সাফল্য

ওষুধশিল্পের বিকাশ আশাব্যঞ্জক

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

মাহমুদুল হক আনসারী

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে এ দেশে ব্যবহৃত ওষুধের সিংহভাগই আমদানি করা হতো বিদেশ থেকে। অল্পস্বল্প যে ওষুধ দেশে তৈরি হতো, তার গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন ছিল। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর বাংলাদেশ নিজস্ব চাহিদার সিংহভাগই পূরণ করে চলছে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর ১৬০টি দেশে ওষুধ রফতানি হচ্ছে। যার মধ্যে ইউরোপ, আমেরিকার বাজারেও বাংলাদেশের ওষুধ প্রবেশ করছে। আপসহীন ওষুধের মান নিয়ে যাদের অবস্থান, তারাও বাংলাদেশের ওষুধের ব্যাপারে সন্তুষ্টি প্রকাশ করছে। বর্তমান অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ওষুধ রফতানি হয়েছে। এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ কোটি ডলার। এর বিপরীতে ওষুধ রফতানির পরিমাণ ৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। ওষুধ রফতানিতে প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে ৫৪টি ওষুধ রফতানিকারী প্রতিষ্ঠান ১২৭টি দেশে রফতানি করে থাকে। ২০১১ সালে রফতানিকারী দেশের সংখ্যাছিল ৪৭টি। এরপর কয়েক বছর কোনো প্রতিষ্ঠান চালু হয়নি। কিন্তু ২০১৫ সালে কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১১৩টিতে। বর্তমানে এর সংখ্যা ১২৭। এর মধ্যে আমেরিকার উত্তর ও দক্ষিণের ২৫টি দেশে, ইউরোপের ২৬টি, অস্ট্রেলিয়ার পাঁচটি, আফ্রিকার ৩৪টি ও এশিয়ার ৩৭টি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি হয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ২০১৫ সালের জুন মাসে দেশের প্রথম ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি হিসেবে ইউএস এফডিএ কর্তৃক নিরীক্ষিত ও অনুমোদিত হয়। বর্তমানে কোম্পানিটি ৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রফতানি করছে। বেক্সিমকো ফার্মা ইউএস এফডিএ, এজিইএস (ইইউ), টিজিএ অস্ট্রেলিয়া, হেলথ কানাডা, জিসিসি এবং টিএফডিএসহ বিশ্বের বিভিন্ননিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত। অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গেল কয়েক বছরে দেশ থেকে ওষুধ রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১১ সালে সবমিলিয়ে ওষুধ রফতানি হয় ৪২৬ কোটি টাকা। ২০১২ সালে রফতানি হয় ৫৫১ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে ৬১৯ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে ৭৩৩ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে রফতানি হয়েছে ৮৩২ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশ থেকে ওষুধ রফতানি হয়েছে ২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা।

অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলেন, দেশে বিশ্বমানের ওষুধ পরীক্ষাগারের কাজ চলছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। এসব কাজ শেষ হলে এ শিল্পের অবস্থান আরো সুদৃঢ় হবে। ওষুধ প্রযুক্তি ও বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের বিকাশ খুবই আশাব্যঞ্জক। বছর কয়েক আগেও জীবনরক্ষাকারী ৫০ শতাংশেরও বেশি ওষুধ আমদানি করতে হতো। এখন সেটি অনেক কমে এসেছে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তথ্যমতে, এখনো দেশের বেশির ভাগ ওষুধের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে ওষুধের কাঁচামালের বাজার প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের অগ্রযাত্রার মূল কারণ আমাদের ওষুধ নীতির যথার্থ বাস্তবায়ন। ১৯৮২ সালে এদেশে যে ওষুধ নীতি ঘোষণা করা হয় তার সুফল আমরা পেতে যাচ্ছি। তবে দেশে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল চাহিদার তুলনায় অনেক কম। উৎপাদন বাড়াতে হলে কাঁচামালের জোগানও বাড়াতে হবে। এতে ওষুধের উৎপাদন ব্যয় কমবে। পাশাপাশি ওষুধের দামও মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে। ওষুধ মানুষের দৈনন্দিন নিত্য ব্যবহার্য একটি পণ্য। কারণ, রোগব্যাধি মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। রোগব্যাধির নিরাময়ে ওষুধ ও চিকিৎসা ছাড়া মানুষের রক্ষা নেই। তাই আগের তুলনায় বর্তমানে ওষুধের ব্যবহার বেড়ে গেছে। ফলে চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও রোগব্যাধির নিরাময়ে আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন নতুন ওষুধ।

তবে ওষুধের মানের চেয়ে মূল্য নিয়ে জনভোগান্তি বলে শেষ করা যাবে না। একই কোম্পানির ওষুধ মাত্র কয়েক গজের ব্যবধানে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যে বিক্রি করতে দেখা যায়। এক এক ফার্মেসিতে এক এক মূল্যে ওষুধ বিক্রি করা নিয়ে জনগণের মধ্যে বিরূপ মন্তব্য শুনতে পাওয়া যায়। ফলে জনমনে ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে সন্দেহ এবং সমালোচনার চোখে পড়তে হয়। এ ধরনের কার্যকলাপ থেকে কোম্পানি এবং বিক্রেতাদের সতর্ক থাকা দরকার।

বিজিএমএর তথ্যমতে, গত অর্থবছরে ২ হাজার ৮১৫ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এর আগের বছর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দুই হাজার ৮০৯ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৪ শতাংশ। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যে তৈরি পোশাকের অবদান অনস্বীকার্য। তেমনি রফতানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে ওষুধশিল্প খুলে দিতে পারে সব সম্ভাবনার দ্বার। বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি প্রতিবছরই বাড়ছে। আশা করা হচ্ছে এ শিল্প আগামীতে রফতানির অন্যতম প্রধান খাত হয়ে উঠবে। এ উদ্দেশে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ওষুধশিল্পকে বিশষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ২০৩২ সাল পযর্ন্ত দেওয়া হয়েছে শুল্ক মৌকুফের সুবিধা। এ ছাড়া ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে ২০ শতাংশ শুল্ক ছাড় পাবেন আমদানিকারকগণ। দেশে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য মুন্সীগঞ্জের গাজারিয়ায় গড়ে তোলা হচ্ছে প্রথম ওষুধশিল্প নগর। আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে পুরোদমে এখানে কার্যক্রম শুরু হবে। এরই মধ্যে ২৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৪২টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওষুধশিল্পের কাঁচামালের জন্য ভারত চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে ওষুধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে। সে ক্ষেত্রে দেশে কাঁচামাল তৈরি হলে তা বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করবে। এতে করে ওষুধের উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে। ফলে বিদেশে ওষুধ রফতানির ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আরো এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

ওষুধের মতো জীবন রক্ষাকারী পণ্য মান সংরক্ষণ করে বিদেশে রফতানির ফলে দেশের ভাবমূর্তি বাড়াতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশের অন্যান্য পণ্য রফতানিতেও এ ভাবমূর্তি অবদান রাখবে। ওষুধশিল্পের পরিসর বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সমস্ত প্রতিকূল অবস্থাকে ডিঙ্গিয়ে ওষুধশিল্পকে জাতির অর্থনৈতিক স্বার্থে এগিয়ে নিতে হবে। এ খাতকে আরো গতিশীল ও সম্প্র্রসারণ করা হলে রফতানি খাতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বিরাট অবদান রাখবে। পোশাকশিল্পের প্রতি রাষ্ট্রের যেভাবে আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতা রয়েছে, তেমনি ওষুধশিল্পের প্রতিও এ ধরনের মনোভাব ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে এ শিল্পের বিকাশ পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। এ ছাড়া ওষুধশিল্পকে কেবল মাত্র অর্থনৈতিক খাত হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। বরং সেবার খাত হিসেবেই এ শিল্পকে দেখা উচিৎ। এতে রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে শুধু দেশে নয়, গোটা বিশ্বেই বাংলাদেশের ওষুধশিল্প মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবে। যার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

mh.hoqueansari@gmail.com

"