পর্যবেক্ষণ

ব্যতিক্রমধর্মী বৃক্ষরোপণ

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

এ বছরের বৃক্ষরোপণ অভিযানের প্রতিপাদ্য হলো- ‘সবুজে বাঁচি সবুজ বাঁচাই, নগর-প্রাণ-প্রকৃতি সাজাই।’ বর্তমানে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৫১ ভাগেরও বেশি লোক নগরে বসবাস করে। যত দিন যাচ্ছে নগরবাসীর সংখ্যা ও সমস্যা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩৩ ভাগ, অর্থাৎ ৫ কোটি ৬১ লাখ লোক নগরে বসবাস করে। ২০২০ সালে সাড়ে ৮ কোটি এবং ২০৫০ সালে প্রায় ২১ কোটি লোক নগরে বসবাস করবে, তখন দেশে গ্রাম বলে আর কিছুই থাকবে না।

জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ভাঙন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার কারণে মানুষ বাড়িঘর হারিয়ে পৈতৃক ভিটামাটি ত্যাগ করে, বাঁচার তাগিদে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসার সুযোগ-সবিধা ও উন্নত জীবনযাপনের প্রতাশায় প্রতিনিয়ত মানুষ গ্রাম থেকে নগরে যাচ্ছে। নগরমুখী মানুষের এই স্রোত কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে নগরই হবে মানুষের স্থায়ী ঠিকানা। এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তাই স্থায়ী ঠিকানাটিকে বাসযোগ্য, নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর এবং সবুজে সুন্দর করে সাজিয়ে টেকসই করে গড়ে তোলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সেদিক থেকে এবারের প্রতিপাদ্যটি খুবই বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী।

অপকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়নের নামে মানুষ গাছপালা কেটে, বনভূমি ধ্বংস করে এবং প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট করে নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনছে। ফলে বায়ুম-লের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। অসময়ে অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা, বজ্রপাত, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ ও তীব্রতায় জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে খেতের ফসল। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র। সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, যানজট, বায়ুদূষণ, পানিদূষণের মতো জটিল সমস্যা। এসব কারণে আমাদের নগরগুলো দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে নগরের ছাদে, বারান্দা, বেলকোনি, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রাস্তার পাশ, লেকের ধার, সড়কদ্বীপ ও কল-কারখানার খালি জায়গায় পরিকল্পিতভাবে ব্যাপকহারে ফলদ, বনজ ও ভেষজ বৃক্ষ রোপণের কোনো বিকল্প নেই।

বৃক্ষ মানুষের প্রকৃত বন্ধু। বৃক্ষের অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। বৃক্ষ না থাকলে পৃথিবীতে প্রাণীকূল এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে পারত না। বৃক্ষ বায়ুম-ল থেকে কার্বনডাই-অক্সইড গ্রহণ করে, অক্সিজেন ত্যাগ করে, সেই অক্সিজেন গ্রহণ করেই প্রাণীরা পৃথিবীতে বেঁচে আছে। বায়ুম-লের তাপমাত্রা, আদ্রর্তা, বৃষ্টিপাত, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস নিয়ন্ত্রণে বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। বৃক্ষ নদী ভাঙন ও ভূমিক্ষয় থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে। বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ রোধ করে। মাটির উর্বরতা শক্তি সংরক্ষণে সহায়তা করে। মানুষ ও অন্য প্রাণীদের খাদ্য জোগায়। শিল্পের কাঁচামাল ও জ্বালানি সরবরাহ করে। বন্য প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। জীববৈচিত্র সংরক্ষণে সহায়তা করে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করে। ইন্ডিয়ান ফরেস্ট রিসার্স ইনস্টিটিউটের এক গবেষেণা থেকে জানা যায়, একটি গাছ তার ৫০ বছরের জীবনে কার্বনডাই-অক্সাইড গ্রহণ, অক্সিজেন ত্যাগ, বায়ুদূষণ রোধ, বন্যপ্রাণীর আশ্রয়, মানুষের খাদ্য জোগান প্রভৃতি কাজে পৃথিবীর প্রাণীকূলকে ৩৫ লাখ টাকার বিভিন্ন রকমের সুবিধা প্রদান করে থাকে।

প্রশংসার দাবিদার বন্ধুসভার সদস্যরা। এ বছর তাদের সারা দেশে ১ লাখ গাছ লাগানোর কর্মসূচি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার ও ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তারা গত বছর মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথাকে স্মরণীয় করে রাখতে ৭১ হাজার গাছের চারা রোপণ করেছে। এ বছর তারা ১ লাখ গাছের চারা বিতরণ ও রোপণ করেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। এ গাছের চারা তারা উৎসর্গ করেছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শোকের মাসে এটা জাতির জনকের প্রতি বন্ধুদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। জানা যায়, খুলনা বন্ধুসভার সদস্যরা ৫০০ তালের বীজ রোপণ করেছে। এ তাল গাছগুলো শুধু এক পায়ে দাঁড়িয়ে আকাশে উঁকিই মারবে না, মানুষকে বজ্রপাত থেকেও রক্ষা করবে। হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় বন্ধুদের জীবন বাঁচাতে যে যুবক হাসিমুখে নিজের জীবন উৎসর্গ করে, সেই ফারাজ আইয়াজ হোসেনের নামে চট্টগ্রাম বন্ধুসভা ৯ হাজার ৬৭৬টি গাছের চারা রোপণ করে বৃক্ষ রোপণের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ফারাজের বন্ধুপ্রীতি ও বীরত্বের কাহিনী সারা বিশ্বের মানুষ জানে। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসে উপকূল অঞ্চলে ১০ লাখ মানুষের মুত্যু হয়। ওই ঘূর্ণিঝড়ে আবিদ হাসানের দাদাও মৃত্যু বরণ করেন। দাদার স্মৃতির উদ্দেশে ভোলাতে রাজশাহী বন্ধুসভার বন্ধু আবিদ হাসান ৫০০ সুপারি গাছের চারা রোপণ করে। চাঁপাইনবাগঞ্জের বন্ধুরা করেছে অন্য রকম এক প্রসংশনীয় কাজ। তারা বৃক্ষ রোপণের প্রবাদ পুরুষ কার্তিক প্রামাণিকের বাড়িতে লাগিয়েছে ১০টি গোলাপের গাছ এবং গাছগুলোর নাম দিয়েছে ‘কাতির্ক গোলাপ’। চাপাইয়ের বন্ধুরা কার্তিক প্রামাণিকের হাতে তুলে দেয় সম্মাননা ক্রেস্ট। কার্তিক প্রামাণিক চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর গ্রামের অতি সাধারণ একজন মানুষ। বাজারে চুল কাটা তার পেশা। কার্তিক প্রামাণিকে বাবা বৃক্ষ রোপণকে খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করতেন। তিনি বলতেন, ‘গাছ লাগানো অনেক পুণ্যের কাজ। কী হবে গয়া-কাশী গিয়ে? তার চেয়ে বেশি পুণ্য হবে গাছ লাগালে।’ বাবার এই উপদেশ শুনে শৈশব থেকে জীবনের দীর্ঘ ৫৭টি বছর তিনি নিঃস্বার্থভাবে নিজ গ্রাম; শ্যামপুরের রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, ঈদগাহ-কবরস্থান, মসজিদ-মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সীমান্ত ফাঁড়িতে অসংখ্য গাছ লাগিয়েছেন। সন্তানের মতো যতœ করে প্রতিটি গাছকে বড় করে তুলেছেন পরম মমতায়। নিজের হাতে লাগানো গাছের শ্যামল ছায়ায় দাঁড়িয়ে খুঁজেছেন মানবজীবনের সার্থকতা। কার্তিক প্রামাণিকে মতো বৃক্ষরোপণ করে একটি গ্রাম নয়, একটি দেশ নয়, একটি মহাদেশের চেহার পাল্টে দিয়েছেন, সবুজের সমারোহে ভরিয়ে দিয়েছেন, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচনে ও নারীর ক্ষমতায়নে অভূতপূর্ব আবদান রেখেছেন আফ্রিকান এক নারী। তার নাম ওয়াঙ্গেরি মাথেই। তিনি কেনিয়া থেকে পৃথিবীতে সবুজ বিপ্লব ছড়িয়ে দেওয়ার অগ্রনায়কের ভূমিকা পালন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বিশ্ববাসীকে।

লেখক : সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি)

netairoy18@yahoo.com

"