মতামত

গুজবে কান...

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

গাঁজার কলকেতে টান দিয়ে মুহূর্তেই রাজা-উজির বনে যাওয়া যায়। এদিক থেকে কম যায় না গুজব সৃষ্টিকারীরা। ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের মওকা পেতে কদিন ধরে সেই চেষ্টা চলছে সমান তালে। ফেসবুকে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হয়েছিল চার শিক্ষার্থীকে হত্যা ও আরো চার শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ অফিসে শিক্ষার্থীদের কয়েকজনকে আটক রাখা হয়েছে। এ গুজবের পরিণতিতে শিক্ষার্থীরা আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ে চড়াও হয়। সেখানে উপস্থিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষও বেধে যায়। পরে শিক্ষার্থীরা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ অফিসে যায়। প্রতিটি রুম তল্লাশি করে।

প্রতিটি গণ-আন্দোলন নিয়ে গুজব ছড়ানো যেন নিয়মিত বিষয় হয়ে গেছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে যেসব গুজবের নমুনা মিলেছে, তার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে। বিগত বেশ কয়েকদিন ভুয়া ছবি ও তথ্য প্রকাশ করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী। তাদের এই গুজব এবার সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি ব্যক্তিগত মেসেঞ্জার ও গ্রুপ মেসেঞ্জারে একটি গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা মেসেঞ্জারে ভাইরাল হয়ে গেছে। সেখানে জানানো হচ্ছে, ‘রোববার স্কুলশিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং যৌন নির্যাতন চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে ফেসবুকে কোনো পোস্ট দেওয়া না হলেও ‘একজন সাংবাদিক এবং এক মন্ত্রীর খুব কাছের একজন’-এর বরাত দিয়ে মেসেঞ্জারে জানানো হচ্ছে, ‘আগামী রোববার মন্ত্রী-এমপিরা ১০০০-১৫০০ বস্তির ছেলেকে রাস্তায় নামাবে। যাদের কাজ হবে মেয়েদের যৌন নির্যাতন করা, গাড়ি ভাঙা, গাড়িতে আগুন দেওয়া। আর এ ঘটনার প্রতিবাদে পুলিশ সাধারণ ছাত্রদের ওপর আক্রমণ চালাবে। ফলাফল ছাত্রদের ওপর সাধারণ মানুষ খেপবে।’

সেখানে অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়, ‘অনুগ্রহপূর্বক নিউজ টি মেসেজের মাধ্যমে শেয়ার করবেন। কোনো ধরনের পোস্ট দেবেন না।’ অপর এক মেসেঞ্জার পোস্টে রামদা ছুরির ছবি দিয়ে বলা হয়, ‘নিজের রিস্কে আসিস, কালকে ছাত্রলীগ কোপাইব।’ অন্যদিকে মিরপুরে এক সন্ধ্যার ছবি দিয়ে লেখা হয়েছে, ‘রাস্তার ছেলেদের টাকা ও স্কুল-কলেজের জামা দেওয়া হচ্ছে। কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না, তাই না?’

শিক্ষার্থীরা বলেছে, গুজব শুনে তারা বিভ্রান্ত হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছে, একজন অভিনেত্রীসহ বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি এ গুজব রটানোর সঙ্গে জড়িত। ইতোমধ্যে গুজব ছড়ানোর দায়ে ওই অভিনেত্রীসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের গুজব ছড়ানোর পেছনে কারা এবং কী উদ্দেশ্য জড়িত তা উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। পুলিশের ধারণা, কিশোর শিক্ষার্থীদের উসকে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে হত্যা, ধর্ষণ, চোখ উঠিয়ে নেওয়া, আওয়ামী লীগ অফিসে শিক্ষার্থীদের আটক রাখার গুজব ছড়ানো হয়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে অশান্তির পথে ঠেলে দিতে শুরু থেকে যে নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছিল, গুজবের গাঁজার নৌকার পাহাড় ডিঙানোর কসরত তারই অংশ। এ গুজব শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সাংঘর্ষিক অবস্থার বিপদ সৃষ্টি করেছিল। আওয়ামী লীগ নেতারা শিক্ষার্থীদের তাদের অফিস পরিদর্শনের সুযোগ দিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে সক্ষম হয়। এ নিয়ে যে সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, তা এড়িয়ে না গেলে বড় ধরনের বিপদ যে ঘটত, তা সহজে অনুমেয়। ফেসবুক বিশ্বজুড়ে দ্রুত ও সহজ যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ব্যবহারকারীদের জন্য যা আশীর্বাদ বলে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে এই মাধ্যমটির অপব্যবহার সমাজে অশান্তি ও হানাহানিও সৃষ্টি করছে। রামুর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্যাগোডায় দুষ্কৃতকারীদের হামলার পেছনে জড়িত ছিল ফেসবুকের অপপ্রচার।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জনপদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হানাহানির পরিবেশ সৃষ্টিতেও গুজব সৃষ্টির পরিকল্পিত ঘটনা ইন্ধন জুগিয়েছে। দেশবাসীর প্রতি আমাদের আহ্বান, দোহাই গুজবে কান দেবেন না। অপপ্রচারকারীদের ফাঁদে পড়ে আত্মঘাতী কর্মকা-ে জড়িত হবেন না। পাশাপাশি সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, গুজব সৃষ্টিকারী যেই হোক, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিন। অসুস্থ মানসিকতার অধিকারীদের কবল থেকে সমাজকে রক্ষা করুন।

লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই

"