মতামত

বিশ্বাস ও সরলতায় বঙ্গবন্ধু

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

পঞ্চানন মল্লিক

বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন নিজের জীবন বাজি রেখে, জেল-জুলুম, নির্যাতন সহ্য করে তিনি বাঙালির জন্য মহান স্বাধীনতা এনেছেন। তাই কোনো বাঙালিই তাঁর ক্ষতি করতে পারে না। এই বিশ্বাস এবং সরলতা নিয়েই তিনি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ গঠনে মনোনিবেশ করেছিলেন। নিজেকে শাসক নয়, বরং বাঙালি জাতির এক মহান সেবক হিসেবে নিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নের পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত এক ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে টেনে তুলছিলেন তিনি। বাঙালি কাউকে তিনি পর ভাবেননি বরং ভাবতেন সমগ্র বাংলাদেশ তাঁর পরিবার, আর সমস্ত বাঙালি তাঁর আপন সন্তানের মতো। ছেলে যেমন বাবার কোনো ক্ষতি করে না, তেমনি কোনো বাঙালিই তাঁর ক্ষতি হোক এটা চাইতেই পারেন নাÑএ বিশ্বাসে তিনি স্থির ও অবিচল ছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই বিশ্বাস, সেই সরলতাও আক্রান্ত হলো সেনাবাহিনীর ক্ষমতালোভী কিছু বিপদগামী মানুষরূপী হায়েনার হাতে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বাঙালি জাতির জীবনের দুর্ভাগ্যজনক সেই কালরাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সাদামাটা বাড়িটি রঞ্জিত হলো জনকের রক্তে। সিঁড়িতে গড়িয়ে গেল রক্তের স্রোত। একপাশে পড়ে রইল ভাঙা চশমাটি আর মেঝেতে কতকগুলো নিথর দেহ। বাঙালি জাতির জীবনে বড়ই কষ্টের, বড়ই শোকাবহ সেই ঘটনা। সেই কথা স্মরণ করলে আজও যেন কষ্টে নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে, এক অব্যক্ত ব্যথায় ছটফট করে মন। জাতির জনককে হারানোর বেদনা বড়ই মর্মান্তিক, বড়ই ক্ষতির। সেই ক্ষতিতে আজও শোকের মাতম ওঠে বাঙালির হৃদয় গহিনে। ব্যথাতুর হয় মন। সেই স্মৃতি নিয়ে আজও কেউ গুমরে কাঁদেন নীরবে, কেউ শোক ব্যক্ত করেন বিভিন্ন অভিব্যক্তিতে। কেউ তাঁকে খুঁজে পান আপন চেতনার অস্তিত্বে, বিশ্বাসে। এমনিভাবে তাকে নিয়ে বাঙালি কবির কলম ফেটে বেরিয়ে আসে কষ্ট ও সান্ত¦নার পঙ্ক্তিমালা, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটি আমাকে এখনো কাঁদায়, মনে মানচিত্র হয়ে ভাসে জনকের মুখ। অতঃপর একটি দীর্ঘ নদীর গল্প শুনব বলে জলের কাছে যাই, জল বলে, ‘আমি ও আমার নদী তো শুধু মুজিবের কথাই বলি।’ একটি সুরেলা পাখির গান শুনব বলে বৃক্ষের কাছে যাই, বৃক্ষ বলে, ‘আমি ও আমার পাখিটি এখন মুজিবের গানই গাই।’ একটি পরান মাঠের স্বপ্ন খুঁজব বলে শস্যের কাছে যাই, শস্য বলে, ‘আমি ও আমার সবুজ তো তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) স্বাধীন দেশেই থাকি।’ একটি প্রিয় দেশের নাম জানব বলে পতাকার কাছে যাই, পতাকা বলে, ‘আমি ও আমার ঠিকানাকে তোমরা মুজিব বলেই জেন।’ এভাবে দেশ, নদী, পাখি, বৃক্ষ, শস্য ও পতাকায় সেই মৃত্যুঞ্জয়ী প্রিয় মানুষটিকে যেন আবার খুঁজে পাই। ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই ক্ষ্যান্ত হননি। ওইদিন তারা হত্যা করেছিল তাঁর পরিবারের সদস্যদের, দেহরক্ষী ও কাজের লোকদেরও। এমনকি মাত্র ১১ বছরের নিষ্পাপ শিশু রাসেলকেও তারা রেহাই দেয়নি। এই অবুজ শিশুর রক্তেও রঞ্জিত হলো স্বাধীন দেশের মাটি। রাসেলের শোকে তাই কলম ধরেন ছড়াকার এভাবেÑ‘রাসেল নামের ছোট্ট শিশু ঘুরতো ফিরতো স্বাধীন দেশে, আলতো পায়ে সরল মনে চলতো-ফিরতো আপন বেশে। হঠাৎ করে হায়না এলো সঙ্গে এলো ক্রান্তি কাল, রাসেল শিশুর রক্তে হলো স্বাধীন দেশের মাটি লাল। হারিয়ে গেলো প্রাণের মুজিব সঙ্গে প্রিয় রাসেলও, ছোট্ট শিশুর জীবন রেহাই দেয়নি ওদের মাসেলও।’ প্রতি বছর আগস্ট এলে তাই শুরু হয় বাঙালির শোকগাথা। জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে, শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। চারদিকে আবার বেজে ওঠে, ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই। তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা। আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা।’ অথবা ‘চল্ বাঙালি চল্ আমরা টুঙ্গিপাড়ায় যাই, শেখ মুজিবের কবরখানা দেখে আসি ভাই। বঙ্গবন্ধু জাতির পিতাÑএমন একজন মহান নেতা আর তো কেহ নাই, ভাইরে আর তো কেহ নাই। একাত্তরে বজ্রকণ্ঠে দিলেন ঘোষণা, পাকিস্তানি শাসন তোরা আর তো মানিস না। বীর বাঙালি তাঁর কথাতেÑযুদ্ধে গেল অস্ত্র হাতে, জীবন-মরণ লড়াই করে দেশটা স্বাধীন তাই।’ বঙ্গবন্ধু শুধু দেশ স্বাধীন করেই বসে থাকেননি। তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন দেশ ও বাঙালি জাতির উন্নয়ন। তাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছিলেন দেশ গঠন আর দেশের মাটি ও মানুষের উন্নয়নের জন্য। আজ তাঁর স্বাধীন দেশে দাঁড়িয়ে এ কথা বলতে চাই, তাঁর মৃত্যুতে যে ক্ষতি হয়েছে, বাঙালি জাতির, কোনো কিছুর বিনিময়ে তা পূরণ হওয়ার নয়। তবু শোককে শক্তিতে পরিণত করে তাঁর আদর্শ নিয়ে আমরা সম্মুখে হাঁটতে চাই। কামনা করি তাঁর মতো যেন কারো নিষ্পাপ বিশ্বাস আর সরলতা কখনো কোনো অপশক্তি দ্বারা আর আক্রান্ত না হয়।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

"