বিশ্লেষণ

সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোয় তরুণ শিক্ষার্থীরা চোখে আঙুল দিয়ে বিবেকের বন্ধ ঘরে চেতনার শিখা প্রজ্বালিত করে যে বিষয়টি শিখিয়ে দিল, তা থেকে আমাদের রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, পুলিশ ও পরিবহন শ্রমিক এবং পরিবহন নেতাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। গত ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিমি ও আবদুল করিম রাজীব নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশের স্কুল-কলেজের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে আসে। রাস্তায় নেমে আসা অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েরা যদি লাইসেন্সবিহীন চালক ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি শনাক্ত করতে পারে, উল্টোপথে চলা গাড়ির গতিরোধ করতে পারে, তাহলে ট্রাফিক পুলিশ ও বিআরটির লোকরা তা পারে না কেন? কেন দেশে সড়ক দুর্ঘটনার নামে মানুষ হত্যার মহোৎসব চলছে? কেন চলমান বাসে নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করে লাশ মধুপুর গড়ের নির্ভৃত জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হলো? কেন নারীকে পরিবহন শ্রমিকদের যৌন হয়রানি ও নগ্ন লালসা থেকে বাঁচার জন্য চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে চাকায় পিষ্ট হয়ে মরতে হলো? কেন আহত ছাত্রের রক্তাক্ত দেহ হাসপাতালে না নিয়ে নদীতে ফেলে দেওয়া হলো? পরিবহন শ্রমিকরা এত নিষ্ঠুর আচরণ করছে কেন যাত্রীদের সঙ্গে? তাদের এ সন্ত্রাসী আচরণ ও ঔদ্ধত্যের উৎস কোথায়? তা জাতিকে খুঁজে বের করতে হবে। দিতে হবে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল ও নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক তথ্যে জানা যায়, গত সাড়ে তিন বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৫ হাজার ১২০ জন। সে হিসেবে প্রতিদিন গড়ে ২০ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। ওই একই সময়ে আহত হয়েছেন ৬২ হাজার ৪৮২ জন। এসব দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটেছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব এবং অতিরিক্ত গতির কারণে। দেশের ১০টি জাতীয় দৈনিক, ৬টি অনলাইন দৈনিক, ৬টি স্থানীয় দৈনিক ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় প্রচারিত সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল। তাতে দেখা যায়, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৮ হাজার ৭৩২টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও নিহতের ঘটনা ঘটে ২০১৫ সালে। যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে সংঘটিত ৩৪ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে মোটরসাইকেল জড়িত। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে দুর্ঘটনা ঘটছে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাসের দুর্ঘটনা ২৫ শতাংশ এবং কার ও মাইক্রোবাসে ১৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্স ইনস্টিটিউট (এআরআই) দুর্ঘটনার কারণসংক্রান্ত পুলিশের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে থাকে। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে এআরআই বলছে, দেশের ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে ঘটে ৩৭ শতাংশ দুর্ঘটনা। অন্যদিকে পরিবেশ পরিস্থিতিসহ অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ১০ শতাংশ। পুলিশের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এআরআই বলছে, সব মহানগরীতে যত পথচারী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়, তার দ্বিগুণের বেশি মারা যায় শুধু ঢাকা মহানগরে। প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণেও পথচারী মারা যাচ্ছে। ত্রুটিগুলো হলো সব স্থানে জেব্রা ক্রসিং না থাকা, ফুটপাত না থাকা কিংবা অবৈধ দখলে চলে যাওয়া, স্বয়ংক্রিয় সংকেত ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, পথচারী পারাপারে অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। গবেষকরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তি। এআরআইয়ের গবেষণা অনুসারে, দেশের সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া লোকজনের ৫৪ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। আর দুর্ঘটনায় নিহত লোকদের ১৮ শতাংশ শিশু, এদের বয়স ১৫ বছরের নিচে। ওই একই প্রতিষ্ঠানের গত এক বছরের গবেষণায় বলা হয়, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনার কারণে বছরে মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ হারাচ্ছে বাংলাদেশ। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ১৯৯৭ সাল থেকে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় তিন বছরমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা করে আসছে। এর মধ্যে সাতটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় ২০২৪ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি সংস্থা সড়ক দুর্ঘটনার যে হিসাব প্রকাশ করছে, তাতে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে দেশের যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। এ জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও সময়মতো বাস্তবায়ন প্রয়োজন। নব্বইয়ের দশকে স্ত্রীর চিকিৎসার সুবাদে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে রেলপথকে কেন্দ্র করে সেখানকার সব শহর-নগর, ব্যবসা কেন্দ্র ও জনপদ গড়ে উঠেছে। সেখানে রেলই মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কলকাতা থেকে ১০০/১৫০ কিলোমিটার দূরবর্তী স্থান থেকে কাজের মাসিরা সকালে ট্রেনে করে এসে বাবুদের বাসায় কাজ সেরে বিকেলে আবার ট্রেনে চড়ে নিজ বাড়িতে ফিরে যায়। অফিস শুরুর আগে দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষ লাইন ধরে ফুটপাত দিয়ে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কলকতা নগরের বিভিন্ন অফিসে যাচ্ছেন। আবার বিকেল ৫টায় অফিস ছুটি হলে দলে দলে মানুষ ট্রেনে উঠে ফিরে যাচ্ছেন নিজ নিজ গন্তব্যে। রানাঘাট, নয়হাটি, ফলিয়া, শান্তিগর, বারাসাত ও বনগাঁও থেকে মানুষ ট্রেনে এসে কলকাতায় অফিস করছেন নিয়মিতভাবে। সেখানে যাত্রীদের জন্য কনসেশন মূল্যে মাসিক টিকিট প্রদানেরও ব্যবস্থা আছে। ভারত সরকার রেলব্যবস্থাকে জনগণের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক করে গড়ে তুলেছে। ওখানের প্রতিটি রেলগাড়িতে থাকে দুটি ইঞ্জিন। প্রতিটি লাইন ডাবল ব্রডগেজ এবং ইঞ্জিন বিদ্যুৎচালিত। এ জন্য রেলগাড়িগুলোকে পথিমধ্যে অযথা বিলম্ব করতে হয় না। ইঞ্জিন ঘুরানোর জন্য সময়ক্ষেপণ করতে হয় না। প্রতিটি বগির দরোজা অনেক প্রশস্ত। স্টেশনের প্ল্যাটফরমগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে গাড়ি প্ল্যাটফরমে দাঁড়ালে গাড়ির পাটাতন প্ল্যাটফরমের পাটাতনের সঙ্গে সমান হয়ে মিশে যায়। যাত্রীরা স্টেশনে ট্রেন থামার সঙ্গে সঙ্গে বড় দরোজা দিয়ে দ্রুত যেমন নেমে যেতে পারেন, তেমনি তাড়াতাড়ি বহুসংখ্যক যাত্রী একসঙ্গে গাড়িতে উঠতে পারেন। বাসের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে ট্রেনের ভাড়াও অনেক কম এবং সামান্য সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন স্থান থেকে শিয়ালদহ স্টেশনে ট্রেন আসা-যাওয়া করে। এসব কারণে পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ লোক ট্রেনেই যাতায়াত করেন। এতে দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুও কম হয় এবং মানুষ স্বচ্ছন্দে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে পারেন। ভারতের মতো আধুনিক রেলব্যবস্থা আমাদের দেশে এখনো গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। অনেকে বলেন, দেশের বড় বড় রাজনীতিবিদ ও আমলারা বাস-ট্রাকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাই তারা কেউই চান না দেশে রেলব্যবস্থার উন্নয়ন হোক। এ ছাড়া অধিকাংশ দাতা দেশ চায় বাংলাদেশে বড় বড় সড়ক হোক, সেতু হোক এবং তাদের দেশ থেকে ওইসব সড়কে চলার জন্য ট্রাক-বাস ও যন্ত্রাংশ আমদানি করা হোক।

আমাদের কথা হলো যাতায়াতের জন্য সড়ক পরিবহনের ওপর এত নির্ভরশীল হওয়া কোনো অবস্থাতেই উচিত নয়। মানুষের চলাচলকে নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে হলে সারা দেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। ঢেলে সাজাতে হবে এর সব কার্যক্রম। সব রেললাইন ডাবল করতে হবে। বিদ্যুৎচালিত রেল চালু করতে হবে। অফিস সময়ের সঙ্গে সংগতি রেখে রেলের সময় সূচি পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। ঢাকার আশপাশের জেলা যেমন : গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও কুমিল্লা থেকে আধঘণ্টা পরপর ঢাকায় নিয়মিত যাত্রীবাহী ট্রেন আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রাজধানী ঢাকাতে মেট্রোরেল চালুর দ্রুতব্যবস্থা নিতে হবে। রাজধানীর চারপাশ দিয়ে সার্কুলার রেলও চালু করা যেতে পারে। এ ছাড়া প্রতিটি যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য পৃথক শীততাপ নিয়ন্ত্রিত প্রয়োজনীয় সংখ্যক বগির ব্যবস্থা রাখতে হবে। যাতে দূরবর্তী স্থান থেকে স্বল্প ভাড়ায় ও নিরাপদে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা রাজধানী ঢাকা এবং বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরে কৃষিপণ্য পরিবহনের সুযোগ পান। এতে নগরবাসী অপেক্ষাকৃত কম দামে টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ার সুযোগ পাবেন এবং উৎপাদনকারী কৃষকরাও পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন। সেই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার হাত থেকে, পরিহন শ্রমিকদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা থেকে দেশবাসী কিছুটা হলেও রেহাই পাবেন।

লেখক : কৃষিবিদ ও বিশ্লেষক

netairoy18@yahoo.com

"