মতামত

নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

আবু আফজাল মোহা. সালেহ

বিভিন্ন কারণে গ্রামের লোকজন শহরে বসবাস করে। আর রাজধানী ঢাকা শহরে এর পরিমাণ অনেক বেশি। কর্মসংস্থান, শিক্ষাসহ বিভিন্ন কারণে ঢাকায় পাড়ি দেয় বেশির ভাগ মানুষ। আর ঢাকায় সেটেল্ড হওয়া অনেকের বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন গ্রামের বাড়িতে থাকেন। আর ঈদের সময় নাড়ির টানে তাদের বেশির ভাগই গ্রামের বাড়িতে যান। বিশেষ করে ঈদুল ফিতর এ চাপটা বেশি হয়। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে অনেক কষ্ট সহ্য করে মানুষ গ্রামের বাড়িতে ছুটে যায়। সবাই জানে ঈদের যাত্রায় ভোগান্তি হয়, তারপরও নাড়ির টানে মানুষ ছুটে চলে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। মানুষ ছুটে চলে তার আপন ঠিকানায়, মাটির টানে।

মহাসড়কের খারাপ অবস্থা, বিভিন্ন রকমের পরিবহন চাঁদাবাজি, একই সঙ্গে ছুটি, টিকিট কালোবাজারি, পরিবহন মালিক/শ্রমিকের অসাধু পন্থা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ইত্যাদি ঈদের যাত্রাকে ভোগান্তি করে তোলে। ট্রেনযাত্রা আরামদায়ক হলেও সম্প্রতি পাথর ছোড়া প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যা ভোগান্তিতে এবার নতুন চিন্তা যুক্ত হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে ঈদের সাত দিন আগে থেকেই শুরু হওয়া যানজট। জনগণের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। এ জন্য মহাসড়কের দিকে সর্বদাই নজর রাখাটা হবে জরুরি। সড়ক ভালো রাখার জন্য প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় নির্দিষ্ট কমিটি গঠন করা যেতে পারে। ঈদের সময় যেহেতু চাপ বাড়ে, মহাসড়কের মেরামতের কাজ এত দ্রুত সম্ভব নয়। এ বিষয়ে নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। অপ্রয়োজনীয় যান ও শৃঙ্খলা বজায় রাখলে যাত্রা নির্বিঘœ করা সহজ হবে। এ বিষয়ে প্রশাসনের বড় ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। ঈদে মহাসড়কে যানজট ও ভোগান্তি রোধে পুলিশ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ঈদের আগে এবং পরে অন্তত এক সপ্তাহ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব সড়কে উন্নয়নকাজ স্থগিত রাখা যেতে পারে। যান চলাচল নির্বিঘœ করতে সড়ক দখলমুক্ত করতে হবে। সড়কের পাশঘেঁষে তৈরি সব স্থাপনা রাখা যাবে অস্থায়ী দোকানপাট/স্থাপনা বসানো যাবে না। ঈদের সময় দেখা যায় পরিবহন শ্রমিকরা যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং বা যাত্রী ওঠা-নামা করে। দূরপাল্লার গাড়ি যেখানে-সেখানে থামানো যাবে না। গতিসীমা নিয়ন্ত্রিত থাকতে হবে, ওভারটেক নয়। এতে যানজট সৃষ্টি হয়ে ভোগান্তির মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। তাই যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং ও যাত্রী ওঠা-নামা বন্ধ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ব্যাপারে তৎপর হবে আশা করি। লক্কড়ঝক্কড় মার্কা গাড়ি যেন রাস্তায় চলতে না পারে সে জন্য বিআরটিএ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ বা তাদারকি করতে হবে।

ঢাকা বা আশপাশের শহরের শিল্পাঞ্চল বিশেষ পোশাক কারখানা অনেক বেশি। এখানে প্রচুর পরিমাণে পোশাককর্মী চাকরি করেন। একই সঙ্গে ঈদের ছুটি হওয়ায় পরিবহনে চাপ পড়ে। ছুটির সংখ্যা ঠিক রেখে ঈদের আগে ও পরে ছুটিন দিন পুনর্বিন্যাস করে একই সঙ্গে/দিনে যাত্রার চাপ কমাতে পারে। এ ক্ষেত্রে পোশাক মালিকরা একটু সদয় হলেই এ সমস্যার অনেকখানি সমাধান হবে। ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘœ করতে মহাসড়কে পুলিশের পর্যাপ্ত উপস্থিতি/টহল থাকতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোয় শৃঙ্খলা রাখতে হবে। ঢাকার প্রবেশমুখগুলোয় যান চলাচলে শৃঙ্খলার বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের কঠোর হতেই হবে। ঈদের সময় অতিরিক্ত ব্যবসা করার জন্য লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি, এমনকি নসিমনও হাইওয়েতে চলাফেরা করে। গাড়ির কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে যানজট লেগেই থাকে। ঈদের আগে ও পরের কিছুদিন হাইওয়েতে ট্রাক ও লরি বন্ধ রাখা যেতে পারে। ট্রেনের বগি ও বাসের সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। ঈদের যাত্রার বড় একটি ভোগান্তি হচ্ছে টিকিট সংকট। অনেক ক্ষেত্রে কালোবাজারির হাতে চলে যায়। এ ক্ষেত্রে বড় সমাধান হতে পারে অনলাইনে টিকিট কেনার সুযোগ বাড়িয়ে দেওয়া। অনলাইনে টিকিটের হার বাড়ালে মানুষজন যেকোনো প্রান্ত থেকে বা ঘরে বসে টিকিট কাটতে পারবে। এতে প্রকৃত যাত্রীদের অনেকেই টিকিট পাবে। এবার যেহেতু ঈদে ছুটি কম, তাই ছুটি বৃদ্ধি করেও যানজট নিরসন করা সম্ভব।

যাত্রাপথে আরো কিছু যন্ত্রণা ঈদের যাত্রাকে বিষময় করে তোলে। নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার অমানবিক কষ্টের মধ্যেও মানুষকে পড়তে হচ্ছে অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি ও ছিনতাইকারীদের কবলে। ছিনতাইকারীরা ছিনতাই কাজে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার ব্যবহার করছে। তারা ধরা পড়ছে, সাময়িক শাস্তি হচ্ছে, আবার বের হয়ে বর্ধিত আকারে তাদের কাজ করে যাচ্ছে। এর থেকে নিস্তার পেতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একমাত্র ভরসা। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এবার ঈদের আগে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। আর তা হলো চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়া। রেললাইনের পাশে গড়ে ওঠা বস্তি থেকে খেলার ছলে কিংবা দুর্বৃত্তরা এই পাথর নিক্ষেপ করে। তা ছাড়া বেশির ভাগ রেললাইন অরক্ষিত। রেললাইনে অযাথা লোকজনকে ঘোরাফেরা করতে দেওয়া যাবে না। জনসচেতনতা বাড়িয়ে অপরাধীকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার কর্মীরাও যাত্রা ভোগান্তির কারণ উপস্থাপন করে সরকার/নজরে আনতে পারেন। এতে সংশ্লিষ্টরা আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমস্যার সমাধানে সহযোগিতা করতে পারে। বাংলাদেশের মানুষের ঈদে নিরাপদে বাড়ি অন্যতম ও আরামদায়ক মাধ্যম হলো বাংলাদেশ রেলওয়ে। আর ঈদযাত্রা সফল করতে বাংলাদেশ রেলওয়েকে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। সঠিক সময়ে টিকিট বিক্রি শুরু করা, ট্রেনসংখ্যা ও বগিসংখ্যা আরো বৃদ্ধি করাসহ নানামুখী পদক্ষেপ দরকার। আর দুর্ঘটনা এড়াতে ট্রেন ও বাসের ছাদে ভ্রমণ থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

আসলে ঈদযাত্রাকে সুখময় ও আরামদায়ক করে তুলতে হলে শুধু সরকার বা পরিবহন মালিক বা অন্যের ওপর ভরসা করলেই হবে না। যাত্রী হিসেবে আমাদেরও সহযোগীর ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের আগে নিয়ম মেনে তারপর অন্যের কাছে নিয়ম আশা করতে হবে। দেখা যায়, আমি অন্যের ওপর নিয়ম আশা করি কিন্তু একটু সুবিধার জন্য নিয়ম ভেঙে সুযোগ নিতে ইচ্ছা করি। এ রকম একটু চাওয়া সমগ্র সিস্টেমকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। আমরা এ রকম হব না আশা করি। অন্যকেও এ রকম হতে সাহায্য করব না। তাহলে সামগ্রিক এবং পারস্পরিক সহযোগিতায় ঈদের যাত্রায় ফিরে আসবে আরামদায়ক।

লেখক : বিআরডিবির উপপরিচালক, লালমনিরহাট

abuafzalsaleh@gmail.com

"