মতামত

বসবাসের অযোগ্য রাজধানী ঢাকা

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

সাধন সরকার

প্রতি বছরের মতো এ বছরও যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)’ ‘বৈশ্বিক বসবাসযোগ্যতা’ শীর্ষক জরিপ প্রকাশ করেছে। যথারীতি এ তালিকায় ঢাকার স্থান শেষতম থেকে একধাপ ওপরে অর্থাৎ ১৩৯তম (১৪০টি শহরের মধ্যে)। ২০১৭ ও ২০১৬ সালেও এ সংস্থার জরিপে বসবাসের সবচেয়ে অনুপযোগী তৃতীয় শহর হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল ঢাকা। এ সংস্থার জরিপে বসবাসযোগ্যতার নিরিখে গত সাত বছরে ঢাকা শহরের কোনো উন্নতি হয়নি। ২০১২ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত প্রতিবারই বসবাসের অযোগ্য ১০ শহরের তালিকায় শেষের দিকে ছিল ঢাকা। এ বছর সবচেয়ে যোগ্য শহর বিবেচিত হয়েছে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা। আর সবচেয়ে অযোগ্য শহর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। প্রায় পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধবিধ্বস্তে জর্জরিত দামেস্ক শহর বসবাসের অযোগ্য হবে এটাই স্বাভাবিক! কিন্তু তাই বলে এর পরের স্থান হবে রাজধানী ঢাকার! হ্যাঁ, ঢাকায় নগরবাসী নীরব জীবনযুদ্ধ করে টিকে আছে! কোনো রকম জরিপ ছাড়াই রাজধানীবাসী প্রতিদিন হাড়ে হাড়ে এই সত্য উপলব্ধি করছে! এক কথায়, ঢাকা শহর নগরবাসীর জন্য মন্দের ভালো! জরিপে বসবাসযোগ্যতা নির্ধারণে সুপরিসর আঙ্গিকে পাঁচটি মানদ- বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো। প্রতিটি বিভাগেই তিন থেকে নয়টি করে মোট ৩০টি সূচকের ভিত্তিতে শহরের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এ ঢাকা কেমন ঢাকা! দীর্ঘ সময় ধরে নানা সংকট-সমস্যা আর আধুনিক সুযোগ-সুবিধাহীন অবস্থায় থাকতে থাকতে মনে হতে পারে, এটাই মনে হয় বাসযোগ্য ঢাকা! এ কথা অবলীয়ায় বলা যায়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জনবহুলতার কারণে ঢাকায় যেকোনো দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হবে অবর্ণনীয়। তথ্য সূত্রে, ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা নগরও বটে! ঢাকা শহরের মানুষকে প্রতিদিন নানা সমস্যার মধ্যে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। বাতাসে সিসা, খাদ্যে ভেজাল, গ্যাস-পানির সমস্যা বহু দিন ধরে চলে আসছে এ শহরে। আর অর্থের বিনিময়েও যে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যাবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। গণপরিবহন বলতে যা বোঝায় তা কি ঢাকায় আছে! উচ্চ খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়া গেলেও তার মান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় পড়তে হয় নগরবাসীকে। লাখ-লাখ টাকা খরচ করে শহরের রাস্তার ফুটপাতের ড্রেনগুলো প্রতি বছর নতুন করে তৈরি ও খনন করা হচ্ছে। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা ও নগরবাসীর সচেতনতার অভাবে তা আবার অকেজো হয়ে পড়ছে।

বিশ্বের অন্যতম (বর্তমানে ১১তম) মেগাসিটি হিসেবে ঢাকা শহরের শৃঙ্খলহীনভাবে বৃদ্ধি ও বিকাশ এভাবে কি হতেই থাকবে! দিনে দিনে ঢাকার আকার বাড়ছে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই। জলাভূমি ভরাট হয়েছে, খাল দখল ও ভরাট হয়েছে, কোথাও বক্স কালভার্ট বানানো হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি নামার কোনো পথ নেই। শিক্ষার্থী, কর্মজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের যানজটে পড়ে নাকাল হতে হচ্ছে। যানজটের কারণে নগরবাসীর প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা। যানজটে পড়ে অবিরাম স্নায়ুর পীড়ন নগরবাসীর জীবনে নানা ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঢাকায় যানবাহনের গতি ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০০৪ সালে ঢাকায় যানবাহনের গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। এখন তা সাত কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা শহরে গণপরিবহন ব্যবস্থায় এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। গণপরিবহন সংকটে নগরবাসীকে ভুগতে হচ্ছে প্রতিদিন। ঢাকা শহর যেভাবে বেড়েছে, সেভাবে রাস্তাঘাট হয়নি। ফুটপাতগুলোও নগরবাসীর চলাচলের জন্য নিরাপদ নয়। মাঠ ও পার্কগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, গুম ও হত্যার ঘটনায় নগরবাসী উদ্বিগ্ন। মূলত সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় ঢাকার জনসংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ঢাকায় প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ জন। পৃথিবীর মেগাসিটিগুলোর মধ্যে জনঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ঢাকায়। প্রতি বর্গকিলোমিটারে এখানে ৪৫ হাজার মানুষ বাস করে। ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে সবার আগে ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমাতে হবে। এখানে জীবনযাপনের নানা ক্ষেত্রে আছে পদে পদে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। এ ছাড়া সামাজিক, সাংস্কৃতিক নানা সংকটেও নগরবাসীকে ভুগতে হচ্ছে। নগরবাসীকে উন্নতমানের সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভক্ত করা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সেবার মান কতটুকু বেড়েছে, তা শুধু কর্তৃপক্ষই জানে না বরং ভুক্তভোগী নগরবাসীও জানে! এত সব সমস্যার দায় সরকার, দুই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষও এড়াতে পারে না। রাজধানী ঢাকা যেন শত সমস্যার নগরী। কত-শত প্রতিষ্ঠান ঢাকার উন্নয়নে কাজ করলেও ঢাকাকে দেখার ও ঢাকা নিয়ে ভাবার আসলে কেউ নেই! বুয়েটের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকার ৬৫ শতাংশ ভূখ- সব সময় তপ্ত থাকে। প্রচ- দাবদাহের এ অবস্থার মূলে রয়েছে পরিবর্তনশীল আবহাওয়া ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ। ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালুÑএ চারটি নদীই আজ দুর্বিষহ দূষণ ও দখলের শিকার। ঢাকার ৪৭টি খাল দীর্ঘদিন ধরে দখল হয়ে আছে। ফলে জলাবদ্ধতা ও মশার যন্ত্রণা থেকে নগরবাসীর মুক্তি মিলছে না। ঢাকায় সুউচ্চ অট্টালিকার সংখ্যা বাড়ছে। উড়াল সড়ক ও ফ্লাইওভার বাড়ছে। কিন্তু ঢাকার জীবনযাপন সুগম ও সুন্দর হয়েছে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্যই এ শহর নরক যন্ত্রণার সমান। এ নগরীতে পানিদূষণ ও বায়ুদূষণের ফলে নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। ঢাকার আশপাশের ইটভাটাগুলো নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এগুলোয় উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি নগরের আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে ‘না পোড়ানো ইটের’ ব্যবহার বৃদ্ধি ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়াতে হবে। অতিমাত্রায় শব্দদূষণ নগরবাসীকে মারাত্মকভাবে ভোগাচ্ছে। কোনো আধুনিক শহর এভাবে চলতে পারে কি? ঢাকায় বৈষম্যহীন ও ‘সবার জন্য শিক্ষা’ আছে এমনটি পুরোপুরি বলা যাবে না। শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। ঢাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে কোচিং সেন্টারের সংখ্যাই বেশি! শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে হলে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে থাকতে হবে। প্রাথমিকে ‘এক ধারার শিক্ষা’ব্যবস্থা চালু করতে হবে। শুধু ধনীদের কথা চিন্তা করে পরিকল্পনা করলে হবে না, ধনী-নিধন সবার কথা বিবেচনায় রাখতে হবে।

এটা বুঝতে কষ্ট হচ্ছে, পরিস্থিতি আর কত খারাপ হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের টনক নড়বে। ঢাকার পাশের কয়েকটি দেশের সুন্দর রাজধানীর কথা বলা যেতে পারে যেমন : কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর বা দিল্লি। কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও নগরের অধিবাসীদের ইতিবাচক সহযোগিতায় বসবাসের জন্য এসব শহর নিরাপদ ও আকর্ষণীয় বলে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন রাজধানী শহরকে আধুনিক ও বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলা গেল না? প্রত্যেক বছর হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে, কিন্তু সমন্বিত পরিকল্পনা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তাই করা হয়নি। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকার এই করুণদশা। দক্ষ নেতৃত্বের অভাব আর ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার কারণেই কোনো পরিকল্পনাই পুরোপুরি আলোর মুখ দেখেনি। ক্ষীণদৃষ্টি, স্বার্থপরতা, ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ ও নৈতিকতার অভাব দূরে ঠেলে সবার স্বার্থে রাজধানীকে বাসযোগ্য ও আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ঢাকা শহরকে বসবাসের উপযোগী করে তুলতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে থানা ও জেলা শহরগুলোয় সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমাতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যাংকিংসেবা বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। জেলা শহরে চিকিৎসা, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের উদ্যোগ নিয়ে কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাতে হবে। আবাসন, আধুনিক শিক্ষা ও চিকিৎসার সন্নিবেশ ঘটিয়ে জেলা-উপজেলা শহরগুলোকে পরিকল্পিত ও আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি ঢাকাকে বাঁচাতে দরকার নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা ও ইতিবাচক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সৎসাহস। ঢাকাকে বাঁচাতে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ‘ড্যাপ’ বাস্তবায়নের কথা বহুদিন ধরে আলোচনা হলেও নানা কারণে এর বাস্তবায়ন নিয়ে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। আধুনিক ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে ‘ড্যাপের’ দ্রুত বাস্তবায়ন কাম্য। আমাদের রাজধানী আমরাই বাসযোগ্য ও আধুনিক হিসেবে গড়ে তুলবÑনিরাপদ বসবাসের জন্য আজ এ উপলব্ধি সবার মধ্যে থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadonsarker2005@gmail.com

 

"