সমাচার

মেধা ও মননে বাংলাদেশ

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

এস এম মুকুল

পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা গড়ে তুলতেই বেশি আনন্দ পান। দেশ ও সমাজকে কিছু দিতে পেরে, মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পেরে তারা হন আত্মতৃপ্ত। মহান মানবিক চেতনায় উদ্ভাসিত এসব মানুষ দায়বদ্ধতা থেকে দায়শোধের কাজে নিজেদের আত্মনিয়োগ করেন। গড়ে তোলার মহান ব্রত নিয়ে উদ্দেশ্য সাধনের নিরলস কর্মযজ্ঞের এমন নেপথ্য নায়করা মানুষের কল্যাণে এবং সমাজ সংস্কারে কাজ করে যাচ্ছেন ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায়। কাজ করছেন বিভিন্ন উপায়েÑনীরবে নিভৃতে। সমাজ বিনির্মাণে আত্মনিবেদিত এমন স্বপ্ন মানুষের গল্প শোনাব আজ।

১. নাম আমীর আহাম্মদ চৌধুরী রতন। ময়মনসিংহে তাকে সবাই রতনদা নামেই চেনেন। ফেনীর আদিনিবাসী রতন চৌধুরীর পরিবার ময়মনসিংহ শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন বাবার চাকরির সুবাদে। রতনের স্বপ্ন ছিল ব্যারিস্টার হওয়ার। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন সংগঠক, খেলোয়াড় এবং সৃজনমূলক চেতনায় উদ্ভাসিত মানুষ। তাই ব্যারিস্টার না হয়ে তিনি হলেন শিক্ষক। মানুষ গড়ার কারিগর। কারিগর কি আর বসে থাকেন? আত্মপ্রত্যয়ী এই মানুষটি নেমে পড়লেন এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে, যেখানে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে উঠবে আনন্দমুখর পরিবেশে। তিনি গড়ে তুললেন ময়মনসিংহের জনপ্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মুকুল নিকেতন। মুকুল নিকেতন আর রতনদা যেন এক সুতোয় গাঁথা। ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপর্ব শেষ করে সফল এই সংগঠক ১৯৫৯ সালে শহরের মহারাজা রোডে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ময়মনসিংহ মুকুল ফৌজ’। শিশু-কিশোরের মেধা বিকাশ ও চরিত্র গঠনের এই প্রতিষ্ঠানটিই ১৯৭০ সালে মুকুল নিকেতন ¯ু‹ল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। জরাজীর্ণ একটি ঘরে ৪২ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে মুকুল নিকেতন। বর্তমানে এর শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা ১৭৮ জন। ছাত্রছাত্রী ৫ হাজারেরও বেশি। তিন দশকের অধিক সময়ে তিলে তিলে গড়ে তোলা মুকুল নিকেতন এখন জরাজীর্ণ টিনশেডের স্থলে স্থাপিত হয়েছে বহুতল ভবন। সময় অতিবাহিত হয়েছে নিজস্ব গতিতে। তার স্নেহ-শাসনে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মেধাবী নাগরিক। দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তারা অধিষ্ঠিত হয়েছেন স্ব-মহিমায়। স্বপ্নবান রতন চৌধুরী তার বর্ণাঢ্য সাফল্যময় জীবনে অর্জন করেছেন অনেক সম্মানজনক পুরস্কার। আলোকিত মানুষ তৈরির প্রবাহমান যে ধারা তিনি প্রতিষ্ঠিত করলেন, তার সুফল পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে, সমাজে এবং রাষ্ট্রে। এই স্রোত অনন্তকালের। অসীম, অশেষ।

২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র শহীদুল হাসান। ছাত্রাবস্থায় ২০০২ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটের জয়নুল গ্যালারিতে মাটির তৈরি গহনার প্রদর্শনী করেন। ব্যতিক্রমী এই অপ্রচলিত পণ্য সর্বসাধারণকে আকৃষ্ট করে। হইচই পড়ে যায় নারীদের মধ্যে। সাজসজ্জায় দেশের মাটির সুধা। আধুনিক, নান্দনিক, সুদৃশ্যময় তো বটেই। শহীদুলের নিজ হাতে বানানো মাটির কানের দুল, গলার লকেট আর হাতের চুড়ি দেখে ঢাকার আধুনিক মেয়েরাও রীতিমতো মুগ্ধ। বিদেশি পণ্যে বেহুদা কারণে আকৃষ্ট হওয়া ললনারাও দেশের মাটির তৈরি গহনা অঙ্গে সাজিয়ে গর্বিত ও পুলকিত। মানুষের আগ্রহ দেখে উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন শহীদুল। ২০০৩ সালে ‘নারীর জন্য মাটির গহনা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় অংশ নিতে কলকাতায় যান তিনি। কর্মশালার অভিজ্ঞতা তাকে আরো কয়েকধাপ এগিয়ে নেয়। শুরু হয় নান্দনিকতার জয়যাত্রা। বাংলার টেরাকোটা নামে মাটির গহনা তৈরির কারখানা চালু করেন শহীদুলের নিজ বাড়িতে। ধামরাইয়ের লাল মাটি ও ময়মনসিংহের সাদা মাটির সঙ্গে ঢাকার মিটফোর্ড এলাকা থেকে চায়না ক্লে মাটি মিশিয়ে তৈরি হয় বাংলার টেরাকোটা। নিত্যনতুন ডিজাইনে তৈরি হচ্ছে মনোমুগ্ধকর গহনা। বাংলার টেরাকোটায় তৈরি হচ্ছেÑ ইলোরা মালা, ক্ল্যাসিক মালা, কানের দুল, রিং, হাতের ঝুমকা চুড়ি, হাতের বালা, ব্রেসলেট ব্যান্ড, বাহারি পটারি, ফটোফ্রেম, ঘড়ি, কলমদানি, ফুলদানি, ছোট টেরাকোটা, ঝাড়বাতি, টেবিলবাতি, ছাইদানি, কফিপট ইত্যাদি ইত্যাদি। শহীদুল টাইলস পেইন্টিংয়েও সিদ্ধহস্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বীরকন্যা প্রীতিলতা হলের প্রীতিলতা, মওলানা ভাসানী হলের ভাসানী এবং মেহেরপুর জেলা কালেক্টরের সামনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক পেইন্টিংটিও শহীদুলের করা। ঢাকার নবরূপা, সাদাকালো, নিপুণ, অঞ্জনস এবং রঙের মতো অভিজাত বিপণিবিতানে পাওয়া যায় বাংলার টেরাকোটার পণ্য। দেশের বাইরে দুবাই, নিউইয়র্ক এবং ইংল্যান্ডের বাংলা টাউনে যাচ্ছে শহীদুলের অনিন্দ্য সৌন্দর্যম-িত মাটির গহনা। বাংলার টেরাকোটা নামের সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্যের অলঙ্করণ একাকার মিশে মাটির গহনায় এনেছে দেশজ আমেজ। বিশ্ববাজারে নারীর অঙ্গ ও গৃহসজ্জায় বাংলার মাটির পরম মমতা মিশে গেছে সাদরে।

৩. চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার অজিত কুমার বড়–য়া। ১৯৮৫ সালে তিনি পড়াশোনার জন্য জাপান যান। সেখানে সাইতোমা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাপানের ইতিহাস বিষয়ে ডিপ্লোমা করেন। তারপর চাকরি নেন একটি প্রকাশনা সংস্থায়। জাপানে বসে তিনি বাংলাদেশের সাপ্তাহিক বিচিত্রার মাধ্যমে দেশের সুবিধাবঞ্চিত মেধাবী শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার খবর জেনে ব্যথিত হতেন। আর্থিক অনটনের কারণে মেধাবীদের পিছিয়ে পড়া কি করে রোধ করা যায়, তাই ছিল তার ভাবনায়। বিষয়টি নিয়ে অজিত কুমার জাপানের নিপ্পন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কথা বললে তারাও আগ্রহ দেখায়। প্রবাসে থেকে দেশের জন্য কিছু করার মানসিক তাড়নায় নিজেকে নিয়োজিত করেন অজিত কুমার। অবশেষে নিপ্পনের প্রতিশ্রুতি, নিজস্ব সঞ্চয় আর প্রবাসীদের সহযোগিতা নিয়ে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ স্কলারশিপ কাউন্সিলের যাত্রা শুরু হয়। সে বছরই চট্টগ্রাম অঞ্চলের বেশ কিছু মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে বৃত্তি দেওয়া হয় তহবিল থেকে। ১৯৯৫ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রেশন নেয় সংগঠনটি। শুরু হয় মেধালালন প্রকল্পের জয়যাত্রা। সংগঠনের ব্যানারে জাপান থেকে প্রতি বছর মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য বৃত্তি আসছে দেশে। অজিত কুমারের মতো উদ্যোগী হয়ে আরো কিছু মানুষ একত্র হলে প্রবাসী সহায়তায় দেশের মেধালালন প্রকল্পকে আরো জোরদার করা সম্ভব হবে।

৪. আরো একটি প্রবাসী সহায়তার খবর শুনুন। কক্সবাজারে বেড়ে ওঠা মানুষ ডা. ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদ মিনার। প্রবাসে থেকেও দেশপ্রেমের বিরল-ব্যতিক্রম নজির দেখালেন তিনি। আমেরিকার ফ্লোরিডায় চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ডা. মিনার জন্মস্থান কক্সবাজারের অজপাড়াগাঁয়ে স্থাপন করলেন ৪০ শয্যার হাসপাতাল। তার গড়ে তোলা হাসপাতালে এখন প্রতিদিন প্রচুর অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ মানুষ চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। ডা. মিনার ১৯৮৭ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান সুদূর আমেরিকায়। নিউইয়র্কের ব্রুকলিন হাসপাতাল এবং নিউইয়র্ক কর্নেল ইউনিভার্সিটি মেডিকেল থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। প্রবাসে পেশাগত অবস্থান থাকলেও দেশের জন্য কিছু করার মানসিক তাগিদ তাকে মানবসেবামূলক উদ্যোগের প্রেরণা জোগায়। প্রবাসেই তিনি গড়ে তোলেন ‘হোপ ফাউন্ডেশন ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন বাংলাদেশ’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। প্রবাসীদের কাছে দেশের মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে ২০০০ সালে প্রাথমিকভাবে একটি ক্লিনিক দিয়ে শুরু হয় মা ও শিশুর চিকিৎসাসেবা। নামমাত্র ভর্তি ফি নিয়ে বাকিসব সেবা কার্যক্রমই চলে বিনা পয়সায়। হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে মানুষদের অনেক কষ্ট করে যেতে হতো কক্সবাজার জেলা শহরে। এখন সাধারণ গরিব মানুষ সহসাই পাচ্ছেন চিকিৎসাসেবা। উপকৃত হচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। থেমে নেই ডা. মিনারের প্রচেষ্টা। এই হাসপাতালটিকে তিনি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখছেন। সদিচ্ছা থাকলে, দেশপ্রেম থাকলে কোনো কিছুই অসাধ্য নয়, তাই প্রমাণ করলেন ডা. মিনার। এমনি বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত আছেন বিভিন্ন দেশে। সবাই যদি এমন উদার ও মানবিক দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতেন তবে দেশে উন্নয়নের কি বিপ্লবই না ঘটত। আমাদের দেশের ডাক্তাররা যদি নিজ নিজ এলাকায় মাসে অন্তত একবার গিয়ে বিনা পয়সায় দেশের মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিতেন, তাহলে গরিব-দুঃখী মানুষের কত-না উপকার হতো। প্রবাসে থেকে যদি তারা এত বড় উদ্যোগ নিতে পারেন, আমরা দেশে থেকে কেন এতটুকু করতে পারি না! দেশপ্রেম সবার মধ্যে জাগ্রত হোক। জয় হোক মানবতার।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

writetomukul36@gmail.com

 

"