স্মরণ

মৌলিক সাম্যতায় কফি আনান

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

যেখানেই সমস্যার খোঁজ পেতেন সেখানেই পৌঁছে যেতেন কফি আনান। গভীর সমবেদনায় জয় করেছেন হাজারো মানুষের জীবন। অকৃত্রিম ভালোবাসা নিয়ে কাজ করে গেছেন অন্যের জন্য। কফি আনান ছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিবের দায়িত্ব পালনকারী প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৬ পর্যন্ত দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তীতে সিরিয়ায় জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। জড়িত ছিলেন মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমস্যার সমধান প্রক্রিয়ায়। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান আর নেই। ৮০ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এই নোবেল জয়ী। অল্প কিছুদিন ধরে অসুস্থ হয়ে সুইজারল্যান্ডে ছিলেন তিনি। এক বিবৃতিতে বলা হয়, কফি আনান ছিলেন সারা বিশ্বের। জীবনভর তিনি শান্তির জন্য কাজ করেছেন। বেড়ে উঠেছেন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। ব্রিটিশ শাসন আমলে তার দাদা ছিলেন একজন নেতা এবং তার বাবা ছিলেন প্রাদেশিক গভর্নর। ভবিষ্যতের কূটনৈতিক কফি আনানের ১৯ বছর বয়স হওয়ার দুই দিন আগে ঘানা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মানচিত্রে স্থান নেয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আর কখনো কারো অধীনে থাকতে হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে প্রথমে তিনি সদ্য স্বাধীন নিজের দেশেই প্রথম চাকরি করেন। তারপর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকালেস্টার কলেজের অর্থনীতেতে পড়াশোনা করেন। এমআইটিতে পড়েছিলেন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। ম্যাকালেস্টার কলেজে থাকাকালীন জাতিসংঘে চাকরি শুরু করেন। ১৯৬২ সালে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাজেট অফিসার হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৭৪-৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি ঘানার ট্যুরিজম বিভাগের পরিচালক ছিলেন। ১৯৮০ সালে তিন জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত জাতিসংঘের তিনটি বিভাগের (মানবসম্পদ, ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা) দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ১৯৯০ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত পরিকল্পনা, বাজেট ও অর্থ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন কফি আনান। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত শান্তিরক্ষা মিশনের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি জাতিসংঘের মহাসচিবে অধীনের শান্তিরক্ষা মিশনের প্রধান হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, পরিচিত পরিবেশে জমকালো এই উৎসবে তোমাদের অভিনন্দন জানানোর সুযোগ পেয়ে আমি আনন্দিত। উচ্চশিক্ষার জন্য বোস্টনে বেশ ভালো কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু কোনোটাই এমআইটির মতো নয়। সম্মানিত প্রেসিডেন্ট, ট্রাস্টিজ ও সুধী, আসুন, এমআইটির সবচেয়ে মেধাবী ও উজ্জ্বল, নিবেদিতপ্রাণ ও স্বাপ্নিক শিক্ষার্থীদের উষ্ণ অভিনন্দনে সিক্ত করি। কিন্তু হে গ্র্যাজুয়েটরা, শোনো, তোমরা নিশ্চয় খুব ভালো করেই জানো যে এটা তোমরা একলাই করোনি। তাই এসো, যারা সবসময় তোমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তোমাদের মা-বাবা ও প্রিয় বন্ধুদের করতালির মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা জানাই। তোমরা এখন মুক্ত, পরীক্ষার চাপ থেকে মুক্ত। তোমাদের সামনে এখন অবারিত জীবনের নতুন যাত্রাপথ। শিক্ষাজীবনের যত ঋণ, যত দায়, সেসব শোধার সময় এখন। তিনি আরো বলেছেন, আজ যেখানে তোমরা বসা, একদিন আমিও সেখানটায় বসেছিলাম। কিলান কোর্টে আজ তোমাদের এই আনন্দমাখা মুহূর্তে মনে পড়ে যায় ২৫ বছর আগের কথা। তখন আমি এই এমআইটিতে পড়তাম। এখানে সেøান ফেলো (এমআইটিতে ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স) হিসেবে আমি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জন করেছিলাম। শিখেছিলাম আরো গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই। শুরুতে সহপাঠীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেশ ছিল। আমি বলব, সবার মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। সফল হওয়ার জন্য এবং নিজ নিজ নেতৃত্বগুণ প্রমাণের জন্য প্রত্যেকেই সমান সংকল্পবদ্ধ ছিল। আমাদের মধ্যে কোনো মেয়ে শিক্ষার্থী ছিল না। আমি অসম্ভব রকম খুশি যে সেটা আজ বদলেছে। প্রথম পর্বের মাঝামাঝি সময়ের কোনো একদিন চার্লস নদীর তীরে হাঁটছিলাম। হাঁটছিলাম আর ভাবছিলাম আমার উদ্বেগ আর সংশয় নিয়ে। এত মেধাবীর ভিড়ে কীভাবে টিকে থাকব, কীভাবে সফল হব? জবাবটা যেন ভেতর থেকেই পেলাম, অন্যকে অনুকরণ করো না, আপন ইচ্ছার অনুচারী হও। হৃদয়ের কথা শোনো। বাঁচতে হলে বাছতে হবে। কিন্তু বাছবিচারের আগে তোমাকে অবশ্যই জানতে হবে, তুমি কে? তোমার স্বপ্ন কী? তোমার গন্তব্য কোথায়? কেন সেথায় যেতে চাও তুমি? দেখলাম, ধীরে ধীরে আমার উদ্বেগ উবে গেল। এমআইটি থেকে ফল হিসেবে আমি শুধু যে এক ধরনের বিশ্লেষণী শক্তি অর্জন করেছিলাম তা-ই নয়, নতুন যেকোনো পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া কিংবা যেকোনো চ্যালেঞ্জকে সম্পূর্ণ নতুন কিছু সৃষ্টির সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবে দেখা এবং কাজের বেলায় সহকর্মীর মতামত নিলেও শেষে নিজের কাজটা নিজের মতো করেই করা ইত্যাদি বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আস্থা বা আত্মবিশ্বাসটাও অর্জন করেছিলাম এমআইটি থেকে।

তিনি আরো বলেছিলেন, এমআইটির অ্যালামনাইদের কথা যখন কেউ ভাবে, দেখে তাদের মধ্যে কেউ পদার্থ বিজ্ঞানে কেউ রসায়নে, কেউ বা অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আবার কেউ হয়েছেন সফল ব্যবসায়ী, কেউ বা প্রকৌশলী, যারা নানা উপায়ে আমাদের জীবনমান আরো উন্নত করে চলেছেন। কিন্তু কেউ কী ভেবেছে, জাতিসংঘের একজন মহাসচিব হবে এমআইটি থেকে? কোনো টিভি কুইজে চটপট এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া একটু কঠিনই ছিল বটে। যা হোক, আমরা এমন এক জাতিসংঘের স্বপ্ন দেখি, যেটি আরো বেশি বন্ধুপ্রতিম হবে। এই পরিবর্তন তার নিজের জন্য নয়, যেন ভালো কিছু করার জন্য সবাই সুযোগ পায় সে জন্য। আরো স্বচ্ছ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যসহ আরো বন্ধুত্বপূর্ণ এবং আরো বেশি দায়িত্বশীল জাতিসংঘের স্বপ্ন দেখি আমরা। আমরা সেই জাতিসংঘ চাই, যা শুধু তার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জনগণের জন্য নয়, বরং গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করবে গোটা বিশ্বের সব মানুষের জন্য। আমরা নিজ নিজ আদর্শের জন্য সংগ্রাম করি। জীবনে সংগ্রাম করাটাই তো চিরসত্য। দরিদ্র দেশের ছোট্ট কোনো গাঁয়ে নাকি বেকন হিলেÑ কোথায় একটি শিশু জন্ম নিল সেটি মুখ্য বিষয় নয়। আমি বিশ্বাস করি সব মানুষের আত্মমর্যাদা ও মৌলিক সাম্যতায়। আমি বিশ্বাস করি, সব মানুষ শান্তি চায়। আমরা অসাধারণ সুন্দর এক পৃথিবীর বাসিন্দা। যদিও তা বিভক্ত বিভিন্ন দলে, তবু আমরা এক মানবসম্প্রদায়ের অংশ। মহৎ উদ্দেশ্য সাধনে তোমাদের সহযোগিতা দরকার। ১৯৯৭ সালের এই ব্যাচের তোমরা যে যেখানেই যাও, ভবিষ্যতে যে যা-ই করো না কেন, তোমরা সেই পৃথিবীতে যোগ দিতে যাচ্ছ, উত্তরোত্তর যার বিশ্বায়ন ঘটছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেখানে তোমরা সবাই এক হয়ে কাজ করবে।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান সামরিক অভিযানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে মিয়ানমারকে চাপ দিতে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ শরণার্থী সংকট নিরসনে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোকে অবশ্যই মিয়ানমারের সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। এ সংকট নিরসনে মিয়ানমার সরকারের আমন্ত্রণে গঠিত একটি পরামর্শ কমিশনের নেতৃত্ব দেন আনান। এ ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনায় রাখলেও কূটনীতিকরা জানান, মিয়ানমারের সাবেক জান্তা সরকারের সমর্থক চীন ও রাশিয়া এমন পদক্ষেপ গ্রহণের বিরোধিতা করছে। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাসহ রাখাইন রাজ্যের সব জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে মিয়ানমার সরকারকে পরিচয় যাচাইয়ে একটি সমন্বিত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে রাখাইন রাজ্যবিষয়ক পরামর্শক কমিশন। মিয়ানমারে নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারে পরিচয় যাচাইয়ের এখনকার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকায় রোহিঙ্গা এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজন নাগরিকত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশন তাদের সুপারিশে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়াসহ দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে একটি যৌথ কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে। আন্তর্জাতিক আইন মেনে যৌথ পরিচয় যাচাই শেষে মিয়ানমারের লোকজনকে দেশে ফেরার পথ সুগম করবে ওই কমিশন।

কফি আনানের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের ওই কমিশনের ছয়জন মিয়ানমারের বিশিষ্ট নাগরিক। কমিশনের আগস্টের শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে। রাখাইনের সব জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের কার্ড ছাড়াই সব শিশু এবং নাগরিকদের বংশধররা যাতে আপনা-আপনি নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারে, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া নাগরিকত্বের আওতায় শিশুদের আনার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সরকারকে প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে জন্ম নিবন্ধনের জন্য একটি সমন্বিত প্রচারণা চালাতে হবে। নাগরিক হিসেবে যাদের পরিচয় নিশ্চিত হবে, চলাফেরাসহ তাদের সব ধরনের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আনান কমিশন সহিংসতার কবলে পড়া রাখাইনের সব নাগরিকের জন্য কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে বলেছে। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী লোকজনকে বিচারের আওতায় আনতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রস্তাব করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনটি তে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়াসহ দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কোন্নয়নে যৌথ কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে। কমিশন মনে করে, দুই দেশের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত কমিশন আন্তর্জাতিক আইন মেনে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরার পাশাপাশি মানব, মাদক ও অবৈধ বাণিজ্য, অবৈধ অভিবাসন বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com

"