বিশ্লেষণ

উন্মোচিত হোক বোধের দরোজা

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

এস এম মুকুল

‘তোমার যা প্রয়োজন নেই তা এখানে রেখে যাও। অন্য এক স্থানে লেখা আছে, তোমার যা প্রয়োজন তা এখান থেকে নিয়ে যাও।’ আহা কী অসাধারণ অমীয় বাণী। স্কুলে একটি দেয়ালের নাম দেওয়া হয়েছে মহানুভবতার দেওয়াল। দেয়ালের এক স্থানে লেখা আছে তোমার যা প্রয়োজন নেই তা এখানে রেখে যাও। অন্য এক স্থানে লেখা আছে তোমার যা প্রয়োজন তা এখান থেকে নিয়ে যাও! দেয়ালে লাগানো আছে কিছু হ্যাঙ্গার। হ্যাঙ্গারে শিক্ষার্থীরা যার যার ঘর থেকে যা প্রয়োজন নেই এমন কাপড়-চোপড় ঝুলিয়ে রাখছে। আবার একই স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে যার যা প্রয়োজন আছে তারা এখান থেকে তা নিয়ে যাচ্ছে। এই শিক্ষা শিক্ষার্থীদের জন্য বুনিয়াদি আমাদের সমাজ জীবন থেকে মানবতাবোধ যখন বিলুপ্তির পথে এমন সময় এ ধরনের উদ্যোগ জাতির মননে নতুন আশাবাদ জাগাবে এটাই স্বাভাবিক। তবে উদ্যোক্তা মহান এই শিক্ষকের মতে, একজনের কাছে যা তুচ্ছ, অন্যজনের কাছে তাই-ই হতে পারে অনেক মূল্যবান। হোকনা তা একটি ব্যবহৃত কাপড়, পুরনো বই অথবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস। আমাদের ঘরে কতকিছুই তো ফেলনা অবস্থায় পড়ে থাকে বছরের পর বছর। অথচ এই জিনিসগুলোই হয়তোবা কারো জন্য অতীব দরকারি। অপরদিকে সামর্থ্যরে অভাবে হয়তোবা অন্য কেউ দরকারি জিনিসটির চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। অথচ আমাদের কাছে কত অবহেলায়, অযথা, অকারণে পড়ে থাকে এমন অনেক জিনিস। আমরা কি এভাবে কখনো ভাবি, আমাদের ভোঁতা হয়ে যাওয়া আত্মকেন্দ্রিক মননে কখনো কি প্রশ্ন জাগেÑ যা আমার দরকার নেই, আমি কেন তা অযথা জমিয়ে রাখব। অথচ আরেকজনের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সে তা পাবে না। এটা কি ধরণে মানবিক সমাজ। আমিইবা কীভাবে নিজেকে সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব মনে করব!

মানবিক ও মৌলিক শিক্ষা। এই মানবতার দেয়াল প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চালু হওয়া দরকার। তাহলে সময়ের ব্যবধানে সমাজ থেকে বৈষম্যের দেয়াল উঠে যাবে। সামাজিক বৈষম্য দূর করতে কিশোরগঞ্জে শুরু হয়েছে অভিনব এই কর্মপন্থা। বিত্তবানদের দরিদ্রদের পাশে দাঁড়াতে এমনই এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন সদর উপজেলার দক্ষিণ মুকসুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। এমন একটি পোস্ট ফেসবুক, অনলাইনের জগতে ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েক দিন ধরেই। বলতে দ্বিধা নেই ঘুণেধরা এই অসুস্থ্য, অসামাজিক, আত্মকেন্দ্রি সমাজে সততার নিদর্শন স্থাপন করা খুবই জরুরি। সততার পুরস্কার, মূল্যায়ন এবং সৎ মানুষদের সম্মানিত করা তারচেয়েও জরুরি। কারণ চারপাশে অসততার দাপট অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। আজকে যারা শিশু, কিশোর, তরুণ-যুবা আগামিতে তারাই নেতৃত্ব দিবে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে। তাই তাদের মাঝে সততার বুনিয়াদি শিক্ষা এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সামনে সততার প্রকৃত মূল্যায়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা অত্যাবশকীয় কাজ। আমরা দেখেছি, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার গাংনগর দ্বিমুখী দাখিল মাদ্রাসার দোকানদারবিহীন সততা স্টোর দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এরপর বিভিন্নস্থানে এই মডেল অনুসৃত হতে দেখা গেছে। সততা স্টোরে নেই কোনো দোকানি, কোনো সিসি ক্যামেরার নজরদারিও নেই। স্টোরে জিনিসপত্রের গায়ে দাম লেখা আছে। দাম অনুযায়ী খাতা-কলম বা অন্য কোনো শিক্ষাসামগ্রী নিয়ে নির্ধারিত বাক্সে টাকা রাখতে হয়। দরদাম ছাড়াই শিক্ষার্থীরা সানন্দে কেনাকাটা করতে দেখা গেছে ‘সততা স্টোর’ থেকে। এটিও একটি বুনিয়াদি শিক্ষা। সংকোচহীনভাবেই বলা যায়, সততা স্টোর অসততায় অন্ধ সমাজে সততা চর্চার মহৎ উদাহরণ। সততা সমাজে একেবারে নেই এমন কথা বলা যাবে না। কিন্তু অসৎ লোকের দাপটে সৎ মানুষেরা সমাজে প্রায় নিগৃহিত হবার অবস্থায়। আবার সততা ব্যক্তি পর্যায়ে যেমন কমছে, তেমনি সততার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে। হয়তোবা একারণেই বিশ্বব্যাপী ক্ষমতা ও দুর্নীতি শব্দ দুটি ক্রমেই একাকার হয়ে যাচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের নামে অনিয়ম, দুর্নীতি তথা অসততার অভিযোগ অতি নগন্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পানামা পেপারস এবং প্রকাশিত প্যারাডাইস পেপারসে বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনীতিকদের পাশাপাশি ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের নামও উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির চরম দুর্দশায় বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস নামের একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন ১৭৩টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের কর্মকান্ড বিশ্লেষণ করে সৎ নেতৃত্বের তালিকায় তিন নম্বরে আছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটি বাংলাদেশের জন্য গর্ব করার খবর হলেও সমাজের সর্বস্তরে দুর্র্নীতি আর অসততার বেপরোয়া প্রভাব যেন আমাদের উঁচু মাথাকে নিচু করে দেয়। আমরা খুবই আশাবাদী হয়ে বলতে চাই আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর সততার এই নিদর্শন সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়–ক। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার উদ্যোগটিও প্রধানমন্ত্রীকেই নিতে হবে। আমাদের বিশ্বাস সরকার, প্রশাসন ও দল থেকে দুর্নীতি দূর করতে পারলে এর প্রভাব অন্যসব ক্ষেত্রেও পড়তে বাধ্য। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রে সৎ মানুষ আর সততার যথাযথ মূল্যায়ন, সন্মাননা ও পুরস্কার প্রথা চালু করলে অসততার দাপট ধীরে ধীরে কোণঠাসা হতে বাধ্য। আর সমাজে সততার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী গর্বিত অর্জন সততা আরো বেশি সার্থক হয়ে উঠবে।

খবরে প্রকাশ সততা ও দক্ষতার পুরস্কার পাবেন বাংলাদেশের ব্যাংকাররা। কর্মক্ষেত্রে সততার নিদর্শন, শৃঙ্খলাবোধ, পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতার পুরস্কার হিসেবে ব্যাংকারদের এমন সম্মাননার কথা বলা হয়েছে। সব ব্যাংক নিজ নিজ উদ্যোগে প্রতি বছর ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে এ পুরস্কারের জন্য যোগ্যদের নির্বাচিত করবে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতরা সার্টিফিকেটের পাশাপাশি এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ পাবেন এমন নির্দেশনাসহ ‘শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদান নীতিমালা’ জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দুর্নীতিতে ভরাডুবির এই ব্যাংক খাতে এটি খুবই আশাবাদের ক্ষেত্র হতে পারে। যদিও এতে অসৎ আর দুর্নীতিবাজদের চরিত্র ঠিক হবে কি না, কে জানে। তবে পাশাপাশি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশের উদ্যোগ নিলে সর্বজনে স্বস্তি আসতো। এই শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রত্যোক সরকারি বেসরকারি সংস্থায় প্রবর্তন করলে একটা ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটবে সমাজে। সমাজে সততার মর্যাদা প্রতিষ্টায় দুর্নীতি দমন কমিশন ‘সততাই সর্বোত্তম নীতি’ এই আদর্শে তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে চালু করেছে সততা সংঘ নামক সামাজিক সংগঠন। প্রজন্মের মাঝে সততা, নিষ্ঠাবোধ ও চারিত্রিক দৃঢ়তা সৃষ্টি করা; দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘৃণার জাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের নিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে স্থানীয় প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘সততা সংঘ’ গড়ে তুলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুর্নীতি দমন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ‘সততা সংঘ’ হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সততা, নৈতিকতা, মূল্যবোধকে প্রোথিত করার মানসে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে গঠিত সংগঠন। প্রতিটি সততা সংঘ- এ একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১১ জন শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে কার্যনির্বাহী কমিটি এবং ৩ থেকে ৫ জন শিক্ষকের পরামর্শক কাউন্সিল গঠন করা হয়। সততা সংঘের সদস্যদের নিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির তত্ত্বাবধানে উপজেলা, জেলা ও শহরগুলোতে মানববন্ধন, পদযাত্রা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা, নাটক, বিতর্ক, কার্টুন ও রচনা প্রতিযোগিতাসহ বহুমূখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সেখানে বলা হয়েছে কমিশন বিশ্বাস করে, এর ফলে আগামী প্রজন্ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। আমাদেরও প্রত্যাশা তাই যেন সত্যি হয়। তথ্যানুযায়ী দেশজুড়ে সততা সংঘের সংখ্যা ঢাকা ও ময়মনসিংহ ৬ হাজার ১৬টি, চট্টগ্রাম ৪ হাজার ৪৫৪টি, রাজশাহী ও রংপুর ৭ হাজার ৩৫১টি, খুলনা ৪ হাজার ৭৭টি, বরিশাল ২ হাজার ২৫৫টি, সিলেট ১ হাজার ৩০৫টি। সারাদেশ মিলিয়ে ২৫ হাজার ৪৪১টি সততা সংঘের প্রকৃত জাগরণ ঘটাতে পারলে সমাজে এর সুফল সুনিশ্চিত করা যাবে। আমরা দেখেছি, অতিসম্প্রতি শিক্ষার্র্থীদের আন্দোলনটি জনমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। সেই সঙ্গে দাবিও উঠেছে এই শিক্ষার্থীরা যদি তাদের অভিভাবকদের (পিতা-মাতার) আয়ের উৎস নিশ্চিত হতে পারে তাহলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসার পাশাপাশি সমাজের দুর্নীতিবাজরা প্রিয় সন্তানদের কাছে হেয় হবে সবার আগে। আর ঘর থেকেই এমন শুদ্ধি অভিযানের সূচনা হলে এ সমাজ থেকে দুর্নীতি ও অসততা হঠানো অনেকটাই সম্ভব হবে।

লেখক : বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

writetomukul36@gmail.com

"