মতামত

হাতছানি দিয়ে ডাকছে শহর

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

আবু তাহের

গ্রামকে সবাই মনেপ্রাণে ভালোবাসে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। স্রেফ দুবেলা সময় কাটানো আর বিনোদনের জন্য হয়তো মানুষ গ্রামে ছুটে যায়। আর নয়তো শহরই সবার এক নম্বর পছন্দ। সবাইকে হাতছানি দিয়ে ডাকে শহর। আর সেটা লাখো প্রাণের শহর ঢাকা হলে তো কথাই নেই। রাজার শহর রাজধানী। রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বপ্নের মানুষ, রঙিন জগতের মানুষ সবাই ঢাকা থাকে। আমি কেন গ্রামে থাকব! কী নেই রাজধানীতে? কিন্তু রাজধানী কি আমাদের এই ভার সইতে পারছে!

হাজারো প্রশ্নের জালে জর্জরিত ঢাকা আজ মুখিয়ে আছে উত্তরের জন্য। আর উত্তর মিলেছে। যুক্তরাজ্যের দ্য ইকোনমিস্ট সাময়িকীর ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০১৮ সালের গ্লোবাল লিভেবলিটি ইনডেক্স বা বৈশ্বিক বসবাসযোগ্যতার সূচকে আমাদের রাজধানী নিচের দিক থেকে দ্বিতীয় হয়েছে। বসবাসের অযোগ্য জায়গা হিসেবে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক এক নম্বরে, আমাদের ঢাকা রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে আমরা আজ অনেক দূর এসেছি।

রাজধানী ঢাকাকে আধুনিক বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ঢাকামুখী গ্রামের মানুষের আগমন বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তাহলে রাজধানীর অধিকাংশ মানুষই কি গ্রামের? একটা প্রশ্ন থেকে যায়। এক অর্থে বলতে গেলে সবাই গ্রাম থেকেই আসা। আরেক অর্থে বলতে গেলে নতুন করে গ্রাম থেকে আসা হতদরিদ্র জনগণ। মন্ত্রী মহোদয় কোন অর্থ বুঝিয়েছেন জানা নেই। কিন্তু ফলাফলের খাতায় শূন্য জমা হয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৪৭ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার, ১৯৫১ সালে ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৯২৮ এবং ১৯৬১ সালে ৫ লাখ ৫০ হাজার ১৪৩। ১৯৭৪ সালে আদমশুমারি অনুযায়ী ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৭ হাজার এবং ১০ বছর পর ১৯৮১ সালে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ লাখ ৪০ হাজার। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৬৮ লাখ ৪৪ হাজার এবং ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ১ কোটি ৭ লাখ। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম তার ‘উন্নয়নে নগরায়ণ’ বইতে লিখেছেন ১৯৭৪ সালে, যখন স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়, তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১৬ লাখের মতো। ৮১-তে এসে ঢাকার জনসংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩৫ লাখে, ৯১-তে ৭০ লাখে। তখন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ঢাকা মহানগরকে মেগাসিটি নামে আখ্যায়িত করে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনেও ঢাকাকে ৮৬ সালেই মেগাসিটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

এবার মেগাসিটি কী জেনে নেওয়া যাক। মেগাসিটি অর্থ কড শহর। মেগাসিটি বলতে সেসব মেট্রোপলিটন এলাকাকে বোঝানো হয়, যেখানকার জনসংখ্যা ১ কোটি বা ১০ মিলিয়নের অধিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনসংখ্যার ঘনত্ব (প্রতি বর্গকিলোমিটারে ন্যূনতম ২০০০ জন) বিবেচনা করা হয়ে থাকে। জাতিসংঘের হিসাব বাদ দিয়ে যদি আমরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব ধরি, তবে ৯১-তে আমরা মেগাসিটি হয়েছি। জনসংখ্যা এই বিপুল ভার আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি পঁচিশ বছর ধরে। পঁচিশ বছর ধরে হয়তো কোনো কিছুরই লাগাম টেনে রাখা যায়নি।

মেগাসিটির দিক দিয়ে ঢাকা চীনের সাংহাই বা বেইজিংয়ের কাছাকাছি। এর চেয়েও কাছে কলকাতা কিংবা পাকিস্তানের করাচীর। চীনের উদাহরণ এ কারণে টানা হল, ঢাকার সঙ্গে চীনের পার্থক্যগুলো হয়তো খুব সহজেই ধরা পড়বে। সেদিকে দিয়ে বিবেচনা করলে কলকাতা বা করাচীর সঙ্গে পার্থক্য করা মুশকিল। মুম্বাইও ঢাকার কাছাকাছি। এ শহরগুলোর সঙ্গে ঢাকার সুযোগ-সুবিধা থেকে সবকিছু বিবেচনা করলে বিস্তর ফারাক চোখে পড়বে। বেইজিংয়ের বর্তমান জনসংখ্যা ২ কোটি ১৭ লাখ। জাতিসংঘের ওয়াল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টের রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ। জনসংখ্যার দিক দিয়ে এগিয়ে থেকেও বেইজিং ঢাকা থেকে অনেক উন্নত। তাহলে সমস্যা কোথায়?

ঢাকামুখী জনসংখ্যা এই স্রোতের গতিরোধ করতে পারলেই কি মিলবে সমাধান? কিন্তু মেগাসিটি হওয়ার পর থেকেই তো এর লাগাম টেনে ধরা দরকার ছিল। মূলত বেশ কিছু বিষয় এখানে জড়িত। মন্ত্রী মহোদয় এ বিষয়ে বেশ কিছু কথা বলেছেন। ঢাকা রাজধানী হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শপিং মল থেকে শুরু করে সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে। লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলছে প্রতিনিয়ত। সারা দেশ থেকে লাখো মানুষের ঢল নামে তাই ঢাকার দিকে। চাকরির জন্য, ব্যবসার জন্য, স্কুল-কলেজে ভর্তির জন্য। গড়ে উঠে নতুন নতুন ভবন। নতুন অ্যাপার্টমেন্টের মাথাও ছুঁতে চায় যেন আকাশ। এ ক্ষেত্রে রাজউকের অব্যবস্থাপনা ও অসততার জন্য রাজধানীতে গজিয়ে উঠছে বিভিন্ন ভবন। এটা কোনো নতুন খবর নয়। রাজউকের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। রাজধানীর হাজারো সমস্যা কারণ খতিয়ে দেখলে রাজউককে একটা কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় সহজেই। এটা কোনো গ্রাম থেকে আসা ব্যক্তির দ্বারা ঘটিত কাজ নয়। শহুরে শিক্ষিত, উচ্চ মেধাসম্পন্ন কিছু মানুষের কাজ এগুলো। দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা।

এ ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিকল্পনাহীনতার অভাব রয়েছে। তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা। কোথায় কী হবে, সেটা থাকতে হবে। কোথায় প্রশাসনিক ভবন, শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকার পরিকল্পনা থাকতে হবে। পাশাপাশি আবাসিক এলাকায় ও স্কুল-কলেজও পরিকল্পনা অনুযায়ী হওয়া উচিত। এদের আরো কাজ আছে। সাধারণ নগর পরিকল্পনার মধ্যে পরিবহন পরিকল্পনা থাকতে হবে। কোথায় রাস্তা হবে, কী ধরনের রাস্তা হবে। কী ধরনের পরিবহন চলবে, সবই পরিকল্পনার অংশ। এসব কাজে রাজউক আগাগোড়াই পিছিয়ে আছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে দীর্ঘদিন ধরে বারবার উঠে এসেছে বসবাসের অনুপযুক্ত হিসেবে ঢাকা মহানগরীর নাম। তাদের মতে, এর পরও যদি কারো টনক না নড়ে, তাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলেও মনুষ্যসৃষ্ট কারণেই একদিন পরিত্যক্ত হতে পারে ঢাকা। রাজধানী ঢাকার যানজট একটা পুরোনো ব্যাধি। এ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে কে দায়ী বলা মুশকিল। যদি বলা হয় পুরোনো, অকার্যকর, মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি এর কারণ। তাহলে তো প্রায়ই শোনা যায় এ গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানের কথা। একটা সংক্ষিপ্ত সময়ের পর অভিযানেরও মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। নতুন রূপে ফিরে আসে পুরোনো গাড়ি। ড্রাইভারদের কথা কী বলব জানা নেই। আমাদের যোগাযোগমন্ত্রী মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় হানা দেন। অনেক কিছুই তিনি করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সরিষার ভূত তাড়াবে কে? ড্রাইভার, গাড়ি দুটোর জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে মানুষ। ইদানীং দুর্ঘটনায় নিহত মানুষের স্বজনদের কান্নায় ভারী আমাদের চারপাশ।

রাজধানী ঢাকাকে এখন গাড়ির শহর বললেও ভুল হবে না। দেখা যায় বাসায় গাড়ি আছে পাঁচটা। বাবা একটা, ছেলে একটা, ছেলের বউ একটা, বাসার ম্যানেজার অন্যটা...। আর কিছুদিন গেলে তো মানুষ সরিয়ে ঢাকাতে শুধু গাড়িই রাখতে হবে। টাকা আছে বলেই যে তার প্রয়োজনের বাইরেও পাঁচ-ছয়টা গাড়ি থাকতে হবে, এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। আর এই গাড়িগুলো কেনার সামর্থ্য গ্রামের গরিব মানুষের নেই। তারা দুপয়সার লোকাল বাসে চলাফেলা করে।

হাজারো সমস্যার মধ্য থেকে কয়েকটি সমস্যা এখানে তুলে ধরা হলো। আর এগুলো সমাধানের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা হচ্ছে। তাহলে কি এগুলোর সমাধানের মধ্যেই মুক্তি পথ? মূলত এখানে দুটো বিষয় রয়েছে। প্রথমত, সুষ্ঠু সমাধান। দ্বিতীয়ত, সমাধানের মাধ্যমে যেন নতুন সমস্যার সৃষ্টি না হয়। কারণ আমাদের সব উন্নয়ন কার্যক্রম এবং পরিকল্পনা ঢাকাকেন্দ্রিক। আর এ কারণেই মানুষকে ঢাকা আসতে বাধ্য করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক ও জলবায়ুগত কারণে মানুষ ঢাকায় আসছে। অর্থনৈতিক কারণের মধ্যে রয়েছে দরিদ্রতা, বেকার ও ভূমিহীন। অন্যদিকে গ্রাম মানুষকে ধরে রাখতে পারছে না; কারণ কাজ নেই। কৃষিকাজ এখন অনেক হিসাব করে করা হয়। গ্রামেও অকৃষিভিত্তিক কাজ হচ্ছে। প্রতিদিন ঢাকা শহরে কমিউটার হিসেবে ৪ থেকে ৫ লাখ লোক আসেন লঞ্চ, ট্রেন ও বাসে। তারা এ শহরের বিভিন্ন সেবা নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আবার চলেও যান। তারা এখানে অবস্থান করেন না। ঢাকার বাইরে সুন্দর কোনো চিকিৎসাব্যবস্থাও নেই। তাহলে কেন মানুষ ঢাকা আসবে না?

এ ক্ষেত্রে নতুন পরিকল্পনার পাশাপাশি বর্তমানে জেলা শহরগুলোয় সুষ্ঠু তদারকির মাধ্যমে আধুনিকায়ন করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। নগরীতে দক্ষব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। যারা নগরী দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন, তাদের মধ্যে সততা, নিষ্ঠা থাকতে হবে। ব্যবস্থাপনাতে দক্ষ হতে হবে। ব্যবস্থাপক কঠোর হলে দুর্নীতিও প্রশ্রয় পাবে না।

লেখক : কলামিস্ট ও শিশুসাহিত্যিক

abutaher16@gmail.com

"