মতামত

গুজব একটি ভয়ংকর ব্যাধি

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

রায়হান কবির

মিথ্যা সব নষ্টের মূল। আর গুজব হলো মহামারী ব্যাধির মতো। মিথ্যাচার ও গুজব প্রপঞ্চ দুটি শান্তিবিনষ্ট এবং সহিংসতা ও নৈরাজ্যের প্রধান নিয়ামক। সত্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু মিথ্যার শক্তিও কিছু কম না! কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিথ্যার কাছে ‘সত্য’ বড় অসহায়! সত্যকে সবসময় নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু মিথ্যা কখনোই নিজেকে প্রমাণের ধার ধারে না। মিথ্যাচার, প্রোপাগান্ডা ও গুজব জন্ম নেয় কেবল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং সন্দেহ ও ভেদাভেদ তৈরির অভিপ্রায়ে। এ কারণেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘মিথ্যারও মাহাত্ম্য আছে। হাজার হাজার মানুষকে পাগল বানিয়ে দিতে পারে মিথ্যার মোহ। চিরকালের জন্য সত্য হইয়াও থাকিতে পারে মিথ্যা।’

আসলেই কী তাই, মিথ্যা কী চিরকালের জন্য সত্য হয়ে থাকতে পারে? হয়তো পারে! হয়তো পারে না! তবে ইতিহাসে মিথ্যাকে সত্য বলে গ্রহণের অসংখ্য নজির রয়েছে। কোনো মিথ্যা সুপরিকল্পিতভাবে এবং সংগঠিত হয়ে প্রচার করা হলে তা সত্য বলে প্রতীয়মান হয়! অনেক ক্ষেত্রে সর্বজন গ্রাহ্য না হলেও সমাজের কোনো কোনো অংশ যখন মিথ্যা কিংবা গুজবকে বিশ্বাস করতে থাকে, তখন তা সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। আডলফ হিটলার যেমন বলেছিলেন, ‘যদি কোনো মিথ্যাকে তুমি বারবার এবং সাবলীলভাবে বলতে পারো, তবেই তা বিশ্বাসযোগ্য হবে।’

শিক্ষার্থীরা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তাতে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ সেøাগানে কণ্ঠ মিলিয়েছে বাংলার আকাশ-বাতাস জল-সমতল। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল স্বপ্নের একটি সিঁড়ি। কিন্তু এক সপ্তাহ যেতেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হলো শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে আন্দোলনের মধ্যে বহিরাগতদের ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। বহিরাগত ক্যাডাররা নকল স্কুল ড্রেস ও ভুয়া আইডি কার্ড বানিয়ে আন্দোলনে প্রবেশ করে উসকানিমূলক আচরণ ও গুজব ছড়িয়ে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এমনকি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সংঘাতের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা রেজওয়ানের ভাষ্য মতে সরকারবিরোধী পক্ষ তার ফেসবুক আইডিটি হ্যাক করে নানা গুজব ও মিথ্যাচার ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাশের-কেল্লাসহ বিভিন্ন আইডি থেকে পরিকল্পিতভাবে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার চালানো হয়েছে।

গুজব সৃষ্টিকারীদের অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে। দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী তাদের গ্রেফতার করায় বাকস্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অথচ মিথ্যাচার ও গুজবের ক্ষতির প্রশ্নে নীরব থাকছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণœ হলে গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়। কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে অসত্য ও বিকৃত তথ্য ব্যবহার কিংবা নিজের দাবি জানাতে গিয়ে অন্যের অধিকার ক্ষুণেœর অধিকার কারো নেই। গুজব ছড়ানোর অধিকার কারো নেই।

২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতের ঘটনার পর গুজব রটানো হয় হাজার হাজার আলেমকে হত্যা করা হয়েছে। ওই বছর একাত্তরের ঘাতক মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী সাঈদীকে ‘চাঁদে দেখা যাওয়া’র গুজব ছড়িয়ে বগুড়াসহ সারা দেশে বিভীষিকাময় সহিংসতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। আমার দেশ পত্রিকায় পবিত্র মক্কা শরিফের গিলাফ নিয়ে ভুয়া খবর প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে গুজব ছড়িয়ে বৌদ্ধমন্দির ও বসতিতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। আর ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর এবং গত বছর রংপুরে গুজব ছড়িয়ে হামলা চালানো হয়েছিল সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে।

এ দেশের রাজনীতি গুজবের ব্যবহার শুরু পাকিস্তান আমল থেকে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে¡ ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সর্বাত্মক হরতাল পালিত হলেও সরকারি প্রেসনোটে বলা হয়, ‘কেবল হিন্দু দোকানপাট বন্ধ ছিল’! ৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রহত্যার পর আইনসভায় মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন বলেছিলেন, ‘হিন্দু কমিউনিস্টদের উসকানি আছে। তাদের নির্মূল করব।’ ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে গুজব রটানো হয়Ñযুক্তফ্রন্টকে ভোট দিলে ইসলাম ধর্ম বিপন্ন হবে, পূর্ববাংলা ভারতের অংশ হয়ে যাবে, যুক্তফ্রন্ট হিন্দু ভাষা ও সংস্কৃতি আমদানি করতে চাইছে, ভারত থেকে হিন্দুরা এসে দলে দলে যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিয়েছে! এরপর মুখ্যমন্ত্রী হয়ে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেব চিকিৎসার জন্য কলকাতা গিয়ে একটি সংবর্ধনা সভায় বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে গুজব সৃষ্টিকারীরা বলতে থাকে, শেরেবাংলা বিচ্ছিন্নতাবাদী, ভারতের দালাল ও বিশ্বাসঘাতক। সে সময় একই সুরে কথা বলতে থাকে সাম্রাজ্যবাদী প্রচারযন্ত্রও। এখনো সা¤্রাজ্যবাদী ও মৌলবাদী প্রচারযন্ত্রগুলো সেভাবে গুজব ও মিথ্যাচারের পক্ষাবলম্বন করছে।

৬২-এর স্বৈরাচার আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় প্রচার ছিলÑ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ‘মুসলিমবিদ্বেষী হিন্দু’ এবং তার সাহিত্য বিজাতীয়, তাকে নিয়ে মাতামাতির অর্থ রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার তৎপরতা এবং মুসলমানদের জন্য তা হারাম! ইত্যাদি অপপ্রচার চালানো হয়েছিল। একইভাবে ৬৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহ প্রার্থী হলে, ‘ইসলামকে অবমাননার জন্য মহিলা প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। মহিলাকে ভোট দেওয়া ধর্মীয় দৃষ্টিতে হারাম! এসব গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। ৭৫-এর পর অপপ্রচার ছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশ ভারতের কাছে বিক্রি হয়ে যাবে। ১৯৯১-এর নির্বাচনের আগে স্বয়ং বিএনপি চেয়ারপারসন বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশে আজানের পরিবর্তে উলুধ্বনি শোনা যাবে।

সংগঠিত হয়ে কিংবা রাজনৈতিক শক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব রটানো ও মিথ্যাচারে লিপ্ত হলে তার ভয়াবহতা মারাত্মক। আমাদের দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও তাদের নেতাকর্মী, সমর্থকরা যুগের পর যুগ মিথ্যা ও অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। গুজব ও মিথ্যাচার বাংলাদেশকে যে পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন করেছে, তা হিসাবের খাতায় নিরূপণ করা সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে যত মিথ্যাচার ও গুজব ছড়ানো হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের প্রেক্ষাপট সৃষ্টিতেও পাকিস্তান-মার্কিনগোষ্ঠী বাংলাদেশে তাদের এজেন্টদের দিয়ে বিভিন্ন গুজব ও মিথ্যাচার রটিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক চাই, আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতার সৃষ্টি এবং একটি থমথমে অবস্থার মধ্যে গভীর রাতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাটের গোপন বৈঠক, তার গাড়িতে হামলা, বাংলাদেশের কিছু বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে আলাদা বৈঠক, যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা ইত্যাদি ঘটনার কি কোনো যোগসূত্র রয়েছে? এমন প্রশ্ন যদি করা হয়, তাহলে তার সঠিক উত্তর কী হবে তা আমার জানা নেই। কয়েকদিন আগে দু-একটি অনলাইন পত্রিকায় আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সিআইয়ের এজেন্ট হিসেবে দেশের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীর সক্রিয় হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাচন এলেই কিছু লোক সক্রিয় হয়ে ওঠেন। জাতির বিভিন্ন সংকটে সমস্যায় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। বন্যা, খরা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসে বিপর্যস্ত দুরবস্থাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায় না কখনো। শুধু নির্বাচন এলেই তাদের রাজনীতির মঞ্চে খুঁজে পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাংলার উর্বর মাটিতে যেমন সোনা ফলে, ঠিক তেমনি পরগাছাও জন্মায়। একইভাবে বাংলাদেশে কতগুলো রাজনৈতিক পরগাছা রয়েছে।’

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

"