নিবন্ধ

যুবসমাজের হাতেই পরিবর্তন

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

অলোক আচার্য্য

জাতীয় যুব নীতিমালা অনুসারে ১৮ বছর থেকে ৩৫ বছর পর্যন্ত বয়সীদের যুব বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সে হিসেবে জনসংখ্যার বেশির ভাগ অংশই যুবসমাজ। বিখ্যাত অক্সফোর্ড ডিকশোনারিতে যৌবনের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ‘ণড়ঁঃয রং ঃযব ষরভব যিবহ ধ ঢ়বৎংড়হ রং ুড়ঁহম. ঊংঢ়বপরধষষু ঃযব ঃরসব নবভড়ৎব ধ পযরষফ নব পড়সবং ধং ধফঁষঃ : ঃযব যধফ নববহ ধ ঃধষবহঃবফ সঁংরপরধহ রহ ঃযরং ুড়ঁঃয. ঞযব য়ঁধষরঃু ড়ৎ ংঃধঃব নবরহম ুড়ঁহম.’ এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। যুগে যুগে লেখক, কবিরা গেয়েছেন তারুণ্যের জয়গান। তারুণ্য মানে নব জোয়ারে বিপুল শক্তি, তরুণ মানে নব উদ্যমতা। সব বাধা, সক ক্লেশ দূর করতে যুবশক্তির বিকল্প কিছুই হতে পারে না। বুকভরা একরাশ সাহস নিয়ে বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে অধিকার চাইতে যে একবারও ভাবে না, সেই তো তরুণ। তাই তো তারুণ্যের জয়গান করাই স্বাভাবিক। মানুষের জীবনের স্তরগুলোর মধ্যে শিশু, কিশোর, যুবক বা তরুণ এবং বৃদ্ধ। এর মধ্যে তরুণ সময়টা অনেক বেশি পাওয়া যায়। কেননা এ সময়ের মধ্যে আমাদের অনেক কাজ করতে হয়। বলতে গেলে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ, সিদ্ধান্ত এ সময়েই নিতে হয়। কারণ এ কাজের ওপর ভবিষ্যতের বেঁচে থাকার পথ নির্দেশিত হয়। যুবক বয়সে পরিশ্রম করতে হয়, জীবন নামক যুদ্ধের সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়। কারণ একটা বয়সে এসে শরীর তার শক্তি হারাতে থাকে। কর্মশক্তি কমতে থাকে। সেই সঙ্গে মনের জোরেও ঘাটতি দেখা দেয়। যদিও জীবন মানেই সংগ্রাম আর এ সংগ্রামের উপযুক্ত সময় হলো তারুণ্য। বৃদ্ধ বয়সে মনের জোর থাকলেও শরীর তখন নানা জরা ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। তাই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি বৃদ্ধ বয়সে খুব কম মানুষেরই থাক। তাই যা কিছুই অর্জন করি না কেন, তার সিংহভাগের সময়ই তারুণ্য। দেশের যুবসমাজ হলো দেশের প্রাণশক্তি। যুবসমাজ যত বেশি দক্ষ হবে দেশ তত সমৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হবে।

এ কথা বলা হয়ে থাকে, ইতিহাস লিখে যান বয়স্করা কিন্তু তা তৈরি করেন তরুণরা। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তির আন্দোলনে সর্বপ্রথম যুবসমাজই প্রত্যক্ষ সমরে বুক পেতে দাঁড়িয়েছে। কামানের সামনে নির্দ্বিধায় দাঁড়িয়ে বলেছে স্বাধীনতা চাই, মুক্তি চাই। অধিকার আদায়ে সদা সর্বদা দৃঢ় মনোভাব পোষণ করেছে এই যুবসমাজ। ভারতীয় উপমহাদেশ যখন ব্রিটিশদের অধীনে থেকে নিষ্পেশিত হচ্ছিল, সে সময় থেকে আরম্ভ করে বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া, স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ এসব আন্দোলন, সংগ্রামে যুবসমাজের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। ওরাই যে দেশের প্রাণভোমরা। প্রতিটি হাত একেকটি দেশ গড়ার হাতিয়ার। যেখানেই হাত রাখে সোনা তো ফলবেই। তরুণদের চোখে থাকে স্বপ্ন। বুকে থাকে আশা। ওরা স্বপ্ন দেখে এবং স্বপ্ন দেখায়, যা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সমাজকে পরিবর্তন করে। বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করে। যারা বয়োজ্যেষ্ঠ তাদের স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব তুলে নেয় যুবসমাজ। মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্তে মূল ভূমিকা রেখেছিল কিন্তু তরুণ বা যুবসমাজই। এ বয়স থেকেই শুরু হয় তারুণ্যের চঞ্চলতা, জীবনকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার দুর্বার চেষ্টা। যার সামনে কোনো বাধাই বাধা হতে পারে না। যুব সম্প্রদায়ের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর জন্য সারা বিশ্বে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। আমাদের দেশেও যুব সম্প্রদায়ের মেধার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে যুবকদের কারিগরি বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে হাতেকলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া উল্লেখযোগ্য। যার মূল লক্ষ্যই হলো যুব সম্প্রদায়ের হাত দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলে দেশের উন্নয়নে অবদান নিশ্চিত করা। আমাদের দক্ষ জনশক্তির একটি বড় অংশই যুবসমাজ।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান যুবসমাজের একটি অংশ আজ দ্বিধাগ্রস্ত। নানা কারণে তারা বিভক্ত, হতাশাগ্রস্ত। এ অবস্থার পেছনে কারণ হিসেবে রয়েছে সর্বনাশা মাদকের গ্রাস। ফেনসিডিল, হেরোইন ছাড়িয়ে আজ ইয়াবার মতো অতি মারাত্মক এবং ধ্বংসকারী মাদকদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ছে যুবসমাজের একটি অংশ। এ ছাড়া আধুনিক যুগের নামে ইন্টারনেটের অপব্যবহার করছে। পর্ণোগ্রাফিতে ঝুঁকছে তারা। শিক্ষাজীবন শেষ করার পরও দীর্ঘদিন ঘোরাঘুরি করে চাকরি না মেলায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে ঢুকে পড়ছে অন্ধকারে। অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্তি নিতে মাদকে আসক্ত হচ্ছে। মাদক আমাদের যুবসমাজকে গ্রাস করছে। খুব ধীরে ধীরে আমাদের যুবক-যুবতীরা মাদকে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। যার ভয়াল ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে আমাদের মেধা, আমাদের ভবিষ্যৎ।

যুবকরা যুদ্ধের জন্য যোগ্য। যুদ্ধের ময়দানে হার না মানা যৌবনেরই অংশ। যৌবনের শক্তি প্রচ-, গতি তার দুর্বার। তা যেমন পাহাড় ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে, তেমনি প্রবল দুর্যোগে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে সেবার হাত বাড়াতে পারে। এ এমন এক শক্তি যার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে দেশ, জাতি উন্নতির স্বর্ণশিখরে পৌঁছাবে। যুবকরা নিজে শিখবে এবং অন্যদের শেখাবে। আজ যারা কিশোর তারা কদিন পরেই যৌবনে পদার্পণ করবে। সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাবে দায়িত্ব। সেটা যেমন নিজের প্রতি, পরিবারের প্রতি, তেমনি সমাজ ও দেশের প্রতিও সমান দায়িত্ব রয়েছে। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যুবশক্তির বিকল্প নেই।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

 

"