মতামত

কাদের জন্য এই বৃদ্ধাশ্রম?

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

আজহার মাহমুদ

মানবসমাজে সভ্যতার গতি যত বেগবান হচ্ছে, তত কমে যাচ্ছে আবেগ, আন্তরিকতা, ভালোবাসা, মানবিকতা এবং কৃতজ্ঞতার মতো মানবহৃদয়ের কোমল সত্তাগুলো। ফলে আমরা হৃদয়হীন পশুতে পরিণত হচ্ছি। বিধাতার সৃষ্টিশালায় বুদ্ধি-বৃত্তিসম্পন্ন একমাত্র জীব হচ্ছে মানুষ। তারাই সৃষ্টির সেরা সম্পদ বলে গর্ব অনুভব করে। সংবেদনশীল, স্পর্শকাতর হৃদয় এবং সম্পদে ধনী বলে দাবি করা মানুষগুলো আজ কেন হয়ে উঠছে হৃদয়হীন, অকৃতজ্ঞ? একটি শিশুর জীবনের প্রথম প্রভাতে যার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, তিনি হচ্ছেন মা। পিতামাতার মায়া-মমতা স্নেহ-ভালোবাসায় ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে শিশু। তাদের সন্তান স্নেহ অকৃত্রিম এবং অতুলনীয়। তাদের মিলিত আত্মত্যাগ, পরিশ্রম ও স্নেহে লালিত-পালিত শিশু ক্রমে পা বাড়ায় আত্মপ্রতিষ্ঠার লক্ষে।

কিন্তু বড় দুঃখের বিষয়, এই শিশু যখন বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ায়। তখন সে ভুলে যায় তার বৃদ্ধ পিতামাতার সেই আত্মত্যাগ, কষ্ট, পরিশ্রমের চিরন্তন লড়াইকে। সন্তানের কাছে বৃদ্ধ পিতামাতা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের অনেককেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় বৃদ্ধাশ্রমে। মাসে মাসে সেই বৃদ্ধাশ্রমে কিছু টাকা পাঠিয়ে কৃতজ্ঞতার পবিত্র দায় পালন করে এই হৃদয়হীন আধুনিক প্রজন্ম। কখনো খোঁজও নেন না, বাবা-মা কেমন আছেন? স্নেহ-ভালোবাসা, মায়া-মমতা, কৃতজ্ঞতাহীন এই হৃদয়হত্যার কাহিনি সত্যিই বড় লজ্জার এবং দুর্ভাগ্যের।

যে পিতামাতা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে নিজে না খেয়ে সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অবজ্ঞা অবহেলা কি তাদের পাওনা ছিল? একটু ভালোবাসা, যতœ, সুখ চাওয়া কি তাদের অন্যায়? বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নয়নের ফলে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। ফলে বিশ্বজুড়েই বেড়েছে প্রবীণ নাগরিক সংখ্যা। বর্তমান সময়ে পরিবর্ধিত সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় যৌথ পরিবারে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বাড়িতে ছেলের বউ কিংবা ছেলের সঙ্গে বনিবনার অভাবে তারা একই বাড়িতে থাকতে পারছেন না। তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। সেখানে পরিচালনা সমিতির অত্যাচারও চরম। এই অমানবিক অবস্থায় পড়ে বর্তমানে তাদের করুণ অবস্থা। তাদের প্রতিনিয়ত ভোগ করতে হচ্ছে নরক যন্ত্রণা।

আর্থিক, শারীরিক ও সামাজিক দিক দিয়ে দুর্বল ও অসমর্থ এই মানুষজনের অসহনীয় দুর্দশা দেখে কেন নিশ্চুপ নিরুত্তর এই গুণধর বর্তমান প্রজন্ম। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে বৃদ্ধ পিতামাতার প্রত্যাশা তেমন কিছু নয়। দুই বেলা দুমুঠো খাবার, একটু আশ্রয়, চিকিৎসা যতœ আর ভালোবাসা। একটু সহমর্মিতা। ভুলে গেলে চলবে না, তারা আমাদের একান্ত আপনজন। তারা না থাকলে কোথায় যেতাম আমরা?

আধুনিক জীবনভাবনার আত্মঘাতী আগুন কিন্তু একদিন জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দেবে আমাদের এই অমানবিকতাকে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা বোঝা নয়, বরং সম্মান-সম্ভ্রমের অফুরন্ত উৎস। তাদের অভিজ্ঞতার ওপর যদি আমরা আরো বেশি আস্থা রাখতে পারি, তাহলে অনেক উপকৃত হব। লাভবান হব। যে মানুষজন জীবনের সোনালি সময়টা সন্তানদের সফল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য আত্মবলিদান দিয়েছেন, তাদের আমরা যেন একটু ভালোবাসা, যতœ, শান্তি দিতে পারি-এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। পোশাকে আধুনিকতা আসে না, আসে ভাবনা, মন ও মননে। আমাদের মন ও মনন সেই অঙ্গিকারের শুদ্ধতায় উজ্জ্বল হোক এটাই কামনা করি।

লেখক : শিক্ষার্থী

ayharmahmud705@gmail.com

"