বিশ্লেষণ

অনুপ্রেরণার উৎসে বঙ্গবন্ধু

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এখনো দেশের শতকরা ৪০ ভাগ লোক তাদের জীবন-জীবিকার জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থান, জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও রফতানি আয়সহ প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে কৃষি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশর কৃষি প্রকৃতির ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। খরা, বন্যা ও ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ফসল নষ্ট হয়ে গেলে কৃষকের কষ্টের সীমা থাকে না। বন্যায় ফসলহানির কারণে অনেক সময় খাদ্যদ্রব্যের দাম হুহু করে বেড়ে যায়। তখন স্বল্প আয়ের মানুষের অনাহারে অর্ধাহারে জীবন কাটাতে হয়।

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাঠে জানা যায়, ১৯৪৩ সালে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তা থেকে অসহায় মানুষকে বাঁচানোর জন্য সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে কলকাতায় অনেকগুলো লঙ্গরখানা খোলা হয়। ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র; শেখ মুজিব লেখাপড়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সেবায় ব্যস্ত থাকেন রাত-দিন। সেই দুর্ভিক্ষের সময় গ্রাম থেকে লাখ লাখ লোক শহরের দিকে ছুটছে। খাবার নেই। কাপড় নেই। ইংরেজ যুদ্ধের জন্য সমস্ত নৌকা বাজেয়াপ্ত করে রেখেছে। ধান, চালভর্তি গুদাম সৈন্যদের খাওয়ার জন্য জব্দ করে রাখা হয়েছে, যা কিছু ছিল ব্যবসায়ীরা গুদামজাত করেছে। ফলে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা দশ টাকা মণের চাল চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি করেছে। বাংলাদেশের অনাহারি কঙ্কালসার মানুষের ওই বীভৎস চেহারা কি ভুলতে পারেন শেখ মুজিব? মা মরে পড়ে আছে। ছোট বাচ্চা সেই মরা মায়ের দুধ খাচ্ছে। কুকুর ও মানুষ একসঙ্গে ডাস্টবিন থেকে খাবারের জন্য কাড়াকাড়ি করছে। চিন্তা করা যায়? ছেলেমেয়েদের রাস্তায় ফেলে মা পালিয়ে গেছে। অনেকে পেটের দায়ে নিজের ছেলেমেয়েকে বিক্রি করার চেষ্টা করছে। কেউ কিনতেও রাজি হচ্ছে না। বাড়ির দুয়ারে এসে চিৎকার করে বলছে, ‘মা বাঁচাও, কিছু খেতে দাও, মরে তো গেলাম আর পারি না, একটু ফেন দাও।’ এ কথা বলতে বলতে ওই বাড়ির দুয়ারের কাছেই পড়ে মরে গেছে। কী করুণ দৃশ্য!

বঙ্গবন্ধু ভালোভাবেই জানতেন স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে। মেধাবী ছাত্রদের কাছে কৃষিশিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কাজকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। তাদের পেশার উপযুক্ত মর্যাদা দিতে হবে। কৃষিবিদরাই পারে ফসলের উৎপাদন বাড়িয়ে বাংলার ভোখা-নাঙ্গা মানুষের মুখে তিন বেলা আহার জোগাতে। তাই ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাকসুর এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষিবিদদের চাকরি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করার এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। ওই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘যেভাবে মানুষ বাড়ছে, যদি সেভাবে আমাদের বংশবৃদ্ধি হতে থাকে তবে ২০ বছরের মধ্যে বাংলার মানুষ, বাংলার মানুষের মাংস খাবে। সে কারণেই আমাদের কৃষির প্রতি নজর দিতে হবে। কারণ খাবার অভাব হলে মানুষের মাথা ঠিক থাকে না। প্লান্ড ওয়েতে আমাদের কাজ করতে হবে। তা যদি করি আমি আশা করি ৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভ করবে।’

বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত দুরদর্শী ও কৃষক দরদি নেতা ছিলেন। তাই প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-৭৮) সামাজিক ন্যায়-বিচার, দারিদ্র্যবিমোচন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষি উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের জন্য তিনি কিছু যুগোপযোগী, বাস্তব ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পদক্ষেপগুলো হলো এক. গ্রামাঞ্চলের ২২ লাখ কৃষি পরিবারের পুনর্বাসন ও যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করা। দুই. ফসলের ফলন বৃদ্ধির জন্য ১৯৭২ সালের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে বিনামূল্যে/নামমাত্র মূল্যে ১৬ হাজার ১২৫ টন ধানবীজ, ৪৫৪ টন পাটবীজ এবং ১ হাজার ৩৭ টন গমবীজ কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করা হয়। তিন. ১৯৭৩ সালের মধ্যেই হ্রাসকৃত মূল্যে ৪০ হাজার শক্তিচালিত লো-লিফট পাম্প, ২ হাজার ৯০০ গভীর নলকূপ ও তিন হাজার অগভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করা হয়। চার. পাকিস্তান আমলে দাখিল করা ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে বাংলার নির্যাতিত কৃষকদের মুক্তি দেওয়া হয় এবং তাদের সব বকেয়া ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়। পাঁচ. পঁচিশ বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমির খাজনা রহিত করা হয়। ছয়. ১৯৭২ সালে ইউরিয়া, পটাশ ও টিএসপি সারের ওপর ব্যাপক ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে প্রতিমণ ইউরিয়া, পটাশ ও টিএসপি সারের দাম নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে ২০, ১৫ ও ১০ টাকা। সাত. উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকল্পে ধান, পাট, তামাক, আখসহ গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের ন্যূনতম ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। আট. সরকারি খাসজমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। নয়. গরিব কৃষকদের বাঁচানোর জন্য সুবিধাজনক নিম্নমূল্যে রেশন সুবিধা দেওয়া হয় এবং তাদের ছেলেমেয়েদের বিনাখরচে বা সরকারি খরচে লেখাপড়ার সুব্যবস্থা করা হয়। কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সেগুলো কৃষকের দোরগোড়ায় পেঁৗঁছে দেওয়ার জন্য তার সময়ে বেশ কিছু কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইক্ষু গবেষণা ইস্টিটিউট, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন ইত্যাদি। এর ফলে কৃষির আধুনিক ও লাগসই প্রযুক্তি এবং নতুন নতুন উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনের দ্বার উন্মোচিত হয়।

৫ বছরের পরিকল্পনায় ৬৫ হাজার গ্রামের প্রতিটিতে বহুমুখী সমবায় সমিতি গঠনের ইচ্ছে ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের। ওই সমবায় সমিতিতে জমির মালিকের জমি থাকার ব্যবস্থা ছিল। বেকার কর্মক্ষম প্রত্যেকটি ব্যক্তিকে সমবায় সমিতির সদস্য করার বিধান ছিল। টেস্ট রিলিফ ও ওয়ার্ক প্রোগ্রামের কাজ পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল সমবায় সমিতির মাধ্যমে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূমি খ-ের দালিলিক মালিকানা অক্ষুণœ রেখে আইল তুলে একত্রকরণ করে আধুনিক যান্ত্রিক চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন পাঁচ গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনাও ছিল বঙ্গবন্ধুর। স্থায়ী ভিত্তিতে জমির মালিক ও শ্রমজীবী মানুষের সমন্বয়ে বহুমুখী ও উৎপাদনমুখী সমবায় সমিতি গঠন করে কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার জন্য যখন দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়, ঠিক সেই মুহূর্তে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতের অন্ধকারে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও হানাদার পাকিস্তান সেনাদের দুসর বিপথগামী কিছু অকৃতজ্ঞ সেনা কর্মকর্তার নির্মম বুলেটের আঘাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে সপরিবারে নিহত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু কৃষি উন্নয়নে যে বিপ্লবের সূচনা করেন, সেই পথ ধরেই তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে সরকার গঠনের পর থেকে অদ্যাবধি কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। সার ও সেচে ভর্তুকি প্রদান, নন-ইউরিয়া সারের দাম চারবার হ্রাস করা, দশ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান, আউস চাষে প্রণোদনা প্রদান, আখ চাষ ও কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি প্রদান, শতকরা ৪ ভাগ সুদে আমদানিনির্ভর মসলা, তেলবীজ জাতীয় ফসল চাষে ঋণ প্রদান, কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন ইত্যাদি। এসব কৃষিবান্ধব কর্মকা-ের ফলে দেশ আজ দানাশস্য ও মাছ উৎপাদনে স্বয়সম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বছরে প্রায় ৪ কোটি টন খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে। বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, আম উৎপাদনে সপ্তম এবং আলু উৎপাদনে অষ্টম স্থান অধিকার করেছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে মানুষের গড় আয়ু, মাথাপিছু বার্ষিক আয়, দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স প্রভৃতি সূচকে বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেক প্রতিবেশী দেশকে পেছনে ফেলে দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, লাল সবুজের পতাকা থাকবে, কর্মঠ কৃষক থাকবে, উর্বর মৃত্তিকা থাকবে, তত দিন শস্যের সবুজ শব্দে উচ্চারিত হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম। এ নাম নক্ষত্রের মতো কৃষকের প্রতিটি আন্দোলনে, সফলতা ও সংগ্রামে অনুপ্ররণা জোগাবে অনন্তকাল।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড, নাটোর

 

"