নিবন্ধ

টিকে থাক বাংলার মৃৎশিল্প

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

অলোক আচার্য্য

বাংলাদেশ বৈচিত্র্যের দেশ। এ দেশে অতীতকাল থেকেই নানা ধরনের সংস্কৃতি পালন করা হয়। যার একটি অনন্য নিদর্শন হলো মৃৎশিল্প। মৃৎ মানে মাটি, আর শিল্প মানে সুন্দর সৃষ্টিশীল পদার্থ। তাই মাটি দিয়ে নিজ হাতে তৈরি শিল্পকর্মকে মৃৎশিল্প বলে। এই শিল্পটি হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও অন্যতম একটি শিল্প। মাটি দিয়ে তৈরি এই শিল্পকর্মের মধ্যে রয়েছে মাটির কলস, হাঁড়ি, সরা, বাসন, কোসন, পেয়ালা, সরাই মটকা, শালা, পিঠে তৈরির ছাঁচ ইত্যাদি। এই শিল্পের প্রধান উপকরণ হলো মাটি। আর এ শিল্পের প্রধান শিল্পী হলো আমাদের কুমোর সম্প্রদায়। কুমোর সম্প্রদায়ের হাতের নৈপুণ্য ও কারিগরি জ্ঞানে মাটি দিয়ে তৈরি শিল্পকর্মকে মাটির শিল্প বা মৃৎশিল্প বলা হয়। ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মাটির শিল্প প্রথম চীনের বিখ্যাত শহর থাংশানে প্রচলিত ছিল। এই ইতিহাসকে চিরজীবিত করে রাখতে এ শহরটিকে মৃৎশিল্পের শহর বলা হয়। চীনের রাজধানী বেইজিং থেকে ১৫০ কিমি উত্তর-পূর্বের এই শহরের পথে-প্রান্তরে, বিনোদন কেন্দ্র বা পার্কগুলোয় মৃৎশিল্পের বিভিন্ন শিল্পকর্ম দেখতে পাওয়া যায়। মিং রাজবংশের ইয়ুং লে-এর সময়কালে থাংশানের মৃৎশিল্পের উৎপত্তি ও বিকাশের সূত্রপাত হয়। বর্তমানে সেখানে নানা ধরনের চীনামাটির ৫০০টিরও বেশি মৃৎশিল্প দেখা যায়।

চীনে মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও শো-পিসকে বলা হতো ‘সেলাডন’। সেলাডন প্রস্তুতির পর পুরো চীন দেশজুড়ে আর আশপাশের বিভিন্ন দেশেও ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। ফলে চীনারা এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় সেলাডন রফতানি শুরু করে। আমাদের দেশেও আদি আমল থেকে মৃৎশিল্পের চলন চলে আসছে। পোড়া মাটির নানাবিধ কাজ, গৃহস্থালির নিত্যব্যবহার দ্রব্যাদি, পুতুল, খেলনা, প্রতিমা, প্রতিকৃতি, টপ, শোপিসসহ অসংখ্য জিনিস আজও কুমারশালায় তৈরি হয়ে। আর ক্রেতাদের কাছে এখনো এর চাহিদা অনেক। মাটির তৈরি বিভিন্ন রকমারি আসবাবপত্র চেয়ার, টেবিল ইত্যাদির চাহিদা এখনো লক্ষণীয়। প্রাচীনকাল থেকেই মৃৎশিল্প বিভিন্ন সভ্যতায় অনেক মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশের জাতীয় ঐতিহ্য ও গৌরবের নিদর্শন এই মৃৎশিল্প। অতীতে যখন কাচ, সিরামিক, মেলামাইন, অ্যালুমিনিয়ামের প্রচলন ছিল না, তখন মানুষ মাটির তৈরি জিনিসপত্রই ব্যবহার করত। হাঁড়ি-পাতিল, ডাবর-মটকি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু, যেমন মাটির ব্যাংক, শোপিস, গহনা, কলস, ফুলের টব, ফুলদানি, ঢাকনা, পিঠা তৈরির ছাঁচসহ বিভিন্ন ধরনের খেলনা তৈরি করেন মৃৎশিল্পীরা। শিল্পকলার পরিচয় পাওয়া যায় মাটির শিল্পে। এটা এ দেশের নিজস্ব শিল্প। বৈশাখী মেলায় নানা পার্বণে যেসব মাটির জিনিস বিক্রি হয়, সেসব কিছুই মাটির শিল্প। গ্রামের কুমোররা নিপুণভাবে এসব তৈরি করে। প্রাচীনকাল থেকেই এ দেশে মৃৎশিল্প বা মাটির শিল্পের চর্চা হয়ে আসছে। তাই মৃৎশিল্প হলো আমাদের দেশের সবচেয়ে প্রাচীন শিল্প।

হাঁড়ি কলসি ছাড়াও আমাদের দেশে একসময় গড়ে উঠেছিল সুন্দর পোড়ামাটির ফলকের কাজ, যার নাম টেরাকোটা। নকশা করা মাটির ফলক ইটের মতো পুড়িয়ে তৈরি করা হতো, এই টেরাকোটা। ময়নামতীর শালবন বিহার, বগুড়ার মহাস্থানগড় ও বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদে যেসব পোড়ামাটির ফলকের নিদর্শন রয়েছে, সেসবই এই প্রাচীন শিল্পের উদাহরণ। সম্প্রতি নরসিংদীর ওয়ারী বটেশ্বরে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে নানা ধরনের সুন্দর মাটির পাত্র আর ফলক। তাই মাটির শিল্প আমাদের ঐতিহ্য ও গৌরবের বিষয়। বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। যুগ যুগ ধরে এ দেশে সে ঐতিহ্য লালন-পালন করে আসছে এ শিল্পের রূপকার হলেন কুমোর বা কুমার শ্রেণির পেশাজীবীরা। কুমাররা মাটি দিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করেন। নরম কাদামাটি দিয়ে নিপুণ কৌশলে গড়ে তোলেন বিভিন্ন তৈজষপত্র ও গৃহস্থালিকাজে ব্যবহার্য সামগ্রী। কুমাররা হাঁড়ি, কলসি, ঘড়া, ঘাগড়া, সানকি, প্রদীপ, পাঁজাল বা ধুপতি, গ্লাস, বদনা, ঝাঁজর, চাড়ি, মটকি, পিঠার সাজ, সরা, ঢাকনা, বাটি, ফুলের টব, পুতুল, প্রতিমা, মূর্তি ইত্যাদি তৈরি করেন। মাটির এসব তৈজসপত্র তৈরিতে দরকার হয় এঁটেল মাটি। তা ছাড়া হাঁড়ি তৈরিতে কুমাররা চাকযন্ত্রও ব্যবহার করে থাকেন। কাঁচামাটি দিয়ে এসব সামগ্রী বানানোর পর পুড়িয়ে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রং করে সেগুলো বাজারে বা গ্রামে ফেরি করে বিক্রি করেন। অতীতে নৌকাবোঝাই করে এসব সামগ্রী নিয়ে পাল মশাইরা বেশ কয়েক দিনের জন্য বেরিয়ে পড়তেন। নদীতীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে সেগুলো বিক্রি করতেন। বিক্রি শেষ হলে বাড়ি ফিরতেন। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন গ্রাম বা শহরের মানুষ ধাতব, প্লাস্টিক, ম্যালামাইন ও চীনামাটির সামগ্রী ব্যবহার করে। ফলে বর্তমানে সেই শিল্পে অনেকটা ভাটা পড়েছে। কুমার শ্রেণির পেশা এখন হুমকির মুখে পড়েছে।

তবে নতুন করে মৃৎশিল্পের আর একটি শাখা উন্মোচিত হয়েছে। সেটি হলো নান্দনিক মৃৎশিল্প। এ শাখার মৃৎশিল্পীরা মাটি দিয়ে বিভিন্ন শৌখিন সামগ্রী ও শিল্পকর্ম তৈরি করে থাকেন, ইংরেজিতে একে বলা হয় পটারিশিল্প। এরা টেরাকোটা বা মৃৎফলকে খোদাই করে সুন্দর সুন্দর শোপিস তৈরি করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মূর্তি, অলঙ্কার, নকশি পাত্র, ঘণ্টা ইত্যাদি তৈরি করছেন। ঢাকার অনেক দোকানে এসব শৌখিন মৃৎসামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অভাব আর দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে আজও টিকে আছে কুমার পরিবার। তাদের জীবন আজ সংগ্রামে বাঁধা। বহু বছরের পুরনো বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে বেঁচে আছে এই সংগ্রামী মানুষগুলো। অনেকেই বাপ-দাদার পেশা পরিবর্তন করেছে। যারা এ পেশা ধরে রেখেছে, তারা নিতান্তই আবেগে। সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এ শিল্প নিভু নিভু করে জ্বলছে। আগে নদীর পাড়ে দাঁড়ালে দেখা যেত মাটির তৈজসপত্রে বোঝাই নৌকার সারি। নৌপথেই তখন দূরদূরান্তে গ্রামগঞ্জে পৌঁছে যেত মাটির হাঁড়ি-পাতিল। এ দৃশ্য এখন বিলুপ্তপ্রায় নদীর মতোই যেন হারিয়ে গেছে বাংলার চিরাচরিত দৃশ্যপট থেকে। বাজারে যথেষ্ট চাহিদা না থাকা, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজের পরিধি পরিবর্তন না করা, কাজে নতুনত্বের অভাব, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসংগতি, কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত মাটির মূল্যবৃদ্ধি, কাঁচামাল ও উৎপাদিত সামগ্রী পরিবহনে সমস্যা, জ্বালানি সংকট, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, ঋণপ্রাপ্তিতে জটিলতা ইত্যাদি কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে নদীবিধৌত বাংলার বহু বছরের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প।

অন্যদিকে স্টিল, ম্যালামাইন, সিরামিক, সিলভারসহ বিভিন্ন ধাতব পদার্থের তৈরি তৈজসপত্রের নানাবিধ সুবিধার কারণে দিন দিন আবেদন হারিয়েছে মাটির তৈরি শিল্পকর্ম। অনেক কষ্ট আর দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলার কুমার শ্রেণির দিন। যারা এ পেশায় টিকে আছেন, তারা কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন। তবে কিছু আশার আলোও দেখা যায় এই শিল্পকে ঘিরে। শিল্পীর হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরীকৃত শৌখিন তৈজসপত্র, শোপিজ ও ঘর সাজানোর নানা উপকরণ শুধু দেশের ভেতরে নয়, স্থান করে নিয়েছে বিদেশের বাজারেও। আরো কিছু পদক্ষেপ নিলে এই শিল্প আমাদের অর্থনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। শৌখিন মানুষরা মাটির তৈরি জিনিসপত্রে ঘর সাজিয়ে যেমন আনন্দ পাচ্ছে, তেমনি নব সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে মৃৎশিল্পের। এই শিল্প নিয়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। নগরায়ণ বৃদ্ধির ফলে শৌখিন মানুষদের কাছে অন্যতম একটি আকর্ষণের বিষয় বাড়ির ছাদে, বারান্দায় বা ঘরে গাছগাছলির চাষ করা ইংরেজিতে যাকে হোম গার্ডেনিং বলা হয়। এ ধরনের বাগানের জন্য মাটির তৈরি বিভিন্ন নকশা করা টবের নতুন করে চাহিদা তৈরি হচ্ছে, যা মৃৎশিল্পের জন্য আরেকটি ইতিবাচক দিক। মৃৎশিল্পের উন্নয়নের খাতিরে সরকার এবং বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাগুলো বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। ভবিষ্যতে যেন এই শিল্প আর ধ্বংসের পথে ধাবিত না হয়, তাই সব প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। প্রত্যেক জেলায় জেলায় মৃৎশিল্পের বাজার তৈরি করতে হবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এর ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা গ্রহণ করে এর ব্যবহার সম্পর্কে উৎসাহিত করতে হবে। বর্তমানে মানুষ শৌখিনতার জন্য মাটির তৈরি

জিনিসপত্র ব্যবহারের চাহিদা দিন দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন নিত্যনতুন ডিজাইনের মাটির জিনিস বাজারে বিক্রির পাশাপাশি বিদেশে রফতানি হচ্ছে, যা আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। তাই মৃৎশিল্প বিকাশে সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

 

"