পর্যবেক্ষণ

ভিজিএফ চাল এবং আমরা

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

গবির-দুঃখী মানুষ যাতে ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়, তারাও যেন সবার সঙ্গে উৎসবের সম-অংশীদার হতে পারে, পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদ উদ্যাপন করতে পারে, সে জন্য সরকার দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার দরিদ্র জনগণের মধ্যে ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে পরিবারপ্রতি ২০ কেজি চাল বিতরণের যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু সরকারের সেই মহৎ উদ্দেশ্যটি মুষ্টিমেয় কিছু অসৎ জনপ্রতিনিধির লালসার কারণে ভেস্তে যাকÑএটা কারো কাম্য হতে পারে না। লোভ-লালসারও একটা সীমা আছে। ঈদুল আজহার আগে গরিবের জন্য বরাদ্দ করা চাল ওজনে কম দেওয়া, কালোবাজারে বিক্রি করার মতো গর্হিত কাজ যারা করতে পারে, তাদের ধিক্কার জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। ঈদুল আজহা শুধু পশু কোরবানির আনুষ্ঠানিকতাই নয়, এ ঈদ সমগ্র বিশ্বে মুসলমানদের ত্যাগ, আত্মসমর্পণ ও আত্মোপলব্দির শিক্ষা দেয়। শিক্ষা দেয় মহান আল্লাহর ইচ্ছের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, দুস্থ ও দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ভিজিএফ চাল আত্মসাতের অভিযোগে দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গির আলমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকার কর্তৃক ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে দুস্থ ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য দিনাজপুর পৌরসভার নামে ৯২ দশমিক ৪২ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ১৮ আগস্ট শনিবার সকাল থেকে দিনাজপুর পৌরসভায় দুস্থ ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে চাল বিতরণ শুরু করা হয়। জনপ্রতি ২০ কেজি করে চাল বিতরণের কথা থাকলেও চাল দেওয়া হচ্ছিল ১৮ কেজি করে। দিনাজপুর সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কর্তৃক দায়ের করা এজাহারের ভিত্তিতে পুলিশ গুদামরক্ষক ও বিতরণকারী মজিবর রহমানকে আটক করে। মামলার অপর আসামি পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গির আলমকে পুলিশ গ্রেফতার করে ৫ দিনের রিমান্ড চেয়ে দিনাজপুরের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক আদালতে সোপর্দ করে।

ভিজিএফের চাল নিয়ে দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় ঘটছে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ও লঙ্কাকা-। বরিশালের সদর উপজেলার চন্দমোহন এবং বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নে প্রতিজনকে পাঁচ কেজি করে চাল কম দেওয়ার অভিযোগে ভিজিএফ চাল বিতরণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ দুটিতে। নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নে ভিজিএফের চাল কালোবাজারে বিক্রির সংবাদ শোনে সাংবাদিরা সেখানে গেলে তাদের একটি কক্ষে আটক করে রাখে চেয়ারম্যানের লালিত সন্ত্রাসী বাহিনী। অবশ্য পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। জামালপুরের মেলান্দহের চরবানিপাকুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভিজিএফের ১০০ বস্তা চাল জব্দ করা হয়। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের আড়িয়া ও রিফায়েতপুর ইউনিয়ন পরিষদে ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে প্রতিজনকে ২০ কেজির পরিবর্তে চাল দেওয়া হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ কেজি। গত ২১ আগস্টের ‘সংবাদে’ প্রকাশিত খরব থেকে এসব অনিয়মের অভিযোগ জানা যায়। পত্রিকাটির সম্পাদকীয়তে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সরকার ভিজিএফের মাধ্যমে চাল বিতরণ করে গরিব ও দুস্থ জনসাধারণের উপকারের জন্য। কিন্তু এক শ্রেণির অসৎ ও দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধির জন্য সরকারের দেওয়া সুবিধা তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। যাদের ওপর চাল বিতরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারাই তা আত্মসাৎ করছে। দেখা যায়, এসব জনপ্রতিনিধির প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। জনগণের কল্যাণের কথা বলে নির্বাচিত হয়ে তারা জনগণের অধিকার হরণ করে। তাদের কারণে শুধু সাধারণ মানুষই বঞ্চিত হচ্ছে না, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে।

গত ১৬ আগস্ট, বাংলাদেশ ওযার্কার্স পার্টি, ত্রিশাল উপজেলা শাখার পক্ষ থেকে ভিজিএফ কার্ড বিতরণে স্বজনপ্রীতি বন্ধের দাবিতে এক বিক্ষোভ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সবাবেশ থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ত্রিশালের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক, ময়মনসিংহের কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, ভিজিএফ কার্ড প্রকৃত গরিব লোকরা পায় না। বিতরণের সময় দেখা যায়, কারো হাতে ১৫-২০টি কার্ড। আবার কেউ কেউ খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে। এসব অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।

জাতির জনক ঠিকই জানতেন, ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলের ঘুণেধরা ইউনিয়ন পরিষদ ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামবাংলার দরিদ্র মানুষের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে না। সম্ভব হবে না তাদের কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য সমস্যার সমাধান করা। তাই তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আঘাত করতে চাই এই ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থায়। নতুন সিস্টেমে যেতে চাচ্ছি আমি। গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। ভুল করবেন না। আমি আপনাদের জমি নেব না। পাঁচ বছরের প্ল্যানে বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামের প্রতিটিতে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। এই কো-অপারেটিভে জমির মালিকের জমি থাকবে। বেকার অথচ কর্মক্ষম প্রত্যেক ব্যক্তিকে কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে। টেস্ট রিলিফে যাবে তাদের হাতে। ওয়ার্কার্স প্রোগ্রাম যাবে তাদের আওতাধীনে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিল থেকে টাউটদের বিদায় দেওয়া হবে, তা না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না।’ কে জানত বঙ্গবন্ধুর ওই ঘোষণার ৪৩ বছর পর তা নিরেট সত্যে পরিণত হবে। আমাদের দেশের জনপ্রতিনিধিদের আচরণের এমন অধপতন ঘটবে। প্রত্যন্ত গ্রামবাংলা ঘুরে বঙ্গবন্ধু ঠিকই জানতে পেরেছিলেন তাঁর জনগণের দুঃখ-কষ্টের কারণ। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের সময় লঙ্গরখানার রুটি বিতরণের গম নিয়েও একই ধরনের অনিয়ম করেছিল আমাদের এসব জনপ্রতিনিধি।

সৎ উদ্দেশ্য, মহৎ ইচ্ছে ও জনগণের প্রতি ভালোভাসা এবং দৃঢ় অঙ্গীকার থাকলেই যে সমাজে ভালো কাজ করা যায়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা প্রশাসন। ছুরি দিয়ে আম কেটে খাওয়া যায়, আবার সেই ছুরি দিয়ে মানুষ হত্যাও করা যায়। ছুরির দোষ নেই। ব্যবহারের ওপরই তার ভালো-মন্দ নির্ভর করে। সারা দেশে ভিজিএফ চাল নিয়ে লঙ্কাকা- ঘটলেও ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা প্রশাসন ভিজিএফ চাল বিতরণে ‘দরিদ্র সমাবেশের’ আয়োজন করে সততা ও স্বচ্ছতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এ আয়োজনের পেছনে স্থানীয় সংসদ সদস্য শরীফ আহমেদ, উপজেলা পরিষদ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, স্বজনপ্রীতি ঠেকাতে ইউপি সদস্য ও দলীয় নেতাকর্মীদের হাতে কার্ড না দিয়ে দরিদ্র সমাবেশ ডেকে ঈদের বিশেষ ভিজিএফ কার্ড বিতরণ করা হবে। সেই মোতাবেক প্রথমে ইউনিয়নগুলোয় মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হয় কার্ড বিতরণের স্থান ও তারিখ। তারপর সেখানে এলাকার দরিদ্র নারী-পুরুষ একত্র হলে শুরু হয় বাছাই পর্ব। স্থানীয় এমপি, প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে প্রকৃত সুবিধাভোগী চিহ্নিত করে তাদের হাতে ভিজিএফ কার্ড তুলে দেওয়া হয় আনন্দঘন পরিবেশে। গত ১১ আগস্ট, উপজেলার সিংহেশ্বর ইউনিয়নে ভিজিএফ কার্ডপ্রার্থী হাজার হাজার লোক দরিদ্র সমাবেশে উপস্থিত হয়। যারা সচ্ছল, তাদের কার্ড দেওয়া হয়নি। একই ব্যক্তির একাধিক কার্ডপ্রাপ্তি রোধকল্পে কার্ড গ্রহণকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রেখে দেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফুলপুরের কথাÑবিতরণ কাজে স্বচ্ছতা আনতেই কার্ড বিতরণ থেকে শুরু করে চাল বিতরণ পর্যন্ত নেওয়া হয় বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা। ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা যদি ‘দরিদ্র সমাবেশ’-এর মাধ্যমে গরিব, দরিদ্র ও দুঃখী মানুষের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে ভিজিএফের চাল বিতরণ করতে পারে, তবে দেশের অন্যান্য উপজেলায়ও ফুলপুর উপজেলার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ভিজিএফের চাল প্রকৃত গরিব-দুঃখী মানুষের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করে সরকারের সৎ উদ্দেশ্যকে সাফল্যম-িত করা সম্ভবÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা। আর যারা গরিবের চাল চুরির মতো ঘৃণিত কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করতে হবে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে কোনো শিথিলতার অবকাশ নেই।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

"