নিবন্ধ

রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের নাম

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ

১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির শোকের দিন। এখন থেকে ৪৩ বছর আগে ১৯৭৫ সালের সেই ১৫ আগস্ট ভোরে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীদের মদদে এ দেশেরই কিছু দুর্বৃত্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে। পরিকল্পনাটি ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সবংশ নিশ্চিহ্ন করা এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে লোপাট করে দেওয়া। সেদিন রেহাই পায়নি বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র রাসেল কিংবা পুত্রবধূরাও।

একাত্তরের পরাজিত শক্তির সুগভীর ষড়যন্ত্রে প্রাণ হারাতে হয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতিকে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে প্রকারান্তরে খুনিচক্র বাঙালি জাতির আত্মাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। মুয়াবিয়াপুত্র ইয়াজিদের হাতে হজরত ইমাম হোসেন (রা.) ও মীরজাফরের ষড়যন্ত্রে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার হত্যাকা-ের পর ১৫ আগস্ট ইতিহাসের একটি মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।

১৫ আগস্টের ঘটনা জাতীয় রাজনীতিতে অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা পরিবর্তনের যে কালো অধ্যায়ের সূচনা করে তার পরিণতিতে বারবার বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে যে সাম্প্রদায়িকতা ও দ্বি-জাতিতত্ত্বের বিভেদ নীতিকে বাংলাদেশের মানুষ কবর দিয়েছিল, তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস চলে ১৫ আগস্টের পর থেকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বাংলাদেশের মানুষ খুনিচক্র এবং তাদের দোসরদের সে ষড়যন্ত্র সফল হতে দেয়নি। ১৯৯৬ সালে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল হয় দেশবাসীর প্রত্যাশার পরিপূরক হিসেবে। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং খুনিদের পাঁচজনের মৃত্যুদ- কার্যকর হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ৪৩ বছর আগে প্রাণ হারিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির এজেন্টদের হাতে। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যদি লিখতে হয়, তবে সর্বপ্রথম লিখতে হবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক নেতা, পূর্বপাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পুরোধা এবং বাংলাদেশের জাতির জনক। জনসাধারণের কাছে তিনি শেখ মুজিব নামে বেশি পরিচিত এবং তার উপাধি হচ্ছে বঙ্গবন্ধু। আগস্ট মানেই জাতির বেদনা বিধুর শোকের মাস, এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের নাম। স্বাধীন বাংলাদেশে এ মাসে নেমে আসে বাঙালি জাতির ওপর এক কালো থাবা। বাঙালির ইতিহাসে কলঙ্কিত এক অধ্যায় সূচিত হয়েছে আগস্ট মাসেই। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাঙালি জাতি পিতৃহত্যার বিচারের রায় কার্যকরের মাধ্যমে কলঙ্কমুক্ত হলেও আমাদের প্রতিটি শিরা, উপশিরা ও ধমনীতে ঘাতকদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণার উদ্রেক করে এ মাস।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে ফেলার অপচেষ্টায় এক কালো অধ্যায়ের সূচনা করে অপরিণামদর্শী ঘাতকরা। অকৃতজ্ঞ ঘাতকরা ১৫ আগস্ট কালরাতে শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, ঘৃণ্য নরপশুরা একে একে হত্যা করেছে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেলসহ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামালকে। জঘন্যতম এই হত্যাকা- থেকে বাঁচতে পারেনি বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মণি, কর্নেল জামিলসহ ১৬ জন সদস্য ও আত্মীয়স্বজনকে। ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নির্মম ও কলঙ্কজনক অধ্যায়ের দিন। পঁচাত্তরের এই দিনে যা ঘটেছিল, তা মানবেতিহাসের ঘৃণ্যতম অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সর্বোপরি গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রতি এ ঘটনা ছিল ভয়ংকর কুঠারাঘাত।

পরিশেষে বলছি, এখনো প্রতিক্রিয়াশীল সেই অপশক্তি দেশ থেকে উৎখাত হয়ে যায়নি। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা শুধু ব্যক্তিকে হত্যাপ্রয়াস ছিল না, ছিল জাতির স্বাধীনতার শক্তিকে হত্যার অপচেষ্টা। ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে খুন করে তারা একটি আদর্শকে খুন করতে চেয়েছিল। কিন্তু এ দেশে তা কখনো সম্ভব হবে না। স্বাধীনতার আদর্শকে নিরঙ্কুশ করতে এখন আমাদের প্রয়োজন বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বাস্তবায়ন করা। আর সে আদর্শ হলো গণমানুষের ভাত-কাপড় নিশ্চিত করা, কৃষকের হাতকে শক্তিশালী করে তোলা, আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠা করা, সমাজের ধনী-দরিদ্র বৈষম্য দূর করা। এসব বাস্তবায়ন করতে পারলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতি হিসেবে আমরা জাতির জনকের খুনের দায় কিছুটা হলেও শোধ করতে পারব। মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধুর অর্জন স্বাধীনতাকে যারা মেনে নিতে পারেনি, তাদের ব্যাপারেও সদা সজাগ থাকতে হবে। যাতে করে আর কোনো শোক বাংলার মানুষের ওপর শত্রুরা চাপিয়ে দিতে না পারে। শোকাবহ এই দিনে আমরা স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর নিহত পরিবারবর্গকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

 

লেখক : সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ল’ ইয়ার্স ফোরাম

"