বিশ্লেষণ

কোরবানির ঈদে চাঙা অর্থনীতি

প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

মোতাহার হোসেন

প্রবাদ আছে, ‘বাঙালি উৎসবপ্রিয় মানুষ’। আর এই উৎসবে চলে অর্থব্যয়ের মহোৎসব। এতে ঈদসহ প্রতিটি উৎসব-পার্বণে অর্থনীতি নতুন করে গতি পায়। উৎসব শুধু আনন্দ, বিনোদনের মধ্যে সীমিত থাকে না। এ উৎসবকে ঘিরে চলে কেনাকাটা। এটা শুধু কোরবানির ঈদে পশু কেনাকাটা কিংবা রোজার ঈদে সেমাই, চিনি কেনা নয়, সঙ্গে চলে কাপড়-চোপড়, ঘর সাজানো, সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন নতুন গহনা, দেশ-বিদেশে ভ্রমণ ইত্যাদি। মূলত এই বিশাল কর্মযজ্ঞে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়। এ কারণে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদে অর্থনীতি চাঙা হয় বেশিমাত্রায়।

শহরের অনেকেই নাড়ির টানে ইতোমধ্যে ঘরে ফিরে গেছেন, আবার কেউ কেউ যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। আর শহরে যারা আছেন তারাও কোরবানির পশু ও প্রয়োজনীয় কেনাকাটায় ব্যস্ত। অন্যদিকে, যারা দেশে থেকেও বাড়ি যেতে পারছেন না, আবার যারা প্রবাসে আছেন, তারা দেশে স্বজন-পরিজনদের কাছে টাকা পাঠাচ্ছেন ঈদ করার জন্য। ফলে ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতি চাঙা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূল থাকায় অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় এ ঈদে অর্থনীতি চাঙা থাকবে বেশি হারে।

চান্দ্র মাস হিসেবে আগামীকাল ২২ আগস্ট দেশে কোরবানির ঈদ উদ্যাপিত হবে। এ ঈদে পশু জবাইকে কেন্দ্র করে উদ্যাপিত হয় মূল উৎসব। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বর্তমানে দেশে গবাদি পশুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ দুই কোটি ৩৫ লাখ। ছাগল ও ভেড়া ২ কোটি ৫৫ লাখ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীলন সূত্র জানায়, এ বছর কোরবানির উপযোগী ১ কোটি ৪০ লাখ পশু রয়েছে। এর মধ্যে ৭০ লাখ ৫০ হাজার গরু ও মহিষ এবং ৬৯ লাখ ৫০ হাজার ছাগল ও ভেড়া। গত বছর কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখ পশু। অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, কোনো কারণে ভারত থেকে গরু আমদানি না হলেও এ বছর পশুর সংকট হবে না। বিগত সময়ের হিসাবে প্রতি বছর গড়ে ২০ লাখ গরু ভারত থেকে বাংলাদেশে আসে। সরকারি হিসাবে ২০১৩ সালে ভারত থেকে গরু আসে ২৩ লাখ ৭৪ হাজার। ২০১৪ সালে এসেছে ২০ লাখ ৩২ হাজার। ২০১৫ সালে ২২ লাখ। তবে সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে এবার আসার পরিমাণ কিছুটা কমবে।

অর্থনীতি চাঙা হওয়ার আরো বড় কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে গরুর মাংস রফতানি বেড়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বে ভারতের মাংস রফতানি ৩ দশকিক ৪২ গুণ বেড়েছে। ২০০৯ সালে দেশটি দশমিক ৬০৯ মিলিয়ন টন মাংস রফতানি করে। ২০১৪ সালে তা বেড়ে ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়। মাংস উৎপাদনে ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে দিয়েছে ভারত।

দেশের অর্থনীতিতে চামড়ার ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতি বছর দেশে দেড় কোটিরও বেশি পশুর চামড়া পাওয়া যায়। এর বড় অংশই আসে কোরবানির পশু থেকে। চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ খাতের মূল বাজার ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বাজারসহ এ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ লাখ টন, রসুনের ৬ লাখ টন ও আদা ৪ লাখ টন। এর উল্লেখযোগ্য অংশই কোরবানিতে ব্যবহার হয়। গরম মসলা বিশেষ করে এলাচি, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতারও উল্লেখযোগ্য অংশ কোরবানিতে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে ২০১৪-১৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০০ টন এলাচি, ৭ হাজার ৬০০ টন দারুচিনি, ১৭০ টন লবঙ্গ এবং ৩৭০ টন জিরা আমদানি হয়। কোরবানির বাজারে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হবে এসব পণ্যের। কোরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো কামার আইটেম। ছুরি, বঁটি, দা, চাপাতি, কুড়াল, রামদা ছাড়া কোরবানিই সম্ভব নয়। সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোরবানিতে পণ্যটির বাজার এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। ঈদ আসার ৩-৪ মাস আগে থেকে তারা সাধ্যমতো বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেন। ঈদের আগে তাদের এতই ব্যস্ত থাকতে হয়, কথা বলার সময় পর্যন্ত থাকে না।

এবারের ঈদ সামনে রেখে টাকার প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে। ঈদকে সামনে রেখে গত বছর প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিল ১৩১ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮৪ টাকা হিসেবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ১১ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, এ বছর রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের এক সমীক্ষায় বলা হয়, ঈদে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত যাচ্ছে ৬০০ কোটি টাকা। এ উৎসবে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব খাতে নিয়মিত প্রবাহের বাইরে অতিরিক্ত যোগ হচ্ছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল বিপুল অর্থ লেনদেনের বাইরে বেশ কয়েকটি খাতের কর্মকা- অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সাড়ে ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্ভাব্য বোনাস বাবদ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। দেশব্যাপী ৬০ লাখ দোকান কর্মচারীর বোনাস ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের সম্ভাব্য বোনাস ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ অর্থ ঈদ অর্থনীতিতে বাড়তি যোগ হচ্ছে।

ঈদকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বিস্তৃতি ঘটায় শহর-বন্দর, গাঁও-গেরামে। এক কথায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অর্থনীতির গতি সঞ্চার এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সিপিডির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘ঈদের অর্থনীতির আকার যা-ই হোক না কেন, দেশের ভেতরে এর মূল্য সংযোজন কতটুকু সেটা গুরুত্বপূর্ণ।’ কারণ অনেক পণ্যই এ উপলক্ষে আমদানি হয়ে আসে। মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভোগ্যপণ্যের চাহিদায়ও বৈচিত্র্য আসে। তাই ঈদ পার্বণকে ঘিরে অর্থনীতির গতিশলীতা, চাঙা ভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সরাসরি অর্থনৈতিকভাবে বেশি উপকৃত হয়। তবে প্রত্যাশা দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যাতে বছরের প্রতিটি দিন তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে, স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারে সেই ব্যবস্থা করা গেলেই তা অর্থনীতির জন্য হবে টেকসই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

motaherbd123@gmail.com

"