মতামত

কোরবানির অর্জন

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

মো. আবু তালহা তারীফ

আমরা ঈদের নামাজ পড়ার জন্য ঈদগাহে কিংবা মসজিদে গিয়েছি। ঈদুল আজহার নামাজ আদায় কারার জন্য মসজিদ কিংবা ঈদগাহে গিয়ে দেখা যায় কানায় কানায় ভরপুর মানুষ; কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা নেই বললেই চলে। সবাই একত্রে এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ পড়ার জন্য। নামাজ শেষে খুতবার পরে মোনাজাত দিয়ে সবাই ছুটেছিল কোরবানির পশুর দিকে। মসজিদের ইমাম বা মাদ্রাসার ছাত্রদের পিছু পিছু ছুটে কে আগে পশু জবেহ করবে এরকম একধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অনেকে পশু জবাইয়ের দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও কিংবা সেলফি তুলে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়ে লিখে দেয় ‘আমাদের কোরবানির পশুর জবাইয়ের দৃশ্য’ লাইক দিন, কমেন্ট করুন, শেয়ার করুন আরো কত কি? পশু জবাইয়ের পূর্বেই বিক্রি করে দেওয়া হয় পশুর চামড়া। পশুর চামড়া পৃথক করে সর্ব প্রথম একটি রান কেটে-ছিলে কিংবা মেয়ের শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে কিছু ভালো ভালো গোশত নিয়ে নিজে রান্না করে পরিবারের সবাইকে নিয়ে আনন্দ উল্লাসে খাওয়া হয় অথচ পশুর গোশত ভাগ করা হয়নি এবং পার্শ্ববর্তী গরিব অসহায় ব্যক্তির কোনো খোঁজখবর এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি আর পশুর ভালো গোশত নিজে রেখে দিয়ে ভাগ করা হয় অতঃপর দেওয়া হয় আত্মীয় এবং গরিব অসহায়দের। কসাইকে দেওয়া হয় গরিবের অংশ থেকে গোশত, টাকা দেওয়া হয় পশুর বিক্রীত চামড়ার টাকা। সন্ধ্যায় দোকানে গিয়ে আলাপচারিতায় ব্যস্ত থাকে কার পশুতে কত কেজি গোশত হয়েছে, এক কেজি গোশতের দাম কত পড়ল? লাভ হলো নাকি লোকসান হলো, আবার অনেক সময় কোরবানির পশু কম টাকা দিয়ে কিনে নিজেকে বড় করার জন্য বেশি দামে ক্রয়ের কথা বলা হয়; একে অপরকে বলা হয় আমার পশুর দাম বেশি। পশু নিয়ে চলে কোরবানির সময় বিভিন্ন ধরনের অহংকার ও গৌরব। বড় পশু ক্রয করে কোরবানি দেওয়া হয়ে গেল কিন্তু হৃদয়ের মধ্যে যে পশুত্ব রয়েছিল সেটিকে আমরা আজ পর্যন্ত কোরবানি দিতে পারলাম না। কোরবানির পূর্বে হৃদয়ের ভিতরে যে অহংকার হিংসা দেমাক ছিল কোরবানির পর তা রয়েই গেল। পূর্বে যেমন ছিলাম এখনো তাই রয়ে গেলাম, হৃদয়কে সাদামাটা করা গেল না। কোরবানি পশু জবাইর মাধ্যমে নিজের হৃদয়ের মধ্যে যে একটি পশুত্বভাব রয়েছে সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ের সেই পশুত্বকে কোরবানি করা আমাদের জরুরি ছিল। পশু কোরবানির মাধ্যমে নিজের হৃদয়কে পরিবর্তন করতে হবে। তাই কোরবানির পশু কত বড় বা কত দামি এটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো কোন প্রেরণায় কোরবানি দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ তা’আলা বড় পশু দেখেননি। তিনি দেখেছেন কোরবানিদাতার অন্তর বা তাকওয়া কোনদিকে ছিল। মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘আল্লাহ পাকের নিকট এর গোশত ও রক্ত পৌঁছায় না বরং তোমাদের আন্তরিকতা শ্রদ্ধা ও তাকওয়াই পৌঁছায়’। (সুরাÑ হজ্জ-৩৭)।

কোরবানির পশুর কোন অংশ আল্লাহর নিকট পৌঁছায়নি আর কোন অংশ পৌঁছেছে এখানেই কোরবানিদাতার তাকওয়া। সে কি লোক দেখানো জন্য বা কি গোশত খাওয়ার জন্য কোরবানি দিয়েছিল না কি আল্লাহকে খুশি করার জন্য এটাই মূল উদ্দেশ্য। শুধু কোরবানি করলেই হবে না আল্লাহ তা’আলাকে সন্তুষ্টি ও তাকওয়া অর্জন করার জন্য যেমন কোরবানি করেছি তেমনিভাবে আল্লাহ তা’আলাকে সন্তুষ্টি করার জন্য নামাজ আদায় করতে হবে। আমরা কোরাবানি করলাম অথচ ফজর, জোহর,আসর, মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করলাম না। তাহলে সেই কোরবানি কতটুকু আমার উপকার হবে সেটিই বড় একটি বিষয়। আমরা নামাজ পড়লাম না কোরবানির পশুর গোশত নিয়ে আজো ব্যস্ত হয়ে আছি। এমনটা করা আমাদের ঠিক হবে না। সবসময় নামাজকে প্রাধান্য দিতে হবে। মহান আল্লাহ কোরবানির পূর্বেই নামাজের কথা প্রথমে বলেছেন। এরশাদ হচ্ছে, ‘আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ সবকিছু মহান আল্লাহর জন্য’। (সুরাÑ আনয়াম-১৬২)।

কোরবানি আমরা যেভাবে আল্লাহকে সন্তুষ্টির জন্য দিয়েছি তেমনি আল্লাহকে সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করতে হবে। কেননা কিয়ামতের দিন সর্ব প্রথম নামাজের হিসাব হবে। তাই নামাজ থেকে বিরত থাকা মোটেই অনুচিত। প্রিয় পাঠক,আসুন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার জন্য চেষ্টা করি পাশাপাশি আল্লাহ আমাকে কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য দিয়েছেন সেই জন্য দুই রাকাত শুকরিয়াতান নামাজ আদায় করি। একই সঙ্গে দুই হাত তুলে দোয়া করি যেন কোরবানি আল্লাহ কবুল করেন এবং আগামী বছর কোরবানি দিতে পারি সেই পর্যন্ত হায়াত বাড়িয়ে দেন। আর আমরা যারা কোরবানি দিতে পারিনি, সামর্থ্য নেই আমরাও দুই রাকাত নামাজ আদায় করে সামর্থ্য চেয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করি যেন আগামী বছর আমাদের সামর্থ্য দান করেন। আল্লাহ আমাদের সকলের মনের জায়েজ আশা কবুল করেন। -আমিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক

"