নিবন্ধ

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

সাধন সরকার

পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, বিশুদ্ধ পানি তো বটেই, চাহিদামতো পানি প্রাপ্তি নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। বলা হচ্ছে, পৃথিবীতে পরবর্তী কোনো বিশ্বযুদ্ধ হলে আর সেটা হবে পানি নিয়েই! পানি অপব্যবহার ও নষ্ট করা হলে তা ভবিষ্যতে সবার জন্য বিপদ বয়ে আনতে পারে। ঢাকা শহরে চাহিদার তুলনায় প্রয়োজনীয় পানি সব সময় পাওয়া যায় না। আবার বিশুদ্ধ পানি সংকটে নগরবাসীকে প্রায়ই ভুগতে হয়। নগরের কোনো কোনো এলাকায় বছরের অর্ধেক সময়ই বিশুদ্ধ পানির অভাবে ভুগতে হয়। শহরের কয়েক লাখ বস্তিবাসীর কাছে পানির জন্য লাইনে দাঁড়ানো তো নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য! আবার টাকার বিনিময়ে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া গেলেও তার মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। ঢাকা শহরে প্রয়োজনীয় পানির শতকরা ৮০ ভাগ আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আর ২০ ভাগ আসে ভূউপরিস্থ উৎস থেকে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে চলে যাচ্ছে। ভূগর্ভে তৈরি হচ্ছে ফাঁকা জায়গা, যা মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। আবার ভূউপরিস্থ উৎস থেকে অর্থাৎ বিভিন্ন নদীর পানি পরিশোধনের পর যে ২০ ভাগ পানি আসে, তার দূরত্ব ও খরচ দিন দিন বাড়ছে। তাই ঢাকা শহরের জন্য পানিপ্রাপ্তির সবচেয়ে উত্তম ও সহজ মাধ্যম হতে পারে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ। পানির প্রাকৃতিক উৎসের মধ্যে বৃষ্টির পানিই সহজে পাওয়া যায়। ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে নগরবাসীর প্রয়োজনীয় ১৫-২০ ভাগ পানির চাহিদা যেমন পূরণ হবে, তেমনি বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতাও কমবে।

সম্প্রতি রাজউক ‘ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা-২০১৭’-এর খসড়ায় এ সম্পর্কিত বিধান যুক্ত করেছে। এটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা রেখে ভবনের নকশা করতে হবে। এ ছাড়া একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে বৃষ্টির পানি যাতে আবার মাটির নিচে চলে যেতে পারে। সে জন্য বাসাবাড়ির চারপাশে কিছুটা খোলা জায়গা রাখার কথাও বিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়, সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের এ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’। এতে ছাদে জমা বৃষ্টির পানি পাইপের মাধ্যমে চলে যাবে বিশেষভাবে তৈরি ভূতলের চেম্বারে। সেখান থেকে প্রয়োজন অনুসারে এই পানি গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হবে। আবার অন্যভাবেও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা যায়। নির্মিতব্য প্রতিটি ভবনে এই পদ্ধতি কার্যকর করা গেলে বৃষ্টির পানি দিয়েই চাহিদার ১৫-২০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। সেই সঙ্গে বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার প্রকোপও কমে যাবে। বৃষ্টির পানি দিয়ে সবকিছু করা সম্ভব। তবে শুধু খাওয়া ও রান্না বাদেও যদি অন্যান্য কাজে (গোসল করা, বাথরুমে ফ্ল্যাশ, গাড়ি ধোয়া, বাগান করার কাজসহ অন্যান্য কাজ) বৃষ্টির পানি অনায়সে ব্যবহার করা যায়। এতে করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ অনেকখানি কমবে। ঢাকায় সব কটি রাস্তার ওপর যে পরিমাণ বৃষ্টির পানি পড়ে, তাতে ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা হওয়ার কথা না, জলাবদ্ধতা হয় তখনই, যখন সব ভবনের পানি রাস্তায় চলে আসে। কয়েক বছর আগেও বৃষ্টির পানি চুইয়ে চুইয়ে ভূগর্ভে যাওয়ার পথ ছিল। কিন্তু এখন ভবনের চারপাশের খোলা জায়গাও পাকা হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে যাওয়ার কোনো পথ নেই। তবে আশার কথা, নতুন বিধিমালায় ভবনের চারপাশের খোলা জায়গা উন্মুক্ত করে রাখার কথা বলা হয়েছে। শুধু নতুন ভবনের ক্ষেত্রে নয়, পুরনো ভবনের ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে কর্তৃপক্ষ থেকে সহায়তার পাশাপাশি নকশা নবায়নে অগ্রাধিকারের কথা বিধিমালায় বলা হয়েছে।

দুই সিটি করপোরেশনে প্রায় তিন লাখের বেশি ভবন রয়েছে। রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে প্রায় চার হাজারের মতো নতুন ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রতি বছর যদি নতুন প্রত্যেকটি ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়, তাহলে ধীরে ধীরে অন্যরা উৎসাহিত হবে এবং প্রায় সব ভবনই এর আওতায় আসবে। সরকারিভাবে তৈরি করা নতুন আবাসিক ভবনগুলোয় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের অনেক শহরগুলোয় ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের পাহাড়ি অনেক এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রেখে তারা দিব্যি ব্যবহার করছে। ঢাকা শহরের জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। দিনে দিনে বাড়ছে পানির চাহিদাও। তাই নগরবাসীর ভবিষ্যৎ পানির চাহিদা পূরণে ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ভালো সমাধান হতে পারে। শুধু রাজধানী ঢাকা শহরে নয়, অন্যান্য বিভাগীয় শহরের ভবনের ছাদেও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে তা নানা ক্ষেত্রে ভালো ফল বয়ে আনবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadonsarker2005@gmail.com

"