নিবন্ধ

ইতিহাসের মহানায়ক

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

সেলিম মন্ডল

বাংলাদেশের ক্যালেন্ডারে সবচেয়ে কলঙ্কমলিন তারিখ ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এইদিন বিভীষিকাময় শেষরাতে সেনাবাহিনীর কিছু উচ্ছৃঙ্খল ও বিপথগামী সৈনিকের হাতে নৃশংসভাবে সপরিবারে নিহত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের ইতিহাস-সৃষ্টিকারী বহু রাজনৈতিক কর্মকা-ের সূতিকাগার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ঘটে ইতিহাসের মর্মান্তিক এই ঘটনা। ওই সময়ে বিদেশে অবস্থানের কারণে সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই আত্মজা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। আগস্ট তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে শোকের মাস হিসেবে পরিগণিত। প্রতি বছর ১৫ আগস্ট আসে বাঙালির হৃদয়ে শোক আর কষ্টের দীর্ঘশ্বাস হয়ে। বাঙালি জাতি এই মাসব্যাপী গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একটি ইতিহাস। তার জীবন ছিল সংগ্রামমুখর। বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের আন্দোলন আর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তাঁর বেড়ে ওঠা। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন ক্ষণজন্মা সাহসী পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। ছাত্রাবস্থায় তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। দীর্ঘ কয়েক যুগের সাহসী ও সংগ্রামী নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু গড়ে তোলেন মানুষে মানুষে এক গভীর ঐক্য। এই ঐক্যই একদিন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আন্দোলনে বিপ্লব ঘটিয়ে আমাদের নিয়ে যায় স্বাধীনতার অভীষ্ট মোহনায়। সে সময়ে নিজেকে পুরো জাতির মুক্তির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বলেই পরবর্তীকালে জাতি তাঁকে ‘জাতির পিতা’ অভিধায় ভূষিত করে। স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি বাঙালি জাতিকে দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে ধাপে-ধাপে প্রস্তুত করেন। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬-এর বাঙালির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯-এএর গণ-আন্দোলন, ৭০-এর নির্বাচন এবং সবশেষে ৭১-এর ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সংঘটনে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল অগ্রণী ভূমিকা ছিল অবিসংবাদিত। তিনি তাই ইতিহাসের মহানায়ক। তিনি বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান।

পাকিস্তানি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ষাটের দশক থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উত্তাল সমুদ্রে বঙ্গবন্ধু বজ্রদৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ঘোষণায় উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত জাতি স্বাধীনতার মূলমন্ত্র পাঠ করে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছিনিয়ে আনে দেশের স্বাধীনতা। জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পুরুষ বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি এই স্বাধীন বাংলাদেশ।

ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে দেখা যায়, নারকীয় এই সেনা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করে কিছু বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর রাজনীতিক এবং বিপথগামী কিছু সামরিক কর্মকর্তা। এদের মধ্যে ছিলেন শেখ মুজিবের সাবেক সহকর্মী খন্দকার মোশতাক আহমদ, যিনি তার স্থলাভিষিক্ত হন। সংবাদমাধ্যমে এ হত্যাকা-ের ইন্ধনদাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি সিআইএকে দায়ী করা হয়। ১৬ আগস্ট মরদেহ তার জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয়। মাত্র পনেরো মিনিটে সামরিক তত্ত্বাবধানে মাটির নিচে শুইয়ে দেওয়া হয় হিমালয়সম সাহসী এই মানুষটিকে, অন্যদের ঢাকার বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। দেশদ্রোহী খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে তার নাম চিরতরে মুছে ফেলতে চেয়েছিল।

পরে খন্দকার মোশতাক আহমদ ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মুজিব হত্যাকা-ের বিচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান ও পাকিস্তানপন্থি প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে তার বৈধতা দেওয়া হয়, যা ১৯৯৬ সালের ১২ আগস্ট সংসদে রহিত করা হয়। এরপর শুরু হয় বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচারের কার্যক্রম। বহু কণ্টকময় পথ পাড়ি দিয়ে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি বরখাস্তকৃত লে. কর্নেল ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার) এবং লে. কর্নেল (অব.) মুহিউদ্দিন আহমেদকে (আর্টিলারি) ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। কিন্তু বিদেশে পালিয়ে থাকা অন্য খুনিদের এখনো দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসি কার্যকর করতে পারেনি সরকার। তাই এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের তপ্ত হৃদয়ে এখনো বইছে ক্ষোভের বহ্নিশিখা, যা ৪৩ বছর পরও ৫৬ হাজার বর্গমাইলের জনপদের ধূলিকণা ভুলতে পারেনি। ভুলতে পারবে না।

আর সে কারণেই পঁচাত্তরের সামরিক-স্বৈরাচারী সরকারের আমলে পনেরো আগস্ট দিনটি ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে চরম অবহেলিত। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী সরকার গঠনের পর ১৫ আগস্টকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এসে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। এ ছাড়াও বিধি সংশোধন করে সরকারিভাবে নির্ধারিত দিন ছাড়া জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণার মাধ্যমে সরকারি ছুটি হিসেবে পুনর্বহাল করে।

যারা বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তাদের কথা বাদ দিলে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এ দেশের প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করে, তিনিই আমাদের উপহার দিয়েছেন বহুযুগের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। তাঁর জন্যই আমরা আজ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক। তিনিই আমাদের জন্য বয়ে আনেন আত্মপরিচয়, মানুষ হিসেবে আমাদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা। বঙ্গবন্ধু আমাদের চিরকালীন আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক এবং সত্তার প্রতিচ্ছবি। তাকে অবলম্বন করেই আমরা আমাদের দেশমাতৃকাকে অন্তরে উপলব্ধি করি, ভক্তিশ্রদ্ধা নিবেদন করি, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখি, নিহিত সম্ভাবনা আবিষ্কারে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হই। তাঁকে আমরা অনুভব করি আমাদের জাতীয় ঐক্য ও সংহতিতে, আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও রাষ্ট্রিক মঙ্গলাকাক্সক্ষায়। অতীতের সব গৌরবময় আত্মত্যাগ, বীরত্ব, মহত্ত্ব ও কৃতিত্বকে ধারণ করে একটি গর্বিত জাতির উত্থানে তিনি ছিলেন মহানায়ক। তাই আমাদের ধ্যান, জ্ঞান, স্বপ্ন ও মর্যাদায় মিলেমিশে তিনি বাঙালি সত্তার সঙ্গে হয়ে আছেন একাকার।

বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে শেখ মুজিবুর রহমান যে ত্যাগ, সাহস ও বীরত্বের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ও উজ্জ্বল ঘটনা। তিনি বিশ্বের একমাত্র নেতা, যাকে আধিপত্যবাদী ও স্বৈরাচারী সরকার দুবার মৃত্যুদ- দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। একবার ১৯৬৯ সালে, আরেকবার ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেদিন ৭১-এর ৯ আগস্ট পাকিস্তানের আদালতে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির রায় কার্যকরের জন্য স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল, সেদিনই তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সামরিক চুক্তি হয়। এই রায় স্থগিতের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে সাবেক বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী শান্তিতে নোবেল বিজয়ী আয়ারল্যান্ডের শন ম্যাকব্রাইডের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী টিম পাকিস্তান সফর করেন। ফলে পাকিস্তানের আদালতে সেদিন সেই স্বাক্ষর স্থগিত হয়ে যায়।

স্বাধীন দেশে কোনো বাঙালি তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে না বলে দৃঢ়বিশ্বাস ছিল বঙ্গবন্ধুর। সে জন্যই সরকারি বাসভবনের পরিবর্তে তিনি থাকতেন তাঁর প্রিয় ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর ধানমন্ডির অপরিসর নিজ বাসভবনেই। বাঙালির স্বাধিকার-স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার এ বাড়িটি অসম্ভব প্রিয় ছিল বঙ্গবন্ধুর। এখানে থেকেই বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। আর অবশেষে...

একটি জাতির জন্ম দিয়েই তিনি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য শেষ করেননি, বরং সর্বক্ষণ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে পরিশ্রম করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর প্রত্যেক দেশকেই নানা নৈরাজ্য, প্রতিবন্ধকতা ও ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করতে হয়। বাংলাদেশের বেলায়ও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তিনি যখন দৃঢ়হাতে এসবকিছুর মোকাবিলা করে আমাদের এই দেশকে সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ও বাসযোগ্য করার কাজে লিপ্ত ছিলেন, তখনই তার চারপাশে ওত পেতে থাকা মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা তার ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ভোররাতে। যিনি ছিলেন জনগণের বন্ধু, জাতির কাছে পিতা, বিদেশিদের কাছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা; যিনি রক্তে, বর্ণে, ভাষায়, কৃষ্টিতে এবং জন্মসূত্রে খাঁটি বাঙালি। তিনি নির্দিষ্ট কোনো দল বা সমাজের নন; তিনি সব দেশের, সব মানুষের অবিসংবাদিত মহান নেতা। বাংলার মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে স্বদেশের মাটি আর মানুষকে এমন গভীর ভালোবাসার বন্ধনে বেঁধেছিলেন, যে বন্ধন কোনোদিন ছিন্ন হওয়ার নয়।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

salimm159@gmail.com

"