বিশ্লেষণ

সাহাবায়ে কিরামদের মর্যাদা

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

মুফতি মাওলানা এহসানুল হক

আরবি ‘সুহবত’ শব্দ থেকে ‘সাহাবি’ শব্দটি এসেছে। আভিধানিক অর্থ সঙ্গী, সাথি, সহচর, একসঙ্গে জীবনযাপনকারী অথবা সাহচর্যে অবস্থানকারী। ইসলামী পরিভাষায় ‘সাহাবা’ শব্দটি দ্বারা রাসুল্লাহ (সা.)-এর মহান সঙ্গী-সাথিদের বোঝায়। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ‘আল-ইসাবা ফি তাময়িযিস সাহাবা ’গ্রন্থে সাহাবির পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘সাহাবি সেই ব্যক্তি, যিনি রাসুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ঈমানসহকারে তার সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপর ইন্তিকাল করেছেন।’

সাহাবিগণ সত্য ও ন্যায়ের মাপকাঠি। একেকজন সাহাবি আকাশের একেকটি তারকার মতো। তাদের পরস্পরের মধ্যে মর্যাদার হিসেবে স্তরভেদ থাকতে পারে, কিন্তু পরবর্তী যুগের এমন কোনো মুসলমানই, তা তিনি যত বড় জ্ঞানী-গুণী ও সাধক হোন না কেনÑ কেউই একজন সাহাবির সমান মর্যাদা লাভ করতে পারবেন না। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা একমত। স্মরণীয় যে, সাহাবিরাই রাসুল (সা.) ও তার উম্মাতের মধ্যে প্রথম মধ্যসূত্র। পরবর্তী উম্মাত আল্লাহর কালাম পবিত্র কোরআন, কোরআনের ব্যাখ্যা, আল্লাহর রাসুলের পরিচয়, তার শিক্ষা, আদর্শÑ মোটকথা দ্বীনের সবকিছুই একমাত্র তাদেরই সূত্রে, তাদেরই মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। সুতরাং, এই প্রথম সূত্র উপেক্ষা করলে, বাদ দিলে অথবা তাদের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি হলে দ্বীন, শরিয়তের মূল ভিত্তিই ধসে পড়ে। কোরআন ও হাদিসের প্রতি অবিশ্বাস দানা বেঁধে ওঠে।

কোনো কোনো সাহাবির জীবদ্দশায় রাসুল (সা.) তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে মুসলিম আলেমগণ সাহাবিদের সবাইকেই জান্নাতি বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ইবনে হাজার ‘আলইসাবা’ গ্রন্থে স্পেনের ইমাম ইবনে হাজমের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আস-সাহাবাতু কুল্লুহুম মিন আহলিল জান্নাতি কাতআন।’ অর্থাৎ, ‘সাহাবিদের সবাই-ই নিশ্চিতভাবে জান্নাতি।’ সাহাবিদের গালি দেওয়া বা হেয় প্রতিপন্ন করা কিংবা সমালোচনা করা সম্পূর্ণ হারাম। রাসুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার পরে তোমরা তাদেরকে সমালোচনার লক্ষ্যে পরিণত কর না। তাদেরকে যারা ভালোবাসে, আমার মুহাব্বতের খাতিরেই তারা ভালোবাসে, আর যারা তাদেরকে হিংসা করে, আমার প্রতি হিংসার কারণেই তারা তা করে, (মিশকাতুল মাসাবিহ)।’ হজরত ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমরা ওইসব লোকদেরকে দেখবে যারা আমার সাহাবিদেরকে গালমন্দ করে, তখন তোমরা বলবে তোমাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার লানত তোমাদের এ মন্দ আচরণের জন্য, (তিরমিজি)।’

সাহাবিদের মর্যাদা ও তাদের ফজিলত সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে জান-মাল দ্বারা জিহাদ করে। তারাই (সাহাবীগণ) সত্যনিষ্ঠ বা সত্যবাদী, (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৫)।’ ‘এমন সব লোকই (সাহাবিরা) সত্যিকারের মুমিন (যাদের ভেতর ও বাহির একরকম এবং মুখ ও অন্তর ঐক্যবদ্ধ)। তাদেরজন্য রয়েছে স্বীয় পরওয়ারদিগারের নিকট সুউচ্চ মর্যাদা ও মাগফিরাত এবং সম্মানজনক রিজিক, (সুরা আনফাল, আয়াত : ৪)।’ সাহাবিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘মুহাম্মাদ (সা.) আল্লহর রাসুল; তার সহচরগণ কাফিরদের ওপর কঠোর এবং নিজেদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাদেরকে রুকু ও সিজদায় অবনত দেখবে। তাদের মুখম-লে সিজদার চিহ্ন থাকবে, তাওরাতে তাদের অনুরূপ গুণাবলির বর্ণনা এবং ইনজিলেও রয়েছে তাদের অনুরূপ গুণাবলি।’ (সুরা আল ফাতহ, আয়াত : ২৯)। ‘মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের অনুসরণ করে, আল্লহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এটা মহা কামিয়াবি, (সূরা আত-তাওবা, আয়াত : ১০০)।’ অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘এ সম্পদ অভাবগ্রস্ত মুহাজিরদের জন্য যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি হতে উৎখাত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তার রাসুলের সাহায্য করে। তারাই তো সত্যাশ্রয়ী। মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা এই নগরীতে (মাদিনা) বসবাস করেছে ও ঈমান এনেছে তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে এবং মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে আকাক্সক্ষা পোষণ করে না। আর তারা তাদেরকে নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও। (সুরা আল-হাশর, আয়াত : ৮৯)। আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট এবং তারা তার (আল্লাহর) ওপর সন্তুষ্ট। এটা তারই জন্য, যে আপন প্রতিপালককে ভয় করে। (সুরা বাইয়্যেনাহ, আয়াত : ৮।)’

সাহাবিদের মহান মর্যাদা সম্পর্কে এসেছে অসংখ্য হাদিস। তার মধ্য থেকে কয়েকটি উল্লেখ করছি। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা আমার সাহাবিগণকে গালমন্দ কর না। কেননা, তারা এমন শক্তিশালী ঈমান ও সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী যে, তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনাও আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, তবুও তাদের এক মুদ (৩ ছটাক প্রায়) কিংবা অর্ধমুদ যব খরচের সমান সাওয়াবে পৌঁছতে পারবে না, (বুখারি : ৩৩৯৭)।’ হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘জাহান্নামের আগুন সে মুসলমানকে স্পর্র্শ করতে পারে না, যে আমাকে দেখেছে। অর্থাৎ, আমার সাহাবিরা কিংবা আমাকে যারা দেখেছে তাদেরকে দেখেছে। অর্থাৎ তাবেয়িরা।’ (তিরমিজি : ৩৮০১)। আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে আমার সাহাবিদেরকে কষ্ট দিল সে যেন আমাকে কষ্ট দিল; যে আমাকে কষ্ট দিল সে যেন আল্লাহকে কষ্ট দিল। যে আল্লাহকে কষ্ট দিল, অচিরেই আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন। (মুসনাদে আহমাদ : ১৯৬৪১)।’ হজরত জাবির রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বিদায় হজের দিন আরাফাতের ময়দানে রাসুলকে (সা.) কাসওয়া উটের ওপর আরোহী অবস্থায় উপদেশ দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, হে মানুষগণ! আমি তোমাদের মাঝে এমন দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি যার অনুসরণ ও অনুকরণ করলে তোমরা অবশ্যই পথ হারা হবে না। তা হলো, আল্লাহ পাকের কিতাব ও আহলেবাইত (রা.), (তিরমিজি)।’

সাহাবিদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা, তাদের অনুকরণ- অনুসরণ করা প্রত্যেক মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য। তাই আমরা আমাদের অন্তর থেকে গভীর প্রেম দিয়ে রাসুলে করিম (সা.)-এর সাহাবিদের ভালোবাসব। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সব সাহাবিদের ফায়জ ও বরকত দান করুন। আওলিয়া কেরামদের তাওয়াজ্জুহ নসিব করুন। আমিন!

লেখক : মুফাসসিরে কোরআন

বেতার ও টিভির ইসলামী উপস্থাপক

"