বিশ্লেষণ

মহাকাশে রণ-প্রস্তুতির নতুন মাত্রা

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

জি. কে. সাদিক

এই লেখার ‘ব্রিফ’Ñ‘২০২০ সালের মধ্যে আমেরিকা মহাকাশ বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা করেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স গত ৯ আগস্ট পেন্টাগনে এ ঘোষণা দেন। এটি হবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ষষ্ঠ শাখা। পৃথিবীর আবহ ম-লের বাইরে অর্থাৎ মহাশূন্যে সামরিক তৎপরতায় নিয়োজিত থাকবে এই বাহিনী। লক্ষ্য হচ্ছে, চীন, রাশিয়াসহ অন্য দেশগুলোর থেকে আমেরিকার স্বার্থ ও সাম্রাজ্য ও আধিপত্যকে নিরাপদ রাখতে এই বাহিনী গঠন করা দরকার।’ এই হলো সংক্ষেপে ভবিষ্যৎ মার্কিন মহাকাশ বাহিনী গঠনের ‘প্রেস বি্িরফং’। (তথ্য সূত্র : গার্ডিয়ান)।

এই মহাকাশ বাহিনী ভবিষ্যতে কী ভূমিকা রাখবে, বর্তমানে অন্যান্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করে মাইক পেন্স খুব সুন্দর একটি মন্তব্য করেছেন। যেটা তাদের সব অপকর্ম বৈধতাকারী দোহাই। সেটি হলো, ‘মহাকাশ কিংবা পৃথিবীর সব জায়গাতেই আমেরিকা সব সময় শান্তি চেয়েছে। ইতিহাস প্রমাণ করে শক্তিমত্তার মধ্য দিয়েই কেবল শান্তি বজায় রাখা সম্ভব। সামনের দিনগুলোয় মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী তেমন শান্তি প্রতিষ্ঠাকামী শক্তিমত্তা হিসেবেই হাজির হবে।’ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করার পর আবার মহাকাশকেও কেন বিশেষ বাহিনীর আওতায় আনা হচ্ছে তারও একটি সুন্দর ও জুতসই উত্তর দিয়েছেন তিনি। একটু সতর্কদৃষ্টিতে দেখলে আমেরিকার মূল উদ্দেশ্যও স্পষ্ট বোঝা যাবে। তিনি বলছেন, ‘একটা সময় ছিল যখন মহাকাশে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু এখন বেশি মানুষ দেখা যাচ্ছে আর বাড়ছে প্রতিযোগিতা। আগের প্রশাসনগুলো অনেক কাজ করেছেন কিন্তু মহাকাশের নিরাপত্তা হুমকির বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। আমাদের প্রতিযোগিতা এরই মধ্যে মহাকাশকে যুদ্ধের ময়দানের মতো করে তুলেছে। আমেরিকা সে চ্যালেঞ্জ থেকে সরে আসবে না।’

ওপরের আলোচনা থেকে মহাকাশ বাহিনী সৃষ্টির কার্যকারণ সূত্র সম্পর্কে বিশদ না হলেও মোটামুটি ধারণা পেলাম। এখন মূল আলোচনায় আসি। এ পর্যন্ত পৃথিবীতে মানুষ দুবার পারমাণবিক বোমার ব্যবহার দেখেছে। সেটা কতটা বীভৎস ও জঘন্য ছিল যত দিন পৃথিবী থাকবে তত দিন মানব ইতিহাসের কলঙ্ক হিসেবে সে ঘটনাও থাকবে। শান্তি প্রতিষ্ঠার দোহায় দিয়ে আমেরিকা হিরোশিমা (৬ আগস্ট, ১৯৪৫) ও নাগাসাকির (৯ আগস্ট, ১৯৪৫) ১ লাখ ৮০ হাজার সাধারণ মানুষকে হত্যা করে আমেরিকান ‘শান্তিপ্রতিষ্ঠা’ নজির দেখিয়েছে। আমেরিকা যখন এমনভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা শুরু করে, তখন আত্মরক্ষার দোহায় হোক বা নিজেদের শক্তি জাহিরের জন্যই হোক, অন্য শক্তিধর দেশগুলোও মারণাস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু করেছিল। যে প্রতিযোগিতা এখনো চলমান। এই শক্তিধর দেশগুলোর হাতে আজকে পৃথিবী ও সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ জিম্মি। আমেরিকা পারমাণবিক বোমা তৈরির পর ক্রমেই রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও সর্বশেষ উত্তর কোরিয়া নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে শত শত মারণাস্ত্র তৈরি ও মওজুদ করে রেখেছে। যার লক্ষ্য মানব সন্তানে রক্ত ও লাশ। আণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো তাদের প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার জন্য বোতাম চাপার হুমকি দিচ্ছে। অথচ কোটি কোটি মানব সন্তানের জীবন তাদের কাছে কোনো মূল্য নেই। তাদের বাঁচা-মরা বিশের আটটি দেশের আটজন প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর বা সামরিক বাহিনীর প্রধানের হাতে জিম্মি।

শক্তিধর এই দেশগুলোর মধ্যে কোনো একটা দেশ যখন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল, অন্যদের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হওয়ার জন্য এবং ভূরাজনীতিতে মোড়লিপনা ও অন্যের ওপর শক্তি খাটিয়ে কৌশলে প্রাকৃতিক সম্পদ ও খনিজসম্পদ লুটের জন্য নতুন কোনো পদ্ধতি অবলম্বন বা আবিষ্কার করে, তখন বাকি দেশগুলোও সে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। যেমনটা আমরা পারমাণবিক বোমা তৈরির ক্ষেত্রে দেখেছি। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতাও একই কারণে। রাসায়নিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা, হাইড্রোজেন বোমা তৈরি, চালকবিহীন যুদ্ধবিমানসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে একই লক্ষ্য দেখছি। রাশিয়া সাবমেরিন তৈরি করল। অন্য শক্তিধর দেশগুলোও সাবমেরিন তৈরি করল। রাশিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির পর আমেরিকাও তৈরি করেছিল। এখন আমেরিকা মহাকাশ বাহিনী গঠন করলে চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানিসহ যাদের শক্তি ও আর্থিক সমর্থ আছে, সে দেশগুলোও একই পথে হাঁটবে। শক্তিধর দেশগুলো যে পরিমাণ অর্থ শুধু তাদের প্রতিরক্ষার নামে অস্ত্র তৈরি ও যুদ্ধের জন্য ব্যয় করে, তা বেশ কয়েকটি দরিদ্র্য দেশের মোট বাজেটের কয়েক গুণেরও বেশি। পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ দুবেলা খেতে পারে না। তাদের ভূমি আর মাথার ওপর খোলা আকাশ ছাড়া জীবন ধারণের কোনো উপকরণ নেই। আবার অনেক দেশে ভূমি, খোলা আকাশ থাকলেও সে আকাশ থেকে যে পরিমাণ বোমা ফেলা হয়, তাতে আর সে ভূমি বাসযোগ্য নয়। একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে সলিল-সমাধি হচ্ছে নারী-শিশু-বৃদ্ধ। সারা পৃথিবীতে কোনো কিছুর অভাব নেই। শুধুই হাহাকার চলছে শান্তির জন্য। এই শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে কথিত আধিপত্যবাদ, আধুনিক উপনিবেশ, ভূ-রাজনৈতিকভাবে অন্যের ভূমিতে মোড়লিপনা, খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস; কথিত সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ও স্বৈরাচারী উৎখাত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে যুদ্ধ চলছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যেসব দেশে শান্তিপ্রতিষ্ঠার নামে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ বা স্বৈরাচারী উৎখাত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অভিযান চালানো হয়েছিল বা হচ্ছে সে দেশগুলোয় সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমন বা স্বৈরাচারী উৎখাত করে গণতন্ত্রের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কি সম্ভব হয়েছে? ‘না’, সহজ উত্তর।

আমেরিকার এই মহাকাশ বাহিনী মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা দেবে। কারণ আমেরিকা যখন মহাকাশে আধিপত্য বিস্তারের জন্য মরিয়া থাকবে, তখন অন্য দেশগুলোও নিজের নিরাপত্তা, স্বার্থ রক্ষা ও শান্তির দোহাই দিয়ে মহাকাশে আধিপত্য বিস্তারে মত্ত হবে। এখন যেমন জমিনে রক্তপাত হচ্ছে, তখন আকাশ থেকে রক্তবৃষ্টি হবে। বিশ্বের বিভিন্ন মানব ও মানবতার সেবা ও অধিকার প্রতিষ্ঠাকারী ও কামী প্রতিষ্ঠানগুলো কি কিছু করতে পারবে? ‘না’, এখানেও একই উত্তর আসে। কারণ জাতিসংঘসহ বিশ্বে যে প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করে এসবগুলোর জন্ম যুদ্ধবাজ এসব কথিত শান্তিকামী দেশগুলোর হাতেই। কৌশলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে, এমন নকশায় সুকৌশলে সৃষ্টি করে যা তাদের অধীনস্থ বা অধীনস্থ নয়, এমন সব দেশই মেনে নেয়ে। আর এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তারা নিজেদের সব অবৈধ কর্মের লাইসেন্স জোগাড় করে। যদি কখনো এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বার্থের চুল পরিমাণ বাইরে কিছু করে, তাহলে অনুদান বন্ধ করে দেয়। নিজেদের বৈশ্বিক নীতিমালা থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। প্রতিষ্ঠাটি নিয়ে বিষোদ্গার শুরু করে। যেমন বর্তমানে আমেরিকা জাতিসংঘে অনুদান কমিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশন থেকে আমেরিকা নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ইউনেসকো থেকেও সরিয়ে নিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের নিয়ে কাজ করে ইউএন রিলিফ অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার এজেন্সির (ইউএনআরডব্লিউএ) অনুদান কমিয়ে দিচ্ছে। এর মূল কারণ ফিলিস্তিনিরা ট্রাম্পের (৬ ডিসেম্বর ২০১৭ জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা) সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। আর শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে তিনি যে শতাব্দীর সেরা প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটাও মানেনি। সুতরাং তাদের খাবার বন্ধ। গত ৮ মে ট্রাম্প একক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ২০১৫ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির পারমাণবিক চুক্তি থেকেও জাতিসংঘকে ও অন্য দেশগুলোর সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বের হয়ে গেছে। এখন আবার ইরানের ওপর আবার নিষেদ্ধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু জাতিসংঘ আমেরিকার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। একইভাবে অন্য শক্তিধর দেশগুলোর ক্ষেত্রেও এ কথা বলা যায়। এই হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর শক্তি, মূল্যায়ন ও চরিত্র।

সুতরাং আমেরিকার মহাকাশ বাহিনী একুশ শতকে নতুন রণ-উন্মাদনা সৃষ্টি করবে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাকিয়ে এ খেলা দেখবে। যার ফল তথা প্রতিক্রিয়াভোগী হবে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশের মানুষ। যারা কেবল শান্তির গান গাই। বুঝি আর না বুঝি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম

sadikiu099@gmail.com

"