ধর্ম

কোরবানির ফজিলত ও আহকাম

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

শফিকুল ইসলাম খোকন

কোরবানি শব্দটি আমাদের কাছে অতি পরিচিত। যুগে যুগে বছর ঘুরে একবার এ দিনটি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ফিরে আসে। পৃথিবীতে মানবসভ্যতার ইতিহাসের মতো কোরবানির ইতিহাসও প্রাচীন। কোরবানির বিধান ছিল না- এমন কোনো জাতির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। কোরবানি আল্লাহতায়ালার একটি বিধান। আদম (আ.) থেকে প্রত্যেক নবীর যুগে কোরবানি করার ব্যবস্থা ছিল। যেহেতু প্রত্যেক নবীর যুগে এর বিধান ছিল, সেহেতু এর গুরুত্ব অত্যধিক। আর মুসলমানরাও এ দিনটি সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টাও করে।

কোরবানি কী? ‘কোরবানি’ শব্দটির মূল অক্ষর ‘কোরব’ আরবি হলেও শব্দটি ফারসি। উর্দু, হিন্দি বাংলাসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় ব্যবহৃত হয়। যার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করা হয়, তাই কোরবান অভিধায় অবহিত। কোরবানি শব্দটি কোরআন-হাদিসে ‘কোরবান’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে : ‘ইজ তাক্বাররবা কোরবানান ফাতুকুবিবলা মিন আহাদিহিমা ওয়ালাম ইয়ুতাক্বাব্বাল মিনাল আখার...’ অর্থাৎ ‘স্মরণ করো, সে সময়ের কথা, যখন তারা দুজন (হাবিল ও কাবিল) কোরবানি করল। তাদের একজনের কোরবানি গৃহীত হলো, অপরজনের কোরবানি গৃহীত হলো না।’ কোরবানি বা কোরবান এ শব্দটি আরবি ‘কোরবুন’ মূলধাতু থেকে এসেছে। কোরবুন অর্থ নৈকট্য লাভ। তাই যে বস্তু কারো নৈকট্য লাভের উপায় হয়, সেটাকে কোরবান বা কোরবানি বলা হয়। কোরবানি শব্দটি এ অর্থেই ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের যুগ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে।

মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক জাতির জন্য কোরবানি নির্ধারণ করেছি।’ (সুরা হাজ : ৩৪)। তবে যুগে যুগে কোরবানির নিয়ম-পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন ধারায় ছিল। হাসান বসরী (রহ.)-এর মতে, সুরা আল কাওছারে বর্ণিত ‘ফাসল্লি লি রব্বিকা অনহার’ অর্থাৎ ‘আপনি আপনার রবের উদ্দেশে সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।’ আয়াতটি নাজিল করে মহান আল্লাহ তায়ালা ঈদুল আজহার সালাত আদায় ও কোরবানির নির্দেশ দান করেন। (আহকামুল কোরআন, তৃতীয় খ-, পৃষ্ঠা : ৪৭৫)। আল্লাহর নির্দেশে আদিষ্ট হয়ে দ্বিতীয় হিজরিতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদুল আজহার সালাত আদায় ও কোরবানি করেন। সেই থেকে প্রতিবছর মুসলিম উম্মাহ যথারীতি কোরবানি করে আসছে। একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে কোরবানি কী, কেন কোরবানি করতে হবে, কীভাবে কোরবানি করতে হবে, কোরবানির শিক্ষাই-বা কী? ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান থাকা আমাদের একান্ত আবশ্যক।

ইতিহাসে দেখা গেছে, আদম আলাইহিস সালামের যুগ থেকে ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের যুগ পর্যন্ত কোরবানির ধরন ছিল সত্য-মিথ্যা, হক-বাতিলের মধ্যে পার্থক্য করার একটি বিশেষ উপায়। যেমন : হজরত আদম আলাইহিস সালামের পুত্রদ্বয় হাবিল ও কাবিলের মধ্যে বিবাহকে কেন্দ্র করে হক-বাতিলের যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, তা নিরসনের জন্য আল্লাহ আদম আলাইহিস সালামকে অহীর মাধ্যমে কোরবানি দেওয়ার বিধান জারি করলেন। এ বিষয়টি আল্লাহ তার প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এভাবে বলেছেন, : ‘হে রাসুল আপনি তাদের আদম আলাইহিস সালামের দুই পুত্রদ্বয়ের বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শোনান, যখন তারা উভয়ই কোরবানি করেছিল। তখন তাদের একজনের কোরবানি গৃহীত হয়েছিল এবং অপরজনের কোরবানি গৃহীত হয়নি।’ তখনকার নিয়ম অনুযায়ী যার যে সম্পদ থাকত, তা একটি উচ্চস্থানে রেখে আসত। যার কোরবানি গৃহীত হতো; তার কোরবানিকে আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে ভস্মীভূত করে দিত। ফলে বোঝা যেত সেই সত্য ও হকপন্থি। আর আমরা সে মহান আল্লাহরই নির্দেশে কোরবানি করি পশু যবেহ করার মাধ্যমে। এর সূচনা হয় ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম থেকে। ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম স্বপ্নে আদিষ্ট হলেন, তিনি যেন তার প্রিয় পুত্র তেরো বছর বয়সী ইসমাইল আলাইহিস সালামকে কোরবানি দেন। ছেলে ইসমাইল আলাইহিস সালামকে তিনি বললেন : ‘হে প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে তোমাকে যবেহ (কোরবানি) করছি। এখন তুমি ভেবে দেখো এবং স্বপ্নের ব্যাপারে তোমার মতামত কী, তা বলো।’ (সুরা আস সাফফাত : ১০২)। যেমন বাপ, তেমন বেটা। তৎক্ষণাৎ অবনত মস্তকে ইসমাইল আলাইহিস

সালাম বললেন : ‘হে আমার পিতা! এটা যদি আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা হয়ে থাকে, তবে আপনি আপনার কাজ সমাধা করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।’ (সুরা আস সাফফাত : ১০২)

যেমন ইরশাদ হয়েছে : আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; তিনি তাদের জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর ওপর যেন তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে। (সুরা আল-হাজ : ৩৪)। আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় বন্ধু ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে বিভিন্ন পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেছেন এবং ইব্রাহিম (আ.) সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর স্মরণ করো, যখন ইব্রাহিমকে তাঁর রবের কয়েকটি বাণী দিয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর তিনি তা পূর্ণ করলেন। তিনি বললেন, আমি তোমাকে নেতা বানাব।’ (সুরা আল-বাকারাহ : ১২৪)। নিজ পুত্র যবেহ করার মতো কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন ইব্রাহিম (আ.)। কোরবানি হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নাহ। আজকে আমরা কোরবানির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। কোরবানির শরয়ি মর্যাদা : কোরবানি করা ওয়াজিব। হজরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করিম (সা). এরশাদ করেছেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কোরবানি করবে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে। (মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রিয়নবী (সা.) মদিনায় দশ বছর অবস্থান করেন। এ সময় তিনি প্রতি বছর কোরবানি করতেন। (তিরমিজি) কোরবানির শরয়ি মর্যাদা সম্পর্কে ফকিহগণের মত হচ্ছে ইমাম নখয়ী, ইমাম আবু হানিফা, আবু ইউসুফ প্রমুখ কোরবানি করাকে সাধারণ সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব বলেছেন। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদের মতে কোরবানি সুন্নাতে মুসলিমিন।

কোরবানি একটি ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। কোরবানির ফজিলতের ব্যাপারে কোরআন এবং হাদিসে অনেক বর্ণনা এসেছে। হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এই কোরবানি কী? রাসুল (সা.) জবাবে বললেন, এটা তোমাদের পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নাত (রীতিনীতি)। তাকে আবারও জিজ্ঞাসা করা হলো, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এতে আমাদের কী (পুণ্য রয়েছে)? রাসুল (সা.) বললেন, (কোরবানির জন্তুর) প্রতিটি লোমের পরিবর্তে নেকি রয়েছে। তারা আবারও বললেন, পশমওয়ালা পশুদের জন্য কী হবে? (এদের তো পশম অনেক বেশি)। রাসুল (সা.) বলেছেন, পশমওয়ালা পশুর প্রত্যেক পশমের পরিবর্তেও একটি করে নেকি রয়েছে। (মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ)। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আদম সন্তান (মানুষ) কোরবানির দিন রক্ত প্রবাহিত করা (কোরবানি করা) অপেক্ষা আল্লাহর নিকটে অধিক প্রিয় কাজ করে না। নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন (কোরবানিদাতার পাল্লায়) কোরবানির পশু, এর শিং, এর লোম, এর খুরসহ এসে হাজির হবে এবং কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পতিত হওয়ার আগেই আল্লাহতায়ালার নিকট সম্মানিত স্থানে পৌঁছে যায়। সুতরাং তোমরা কোরবানি করে সন্তুষ্ট চিত্তে থাকো। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)।

আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহকে লোক দেখানোর জন্য কোরবানি নয় বরং পশুকে জবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে মনের পশু ও আমিত্বকে জবাই করার তাওফিক দান করুন। কোরবানির মাধ্যমে নিজেকে তাকওয়াবান হিসেবে তৈরি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

msi.khokonp@gmail.com

 

"