পর্যালোচনা

ক্রান্তিকালে চামড়াশিল্প

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

আবু তাহের

আসছে ঈদুল আজহা। আনন্দ, উৎসব আর ত্যাগের মহিমায় জেগে ওঠার দিন। পবিত্র কোরবানির ঈদে আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি পশু কোরবানি হয়। মসৃণ চামড়ার উর্বরভূমি হচ্ছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ধর্মীয় অনুশাসনের কারণেও দেশে সবচেয়ে ভালো উন্নতজাতের গবাদি পশু কোরবানি করা হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করা হয় এই ঈদে। চামড়ার প্রায় ৬০ শতাংশই আসে ঈদের পশু জবাই থেকে। কিন্তু প্রতিদিনই নাকি আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম পড়ে যাচ্ছে। আর প্রতি বছরের মতোই বিভিন্ন অজুহাতে দেশীয় বাজারে চামড়ার দাম কমাতে তৎপর হচ্ছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র।

গার্মেন্টের পর আমাদের অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় সবচেয়ে বড় খাত চামড়াশিল্প। দেশে প্রস্তুতকৃত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রায় ৯৫ ভাগই বিদেশে রফতানি হয়। কিন্তু চামড়াশিল্প এখন দিন দিন ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ১৩৮ কোটি ডলারের বিপরীতে আয় হয়েছে ১০৮ কোটি ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২১ দশমিক ৩৪ শতাংশ কম। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় ১২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ কম। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আয় হয়েছে ১২৩ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২৮ কোটি ডলার। চামড়া ২৪ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ২৩ দশমিক ৭১ শতাংশ কমে রফতানি হয়েছে ১৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ২৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। চামড়াজাত পণ্য থেকে ৫৪ কোটি ডলারের রফতানি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৩৩ কোটি ৬০ রাখ ডলার, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ৪৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আর জুতা ও অন্যান্য পণ্যের লক্ষ্যমাত্রায় ৬০ কোটি ডলারের বিপরীতে আয় হয়েছে ৫৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৫৩ কোটি ডলার। এ ছাড়া ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১১৩ কোটি ডলারের চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য রফতানি করা হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে আয় হয়েছিল ১১৬ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

২০১৭ সালের বর্ষপণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল চামড়াশিল্পের নাম। নীতিগত সুবিধার পাশাপাশি রফতানি বাড়াতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অথচ সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এর ফল হয়েছে উল্টো। প্রায় সব খাতে রফতানি বাড়লেও ধস নেমেছে চামড়া রফতানিতে। বিশ্বে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার রয়েছে ২২ হাজার কোটি ডলারের। সেই বাজারে বাংলাদেশের অংশ ১ শতাংশও নয়। সেই বাজারটিও আমরা ধরে রাখতে পারব কিনা সন্দিহান? নানা অসুবিধার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আমাদের চামড়াশিল্প। চামড়াশিল্পে এমন ধস নামার কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে। দুই দশক ধরে ক্রমাগত সময় বাড়ানোর পরও হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সরানো হচ্ছিল না। আদালতের নির্দেশে ২০১৭ সালের এপ্রিলে হাজারীবাগের ২২২টি কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর এক বছরে সাভারের চামড়াপল্লীতে ১১৫টি কারখানা স্থানান্তর করা হলেও সব কটি এখনো পুরোদমে উৎপাদনে যেতে পারেনি। ঘনবসতিপূর্ণ হাজারীবাগ এলাকা চামড়াশিল্পের কারণে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। বুড়িগঙ্গাও মারাত্মক দূষিত হয়ে পড়েছিল। দুই দশক ধরে ক্রমাগত সময় বৃদ্ধির পরও হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সরানো যাচ্ছিল না। ৭০টি কারখানা এখন পর্যন্ত উৎপাদনেই যেতে পারেনি। এদিকে চামড়াপল্লীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এখনো সম্পূর্ণরূপে চালু হয়নি। গড়ে ওঠেনি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ভেতরের রাস্তার অবস্থাও খুব খারাপ। জমির দলিল হস্তান্তরিত না হওয়ায় অনেকের ব্যাংকঋণ পেতে অসুবিধা হচ্ছে। অনেক কারখানা বিদ্যুৎ সংযোগ পেলেও অনেক কারখানা এখনো গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণে ট্যানারিশিল্পে উৎপাদন অনেক কমে গেছে। আবার সময়মতো সরবরাহ না করতে পারায় কিছু দেশ বাংলাদেশ থেকে চামড়া নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

২০১৩ সাল থেকে চামড়ার দাম ধারাবাহিকভাবে নিম্নগামী। ২০১৩ সালে সরকার নির্ধারিত দাম অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া কেনেন ৮৫-৯০ টাকায়। আর ঢাকার বাইরে তা কেনা হয় ৭৫-৮০ টাকায়। সারা দেশে প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দাম ছিল ৫০-৫৫ টাকা। ২০১৭ সালে এসে গরুর চামড়ার প্রতি বর্গফুটের নির্ধারিত দাম হয় সর্বনিম্ন ৪০ টাকা। এটি ছিল সারা দেশের গড় দাম। তবে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫০-৫৫ ও ঢাকার বাইরে ৪০-৪৫ টাকা। বিশ্বে চামড়াজাত পণ্যের বাজার ২২ হাজার কোটি ডলারের বেশি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, চীন, ভারত, কোরিয়া ইতালি চামড়া কেনাবেচা সবচেয়ে বেশি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার রয়েছে ভারতে। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম প্রতি মাসেই সামান্য পরিমাণে ওঠানামা করে। তবে মোটা দাগে গত পাঁচ বছরে চামড়ার দাম মোটেও কমেনি, বরং তা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

বিশ্ববাজারে চামড়ার চাহিদা আরো বাড়ছে বলে বলা হয়েছে ব্রিটেনভিত্তিক পোশাক ও বস্ত্র খাতের ওয়েবসাইট ‘জাস্ট স্টাইল ডটকম’-এর একটি প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলোয় গবাদি পশুর উৎপাদন সেভাবে বাড়ছে না। অন্য ফসল চাষের জন্য সেখানে গবাদি পশু উৎপাদনে পর্যাপ্ত জমি পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু পাদুকাশিল্পে চামড়ার চাহিদা বাড়ছে। এ শিল্পে মোট চামড়ার ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রে নতুন প্রতিযোগী হয়ে উঠছে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যের কাভার হিসেবে চামড়াজাত পণ্যের ব্যবহার। মোট চামড়ার ১২ শতাংশ এখন ব্যবহার করছে তারা। অন্যদিকে গ্লাভস, ওয়ালেটস, পারস, পোশাক ইত্যাদি তৈরিতে চামড়ার চাহিদা বাড়ছে। মোট চামড়ার ৩৮ শতাংশ ব্যবহৃত হয় এ খাতে।

কিন্তু এখন দেশি উৎপাদনকারীরা চাইলেও ওইসব পণ্যে বাংলাদেশি চামড়া ব্যবহার করতে পারছে না। ইউরোপের ক্রেতারা বাংলাদেশি চামড়ার ব্যবহার করার ব্যাপারে একেবারেই খড়গহস্ত। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশের চামড়াশিল্প কারখানাগুলো উৎপাদনকাজ চালিয়ে যাচ্ছে অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। বিকল্প হিসেবে তারা চীন এবং ভারত থেকে চামড়া সংগ্রহের পরামর্শ দিচ্ছে বাংলাদেশি পোশাক উৎপাদনকারীদের। বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে যে চামড়া রফতানি হয়, তার ৪০ শতাংশই যায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোয়। ইইউর ২৫টি দেশে এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ) কর্মসূচির আওতায় শুল্ক ও কোটামুক্ত উপায়ে চামড়া রফতানির সুযোগ পান এ দেশের ব্যবসায়ীরা।

যদিও চামড়ার দাম নির্ধারণ, সীমান্তে পাচার, বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রতি বছর বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাংলাদেশ ট্যানারস অ্যাসোসিয়েশন এই দাম নির্ধারণের পক্ষপাতী না। তাদের কাছে এখনো গত বছরের চামড়া মজুদ আছে। কিন্তু বিভিন্ন পত্রিকা থেকে জানা যায়, তিন বছর ধরে তারা একই কথা বলছেন। কিন্তু কেন? আর বিগত বছরগুলোয় কেন এভাবে বৈঠক হয়নি এবং দাম নির্ধারণ করা হয়নি? এটা একটা খোলামেলা আলোচনা। আর আলোচনার মাধ্যমেই এটার সমাধান করতে হবে। সারা বছর দাম ঠিক থাকল আর ভরা মৌসুমে এসে দাম পড়ে গেল। যেখানে বিশ্ববাজারে দামের কোনো হেরফের হয়নি। মূলত একটা সিন্ডিকেট এটা নিয়ন্ত্রণ করে।

মজার বিষয় হলো বিশ্ববাজারে কম দামের কথা বললেও সেই চামড়া আবার হাতছাড়া করতে নারাজ ট্যানারি মালিকরা। প্রতি বছর তারা চামড়া কেনার জন্য বাড়তি ঋণ দাবিও করেন। চামড়া ভারতে পাচার ঠেকাতে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপের দাবিও তোলেন তারা। আর চামড়াশিল্পের স্বার্থে কাঁচা চামড়া সংগ্রহে ঋণ দিচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। প্রতি বছর ঈদুল আজহার আগে এ ঋণ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নির্দেশনা মোতাবেক কম সুদেই এসব ঋণ বিতরণ করা হয়। আগে চামড়ার নামে ঋণ নিয়ে অনেকেই উধাও হয়ে গেছে। তাই কঠোর তদারকির মাধ্যমে এ ঋণ দেওয়া হচ্ছে। চামড়া কিনতে মাত্র ৭১টি প্রতিষ্ঠান ঋণ পেয়েছে; যাদের কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা।

বলা বাহুল্য, এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে চামড়াশিল্পকে রক্ষা করতে সরকার যদি সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে চামড়াশিল্পের প্রবৃদ্ধি রফতানি আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দুস্থ জনসাধারণ বিশেষত এতিম ও গরিবদের প্রকৃত কল্যাণ হবে।

লেখক : কলামিস্ট ও সমাজবিশ্লেষক

abutaher16@gmail.com

"