বড় বড় নীতিকথা বললেও সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী, সচিব, সংসদ সদস্য, পুলিশ, সাংবাদিক, শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত সব শ্রেণিপেশার মানুষকে প্রতিনিয়তই আইন ভাঙতে দেখা যায়। এসব বিষয়ে জোরালোভাবে ধরা হয় না। নিয়মিতভাবে অভিযান চালানো হয় না। জেল, জরিমানা করে শাস্তি কার্যকর করা হয় না বলেই সর্বসাধারণের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বা ভয় উঠে গেছে। এর ফলে, উৎসাহিত হচ্ছেন যারা আইন ভাঙতে চান আর নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, আইন মান্যকারীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চপর্যায়ের কারো কারো আইন না মানার প্রবণতা থেকে শুরু করে আইন প্রয়োগে শৈথিল্য এবং শহরে বসবাসের নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই এসব ঘটছে।

অনেক গবেষক-বিশ্লেষকের মতে, ছোট অপরাধের জন্য বড় শাস্তির ব্যবস্থা কার্যকর হলে সমাজ থেকে অপরাধপ্রবণতা ৭৫ ভাগ কমে আসবে। যেমন আইন মানতে বাধ্য করা, অপরাধ প্রমাণিত হওয়া মাত্র শাস্তি দেওয়া, ভেজাল-ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম-দায়িত্বে অবহেলা-প্রতারণা-দখল-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ইত্যাদির ক্ষেত্রে অপরাধ যত ছোট পর্যায়ের হোক না কেন, শাস্তি আর জরিমানা বেশি হলে এমন প্রবণতা কমতে পারে।

আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায় যে হারে মানুষ মারা যাচ্ছে, তা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, কেউ কেউ এ অবস্থাকে ক্যানসারের চেয়েও ভয়াবহ ঘাতক ঘটনা হিসেবে অবিহিত করেছেন। কারণ বিভিন্ন পরিসংখ্যাণে দেখা গেছে, প্রতি বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় কমবেশি ১০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এসব ঘটনায় পঙ্গুত্ববরণ করতে হচ্ছে আরো চার গুণ বেশি মানুষ। আইন বা নিয়ম না মানার কারণে শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় নয়, নিত্যদিন ঘটছে অজস্র অনিয়ম ও দুর্নীতি। সমাজের এই চিত্র ভয়ংকর অস্বাভাবিকতায় রূপ নিয়েছে। মানুষের ভেতর সহমর্মিতা, ভালোবাসা, সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা স্নেহ অনেক কমে গেছে। আবার বেড়ে গেছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অস্থিরতা। সহানুভূতির জায়গাগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে, অসহিষ্ণুতার মনোভাব প্রকট হয়ে উঠছে। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে। আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা না থাকা এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ওপর আস্থার সংকট এই পরিস্থিতিকে উসকে দিচ্ছে। পরিত্রাণের জন্য দরকার সরকারের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আইনের শাসন দ্রুত প্রতিষ্ঠা করা। অনেক গবেষক-বিশ্লেষকের মতে, ছোট অপরাধের জন্য বড় শাস্তির ব্যবস্থা কার্যকর হলে সমাজ থেকে অপরাধপ্রবণতা ৭৫ ভাগ কমে আসবে। যেমন আইন মানতে বাধ্য করা, অপরাধ প্রমাণিত হওয়া মাত্র শাস্তি দেওয়া, ভেজাল-ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম-দায়িত্বে অবহেলা-প্রতারণা-দখল-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ইত্যাদির ক্ষেত্রে অপরাধ যত ছোট পর্যায়ের হোক না কেন, শাস্তি আর জরিমানা বেশি হলে এমন প্রবণতা কমতে পারে। যেমন : খাদ্যে ভেজাল, খাদ্য মজুদ, ট্রাফিক আইন না মানা, পথচারীর ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করা এমনসব অপরাধের জন্য জেল এবং জরিমানা উভয় দ- কার্যকর হওয়া উচিত। এমনসব অপরাধীর শাস্তির খবরও ফলাও প্রচার করা দরকার। উন্নত বিশ্বে সরকারের নিয়ম অমান্য করলেই অপরাধ ধরে তৎক্ষণাৎ শাস্তি দেওয়া হয় বলে সেসব দেশে রাস্তায় কেউ কলার ছোলা বা চিপসের প্যাকেট ফেলার কথা ভাবতেও পারে না। বাংলাদেশে সময় লাগলেও এমন আইন মান্যতার প্রবণতা সৃষ্টি করা অসম্ভব নয়। তবে এ জন্য জনসংখ্যার অনুপাতেÑট্রাফিক পুলিশসহ পুলিশ বাহিনী এবং অন্যসব নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জনশক্তির কলেবর বাড়ানো দরকার আছে। তাদের প্রশিক্ষণের দরকার আছে। তা না হলে শুধু আইনপ্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আইনের প্রতি জনগণের সচেতনতা, শ্রদ্ধা ও ভীতি বোধকে জাগরিত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, নিয়ম না মানা বা নিয়ম ভঙ্গ করার প্রবণতা আমাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই বহুদিনে জীবনচর্চায় আইনি বাধ্যকতায় সবার আগে অভ্যাসের পরিবর্তন জরুরি। নিয়ম মানার মানসিকা তৈরি করতে হবে সর্বস্তরে, সবার মধ্যে। প্রত্যেক পেশাজীবী যে যার অবস্থান থেকে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করা এবং পেশাগত সততার সাক্ষর রাখতে হবে। সর্বোতভাবে দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হবে। নিয়ম মেনে চললে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমবে। যেমন : যৌতুক বন্ধ করা, ঘুষ প্রদান ও গ্রহণ, বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন, শিশুশ্রম ও অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একটি সুশীলসমাজ ব্যবস্থায় সরকার অন্যায় করলে প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকবে, ভালো কাজ করলে সরকারকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিতে হবে। আবার বিরোধী দল সরকারের খারাপ কাজের প্রতিবাদ না করলে বা জনগণের পক্ষে জাতীয় স্বার্থে ভূমিকা না রাখলে নিন্দা করা এবং সরকারের ভালো কাজে পাশে না থাকলেও নিন্দা জানানোর সুযোগ থাকবে। ধর্মীয় অনুশাসন মানা এবং অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষী বা কট্টরপন্থি মনোভাব পোষণ করা যাবে না। এসব অভ্যাসগত পরিবর্তনই হতে পারে নৈতিক পরিবর্তনের চাবিকাঠি। তবে এ কাজ শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব হবে না। উদ্যোগটি নেবে সরকারÑসঙ্গে সমাজের সর্বস্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সভ্য, সুশীলসমাজ ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হতে পারে। আমরা আর কতকাল এমন সমাজ ব্যবস্থার পথ চেয়ে থাকবÑএটাই প্রশ্ন।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

writetomukul36@gmail.com

 

"