পর্যালোচনা

তুমি পথ হারিও না বন্ধু

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

এস এম মুকুল

লাইন ধরে গাড়ি চালান, লেন নিয়ম মেনে চলুন, ট্রাফিক আইন মেনে চলুন, ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাবেন না, নিয়ম মেনে চলুন, রাস্তা বন্ধ রাষ্ট্রের সংস্কার চলছেÑ কয়েকদিন ধরেই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সহপাঠীদের বিচারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের ওসিলায় এই বিষয়গুলো জনগণের মাঝে প্রচ- আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম ব্যতিক্রম, অনন্য একটি আন্দোলন গোটা রাষ্ট্রকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা পথে নেমে দেখিয়ে দিয়েছে, সদিচ্ছা থাকলে দেশের সবকিছুতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ছেলে মেয়েরা প্ল্যাকার্ডে সুন্দর সুন্দর ছন্দবাক্য লিখে আমাদের ভোঁতা হয়ে যাওয়া অনুভূতির দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। আন্দোলনটির শুরু, প্রথম তিন দিনের ধারাবাহিকতা, ৯ দফা দাবির যৌক্তিকতা সবকিছুই ঠিক ছিল।

সড়কে প্রাণ পিষে বেপরোয়া বাসেÑ মন্ত্রী মশাই তুলনা করে, তুষ্ট চিত্তে হাসে! সড়ক দুর্ঘটনায় সম্প্রতি শিক্ষার্র্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় নৌ-পরিবহনমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্ন জবাবে এই মৃত্যুকে সংখ্যা তত্ত্বে পাশের দেশের সঙ্গে তুলনা করে চরম স্পর্ধা ও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। যদিও বাংলাদেশে মন্ত্রীদের বেফাঁস বিবৃতির উদাহরণ এটাও নতুন নয়। মন্ত্রীর এমন তাচ্ছিল্যপনায় সারা দেশের মানুষ হতবাক, বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে দেশজুড়ে। ঘৃণাভরে মন্ত্রীকে প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশবাসী। তার দ্রুত পদত্যাগ দাবি করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে মন্ত্রীদের বড় বড় কেলেঙ্কারির ঘটনায়ও পদত্যাগের উদাহরণ নেইÑ এটা দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক। ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করা ব্যক্তির জন্য সাময়িক গ্লানিকর বিষয় হলেও তার নিজের, দলের এবং জাতির ভাবমূর্তির জন্য নিঃসন্দেহে মর্যাদাকর বিষয় হতে পারত। তবু কেন জানি মন্ত্রিত্ব বা ক্ষমতার মোহ অতি সহসা কেউ ত্যাগ করতে চায় না।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তা আটকে আন্দোলন করছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। প্রথমে তাদের আন্দোলন রোধ করতে পুলিশও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই ঘটনাচক্রে আবারও পুলিশের প্রতি জনগণের অনাস্থা প্রদর্শিত হয়। জনগণ ঘৃণায় ধিক্কার জানিয়েছে। অতপর জরুরি ভিত্তিতে মন্ত্রিপরিষদের মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী নৌ-পরিবহনমন্ত্রীকে সতর্ক করেছেন। মন্ত্রী ক্ষমাও চেয়েছেন। শিক্ষার্থীরা তার পদত্যাগ দাবি অব্যাহত রেখে নিরাপদ সড়কে পথচলার জন্য ৯ দফা দাবি জানিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু ন্যায্য আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকারের জরুরি বৈঠক, ৯ দফা দাবি মেনে নেওয়ার পর এই আন্দোলন চলমান রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে এখন প্রশ্ন ওঠাই যেন স্বাভাবিক বিষয় হবে। অন্যপক্ষে লাগাতার আন্দোলনের কারণে সৃষ্ট জনগণের ভোগান্তির প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আন্দোলনের ভেতরে বিশৃঙ্খলাকারী কানাগলির ভূত ঢুকে গেছে। এখন এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা তাদের ৯ দফা দাবির বিপক্ষে চলে যাবে। কারণ, সরকার দাবি মেনে নেওয়ার পর তা কার্যকরে আইনগত দিক পর্যালোচনা, আইন গঠন এবং কার্যকরণে যে সময় লাগার সে সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার মানে সরকারকে অগ্রাহ্য করা। সরকার ভালো-মন্দ যেমনই হোকÑ তার বিপক্ষে অপরিপক্ক কোনো আন্দোলনে সার্থকতা আসবে না। অপরপক্ষে, আন্দোলনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুষ্কৃতকারীদের মাধ্যমে যেকোনো ভয়ংকর অঘটন ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মনে রাখতে হবে, শুধু সড়ক নয় সার্বিকভাবে জনগণের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সরকারের। তাই সরকার এ ধরনের কোনো অস্থিতিশীলতার সুযোগ দেবে না এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের সামনে পরীক্ষা আছে, পড়াশোনার চাপ রেখে রাষ্ট্র সংস্কারে ভূমিকা রাখা সময় এখনই নয়। তাদের ফিরে যাওয়া উচিত, পড়াশোনায় মনোনিবেশ করা উচিত। তাদের মাঝে দেশপ্রেমের যে জাগরণ লক্ষ করা গেছে, বড় হয়ে পেশাদারিত্ব পর্যায় পর্যন্ত তা ঠিক থাকলেই আমরা মনে করি একটি সার্থক নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে আগামির বাংলাদেশের জন্য।

দেখলাম, স্কুল পড়–য়া শিক্ষার্থীদের অকস্মাৎ এই আন্দোলন জনগণের মনে নতুন আশার আগুন জ্বেলেছে। পথহারা, আদর্শহীন, নষ্ট রাজনীতির প্রতি বিস্তৃষ্ণায় অতিষ্ঠ জাতি ভরসার জায়গা খুঁজে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছে এই আন্দোলন থেকে। আগামির বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে এদের মধ্য থেকে উঠে আসা বলিষ্ট প্রত্যয়ী নাগরিক। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই এই আন্দোলনের মাধ্যমে বেশকিছু সফলতা অর্জিত হয়েছে। খুব কম সময়ের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার মতো একটি জনদাবিকে শিক্ষার্থীরা আমলে নিতে বাধ্য করতে পেরেছে সরকারকে। সড়কে যেসব গাড়ি চলে তার অধিকাংশই ফিটনেসবিহীন, যারা গাড়ি চালান তাদের নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স, নেই প্রশিক্ষণ, জানা নেই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে, অদক্ষ অপরিণত বয়সী চালকের হাতে অনিরাপদভাবে জীবনশঙ্কার পথ পাড়ি দিচ্ছে দেশের জনগণ। সরকারের মন্ত্রী, আমলা থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক এমন কি সুশীল সমাজখ্যাত মানুষগুলো রাস্তায় গাড়ি চালনার নিয়ম অনুসরণ করেন না। শিক্ষার্থীরা এসব বিষয় টু দ্য পয়েন্টে ধরিয়ে দিচ্ছে জাতির সামনে। এসব দেখে জেনে যেকোনো মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক যে, দেশটা তাহলে কিভাবে চলছিল। এসব অনিয়মের ভাগাড়ে পরিণত হওয়া রাষ্ট্রের বিজ্ঞ চালকরা কি কিছুই জানতেন না। নাকি তারা জাগ্রত তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ছিলেন?

শিক্ষার্থীরা নিজেরাই রাস্তার ভাঙা কাঁচ ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করেছে। এই ছেলে- মেয়েরাই বুকে সাঁটানো প্ল্যাকার্ডে লিখেছে, ‘৫জি স্পিডের ইন্টারনেট চাই না, ৫জি স্পিডের বিচার ব্যবস্থা চাই!’ ওরা কোনো অন্যায় দাবি করেনি। ওদের দাবিতে শুধু সাধারণ মানুষ নয়; সরকারের ও উপকার হবে। কাজেই এই ছেলে-মেয়েদের দাবি মেনে নিয়ে তাদের ঘরে ফেরত পাঠানো সরকারের দায়িত্ব। সরকার তারই অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। কিন্তু সৃজনশীল, মানবিক এই আন্দোলনের কীভাবে যেন যুক্ত হয়ে গেল অশ্লীলতা! এটা মোটেও কাম্য নয়। একটি ন্যায্য আন্দোলনকে যদি ধ্বংস করে দেওয়া হয় তাহলে সব সম্ভাবনাই সড়কে প্রাণ যাওয়ার মতো করে নিঃশেষ হয়ে যাবে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের আগে আন্দোলন হয়েছে। সেখানেই শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল। কিন্তু চরম বিক্ষুব্ধ আন্দোলনেও ছিল না অশ্লীলতার প্রদর্শন। এ বিষয়টি খুবই ভাবিয়ে তুলছে আমাকে। জননন্দিত এই আন্দোলনটি একটি আদর্শিক ও শিক্ষনীয় আন্দোলনের রোল মডেল হতে পারত। কারণ ছোট ছোট বাচ্চারা বড়দেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে একটি সৃজনশীল আন্দোলন করতে হয়। বিশৃঙ্খলা, বিধ্বংসী আচরণ ছাড়াও কীভাবে দাবি জানাতে হয়। ট্রাফিক সিস্টেম, অনিয়ম, লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চালানো, উল্টো পথে গাড়ি চালানো যে একটি দেশের জন্য চরম অনিয়মÑ সেটা তারা সুন্দরভাবেই তুলে ধরতে পেরেছে। কিন্তু সরকারের দাবি মেনে নেওয়া, নিরাপদ সড়কের জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের ঘোষণা করা, জাতীয়ভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পরও সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা না করে এই আন্দোলন অব্যাহত রাখার যৌক্তিকতার কতটুকুই বা ওরা বোঝে। এখন যেভাবে অশ্লীল সেøাগানে উসকানি দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের অবকাঠামোকে তাচ্ছিল্য করছে শিক্ষার্থীরা তার পরিণতি নিয়েই আমার ভয়। আশা করি শিক্ষার্থীরা ব্যাপারটি বুঝবে। তারা না বুঝলেও অভিভাকরা অন্তত তাদেরকে বোঝাবেন। আর যদি তাও না হয়, তাহলে উসকানির ফাঁদে পড়ে এই আন্দোলণের অর্থহীন সমাপ্তি ঘটবে অচিরেই।

লেখক : বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

writetomukul36@gmail.com

"