মতামত

ব্যবধানে সরকারি ও বেসরকারি

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

মো. আশরাফ হোসেন

সরকার মালিকানাধীন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অপেক্ষা উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশে দুই দশক আগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপূরক হিসেবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের সুযোগ তৈরি করা হয়। কিন্তু বাণিজ্যিক মানসিকতাসম্পন্ন ব্যবসায়ীরাই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে তুলেছে। তারা তাদের গঠিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থ আয়ের মানসিকতা ত্যাগ করতে পারেননি। ফলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধনী পরিবারের শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নের সুযোগ প্রদান করছে।

প্রকৃতপক্ষে তারা দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের ভর্তি করাতে অস্বীকার করে না, কিন্তু ভর্তি ও অন্যান্য ফি এত উচ্চহারে ধার্য করে যে দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না। সাধারণভাবে লক্ষ করা যায়, যে কজন ধনী ব্যক্তি মিলে পাঁচ কোটি টাকা দিয়ে তথাকথিত মুনাফার জন্য নয়, এমন ফাউন্ডেশন গঠন করে এবং ওই ফাউন্ডেশনের অধীনে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় দাঁড় করায়। প্রায় সব ক্ষেত্রে ফাউন্ডেশনের অর্থে অবদান রাখা ধনী ব্যক্তিরাই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে, যা বিশ্ববিদ্যালয়টি ব্যবস্থাপনা করে থাকে।

লক্ষণীয় যে, তারা পরোক্ষভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়টিকে অর্থ আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। আনুষ্ঠানিকভাবে তারা তাদের তৈরি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো মুনাফা করে না এ কথা সত্য, তবে তারা অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন উপায়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে থাকেন। এমনকি মুনাফার জন্য নয়, এমন এনজিওগুলো যেসব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সংগঠিত করেছে সেগুলোও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অত্যন্ত উচ্চহারে ভর্তি ও অন্যান্য ফি আদায় করে থাকে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করলে দেখা যায়, ধনী এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরাই সেগুলোয় অধ্যয়ন করছে। কিছুসংখ্যক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থী যারা উচ্চশিক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে, তারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি করে ভর্তি ও অন্যান্য উচ্চহারের ফি পরিশোধ করতে বাধ্য হয়। এ অবস্থা কিছুতেই কাম্য নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কনভোকেশনে বারবার শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন উচ্চহারের ফি হ্রাস করতে আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সার্বিক অবস্থা দেখে বোঝা যায়, রাষ্ট্রপতির এ আবেদন জলে গেছে। ফলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুযোগ করে সরকার তার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়েছে।

এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি, অধ্যয়ন ও অন্যান্য ফি এমনভাবে ধার্য করা প্রয়োজন, যাতে ধনী পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ পেতে পারে। অন্যথা সুপ্ত প্রতিভার অধিকারী হাজারো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা অর্জন থেকে বঞ্চিত হবে এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি হ্রাস পাবে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ যেন নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ফি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করতে না পারে, সে জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, স্নাতকপর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য সব ফি, চার্জ ইত্যাদি মিলে ১০ হাজার টাকার বেশি সংগ্রহ করা যাবে না এবং মাসিক বেতনসহ অন্যান্য ফি ১ হাজার ৫০০ টাকার বেশি নেওয়া যাবে না। স্নাতকোত্তর শ্রেণির জন্য ভর্তি সর্বসাকল্যে ১২ হাজার টাকার বেশি নেওয়া যাবে না এবং মাসিক বেতনসহ অন্যান্য ফি দুই হাজার টাকার বেশি নেওয়া যাবে না। এমন বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। আর এটা বাস্তবায়ন করতে হলে জাতীয় সংসদে আইন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে আইনগত কর্তৃত্ব প্রদান করতে হবে, যাতে তারা রেগুলেটরি ভূমিকা পালন করতে পারে। তবেই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিপূরক হয়ে উঠবে।

গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছিলেন, মেডিকেল কলেজসহ সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বেতন পাঁচ গুণের বেশি বৃদ্ধি করা হবে এবং তা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কার্যকর করা হবে। বাস্তবে ঘোষণাটি বাস্তবায়ন করা হয়নি। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বেতন খুবই কম। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাসিক ফি টাকা ১৬। স্বাধীনতার ৪৮ বছরে দেশে সব দ্রব্য ও সেবার মূল্য বহু গুণ বৃদ্ধি ঘটেছে। সম্ভবত ছাত্র আন্দোলনের আশঙ্কায় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়নি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে মাসিক তিন হাজার টাকা থেকে ৯ হাজার টাকা আদায় করে থাকে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সিংহভাগ শিক্ষার্থীই সচ্ছল ও ধনী পরিবারের সন্তান। তারা তাদের প্রতিভা বিকাশে বেশি সুযোগ পেয়ে থাকে। ফলে তারা সহজেই সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ বেশি পায়। ফলে সচ্ছল ও ধনী পরিবারের শিক্ষার্থীরা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নামমাত্র বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সাধারণ পরিবারের শিক্ষার্থীদের বেশি সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব-সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা ধার্য করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে অর্ধেকসংখ্যক শিক্ষার্থী যারা দরিদ্র পরিবার থেকে আসবে, তাদের বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ দিতে হবে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি আবেদন রইল। যাতে দরিদ্র পরিবারের প্রতিভাবান সন্তানরাও শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক

"