ব্লু-ইকোনমি

অপার সম্ভাবনায় বাংলাদেশ

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

সাধন সরকার

সমুদ্রসম্পদ আহরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে পারে। ২০১৪ সালে ভারত এবং ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রবিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ কিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকায় (টেরিটরিয়াল সির) অধিকার লাভ করতে সফল হয়। বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপনের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ ও অন্যান্য সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার লাভ করে। তবে দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এই বিশাল অঞ্চলে কী পরিমাণ মৎস্য ও খনিজসম্পদ আছে তা এখনো অজানাই রয়ে গেছে। সুবিস্তৃত ও অমিত সম্ভাবনাময় এই সমুদ্রসম্পদ বাংলাদেশের জন্য এখন পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত ও অব্যবহৃত। সীমিত পর্যায়ে কিছু পরিমাণ তেল-গ্যাস এবং মৎস্য সম্পদ আহরণ করা হলেও তার পরিমাণ বঙ্গোপসাগরের অফুরন্ত সম্পদের তুলনায় খুবই নগণ্য। বিশাল অঞ্চলব্যাপী সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ আহরণ করা সম্ভব না হলে তা হাতছাড়া হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। কত-শত চেষ্টার পরে বিশাল সমুদ্র বিজয়ের পর বাংলাদেশ সেই চেতনার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। তা না হলে সমুদ্র বিজয়ের পর মিয়ানমার ও ভারত ব্যাপকভাবে সমুদ্রে সন্ধান চালিয়ে তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদের সন্ধান পেলেও বাংলাদেশ সেখানে সন্ধান চালানোর প্রস্তুতি পর্যন্ত নিতে পারছে না! স্থলভাগতুল্য সমুদ্র এলাকা অর্জন যেকোনো দেশের জন্য গর্বের। কিন্তু তা অর্জন করলেই শুধু হবে না, সম্পদ দেশের স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে।

সমুদ্রও এখন আগের মতো নেই। জলবায়ু পরিবর্তন আর প্লাস্টিক দূষণের কারণে সাগর-মহাসাগরে সব ধরনের প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক জীবনাচরণ এখন হুমকির মুখে। সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়ছে, অমøতা বাড়ছে। ফলে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি আগের থেকে অনেক বেশি। সমুদ্রসম্পদ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে। তবে তার আগে সমুদ্র থেকে কিছু পেতে হলে সমুদ্রে যেতে হবে। এ ছাড়া বিশাল সমুদ্রের বাংলাদেশ অংশকে সবার আগে নিরাপত্তা দিতে হবে। বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি দেশীয় পর্যায়েও চেষ্টা চালাতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর সময় এসেছে। সমুদ্রে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হলে সমুদ্র থেকে সম্পদ দ্রুত আহরণ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া বিশাল বিশাল প্রকল্পের মাধ্যমে সমুদ্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে তা দেশের জন্য লাভই হবে। মহীসোপানের ওপরে ও সমুদ্রের অভ্যন্তরে আরো ব্যাপক জরিপ ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথায় জলজসম্পদ, তেল-গ্যাস ও খনিজসম্পদ অনুসন্ধান ও এসবের বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা জানা সম্ভব হবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অগভীর ও গভীর সমুদ্রের তলদেশে অতি মূল্যবান ইউরেনিয়াম, প্লাটিনাম, থোরিয়ামসহ নানা দুর্মূল্য ও দুর্লভ খনিজসম্পদ পাওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া অগভীর সমুদ্রে সিমেন্ট তৈরির উপাদানও পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’ সমুদ্রের বিশাল জীববৈচিত্র্যময় ও সম্ভাবনাময় এলাকা। এখানকার সমুদ্রসম্পদ সম্পর্কে সরকারি-বেসরকারি আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। গভীর সমুদ্রের সমুদ্রসম্পদ সম্পর্কে জানা সম্ভব হলে তা সরকারের নীতিকৌশল প্রণয়নেও ভূমিকা রাখবে। অর্জিত সমুদ্র এলাকার নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। অর্জনের থেকে রক্ষা করা আরো কঠিন। গবেষণা, জরিপ ও সন্ধান চালিয়ে সমুদ্রসম্পদ আহরণের পাশাপাশি সমুদ্রে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে না পারলে বাংলাদেশ অংশের সমুদ্রসম্পদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

পৃথিবীর অনেক দেশ বাংলাদেশের থেকে কম সমুদ্রসম্পদের অধিকারী হয়েও সীমিত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আর স্থলভাগ সমান সমুদ্রসম্পদের অধিকারী হয়েও বাংলাদেশ এখনো গবেষণা পর্যায়ে রয়েছে। যেহেতু সমুদ্র অর্জনের পর ভারত ও মিয়ানমার অংশে তেল-গ্যাস ও খনিজসম্পদ পাওয়া গেছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবে ধরে নেওয়া যায় বাংলাদেশ অংশেও বিপুল মৎস্য, তেল-গ্যাস ও খনিজসম্পদ রয়েছে। প্রাপ্তিসাপেক্ষে বিপুল মৎস্যসম্পদসহ এসব মূল্যবান খনিজ উত্তোলন ও আহরণ সম্ভব হলে আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা আরো কয়েকধাপ এগিয়ে যাবে। জাতিসংঘের ১৫ বছর মেয়াদি ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার’ (এসডিজি) ১৪ নম্বরে জলজসম্পদের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ব্যাপকভিত্তিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে ব্লু-ইকোনমির অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে টেকসই মৎস্যসম্পদ আহরণ ও সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ব্যাপক গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া সামুদ্রিক পর্যটনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। সমুদ্রে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ আহরণের পাশাপাশি পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে ব্যাপক কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দেশের স্বার্থে সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও সদ্ব্যবহারে এখনই টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadonsarker2005@gmail.com

"