বিশ্লেষণ

আর নয় শিশু অন্ধত্ব

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

ইয়াসমীন রীমা

আজও রুম থেকে বের হয়নি তুলিকা। মা-বাবা ও দাদিমা তাকে ডেকেছে অনেক করে। ডাকে সাড়া দিলেও রুম থেকে বের হয়নি একটুও। অথচ প্রতিদিন একবার হলেও সে খাবার টেবিলে সবার সঙ্গে খেতে আসত। দুদিন ধরে কেন রুম থেকে বের হচ্ছে না সে। ব্যাপারটা কারো বোধগম্য নয়। সকালের নাশতা এবং দুপুর ও রাতের খাবার রুমে বসে খেয়েছে। গত পরশু তার দশম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে অনেকটা ঘটা করেই। জন্মদিনে অনেকেই এসেছিল তাকে শুভাশিষ জানাতে। তার বাবা সড়ক ও জলপথের প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান একমাত্র মেয়েকে খুবই স্নেহ করেন। মা সাকেরা বেগমও কম যান না। তাই জন্মকাল থেকেই তুলিকা যথেষ্ট আদরে-স্নেহে বড় হচ্ছে। কোনো অভাবই তার অপূর্ণ থাকেনি বা থাকছে না। কিন্তু সে অভাবটি তার মা-বাবা পূরণ করতে পারছে না, কিংবা কোনোদিনই পারবে না। তা হচ্ছে চোখের আলো। অর্থাৎ তুলিকা অন্ধ। এখন দেখতে পায় না পৃথিবীর কিছুই। এমনকি তার বাবা-মাকেও না। তবে অনুভব করতে পারে সবকিছুই। তুলিকা জন্ম থেকে অন্ধ নয়। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়কাল থেকে তার চোখে দৃষ্টিহীনতার সমস্যা দেখা দেয়। তার বাবা দেশের নামিদামি চোখের ডাক্তার দ্বারা চিকিৎসা করিয়ে চোখ ভালো করার চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্রে ভাষায় কর্ণিয়াজনিত রোগে ভুগছিল তুলিকা। যার পরিণতি ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যাওয়া। বাস্তবে হয়েছেও তাই। তুলিকার প্রতি অবহেলা ছিল না কারো। তবে মা সাকেরা বেগমই প্রথম প্রথম তার চোখের সমস্যার কথাগুলো শুনতেন। তখন তিনি ততটা বুঝে উঠতে পারেননি। এত অল্প বয়সে কিসের আবার অসুখ। কিন্তু ডাক্তারের কাছে যখন যাওয়া হলো, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। মেয়ের এই অন্ধত্বের কষ্ট তার বুকের ভেতর প্রতিদিন আঘাত করে যাচ্ছে কিন্তু তিনি কাউকে বুঝতে দিতে নারাজ। তুলিকার জন্মদিনে তার বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মেয়ের কথা ভেবেই। তুলিকা গত তিন দিন রুম থেকে বের না হওয়ার কারণ সাকেরা বেগম জানেন। সেটা তুলিকাও জানে, জন্মদিনের অনুষ্ঠানের ফাঁকে কে যেন বলছিল, ‘অন্ধ মেয়ের আবার জন্মদিন’ আর এ কথা সে শুনে ফেলেছে। তাই তার মন বিষণœতায় ভরে আছে। রাগে-অভিমানে দুঃখে আজ তিন দিন রুম থেকে বের হচ্ছে না সে।

কেবল সামান্য অজ্ঞতার কারণে শিক্ষিত ও দায়িত্ববান বাবা-মায়ের সন্তান কেবল তুলিকা নয়। দেশে প্রতি মিনিটে একজন শিশু দৃষ্টিহীন হয়ে পড়ছে। শুধু তাই নয়, প্রতি তিনজন দৃষ্টিহীন শিশুর মধ্যে একজন ছানিজনিত অন্ধত্বের শিকার হচ্ছে। শিশু অন্ধত্ব বাংলাদেশে শিশু স্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক সমস্যা। ছানি ও অন্যান্য কারণে দেশে দৃষ্টিহীন শিশুর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে জরুরি ভিত্তিতে শিশু চক্ষু চিকিৎসকদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিশুদের চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং সামাজিক অসচেতনার কারণে প্রতিদিন দেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বরণ করছে হাজার হাজার শিশু। শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলের মানুষের অজ্ঞতা, শিশু চক্ষু বিশেষজ্ঞদের স্বল্পতা এবং পুষ্টিহীনতা ও ছানিজনিত জটিলতায় দৃষ্টিহীন হচ্ছে শিশুরা।

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার লোক অন্ধবরণ করছে। যার মধ্যে ৪৮ হাজার শিশু-কিশোর। আর অন্ধকার জীবনে এসব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোগুলো থেকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতি হাজারে ০.৭৫ শতাংশ শিশু অন্ধত্বের শিকার। প্রায় ১৩ লাখ শিশু দৃষ্টি ত্রুটিজনিত সমস্যায় ভুগছে এবং ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬০০ শিশু ক্ষীণদৃষ্টি সমস্যায় আক্রান্ত। ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রেই অন্ধত্বের মূল কারণ চোখে ছানি পড়া। শিশুদের ক্ষেত্রে ছানি পড়ার কারণে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে ১২ হাজার। দৃষ্টিহীন মানুষের ৮০ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে। যাদের মধ্যে ৯০ ভাগ দরিদ্র, যাদের চিকিৎসা নেওয়ার কোনো সাধ্য নেই। অন্যদিকে ৯০ ভাগ চক্ষু চিকিৎসক ও তাদের সহযোগীদের বসবাস শহরাঞ্চলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো ব্যক্তি যদি তিন মিটার দূরত্বে অবস্থিত অন্য ব্যক্তির আঙুল গণনা করতে অসমর্থ হয়, তবে সে অন্ধত্বে ভুগছে এবং আলোর অনুভূতি একেবারেই না থাকাকে ধরা হয় পুরোপুরি অন্ধত্ব। সারা বিশ্বে ২৮ মিলিয়ন লোক অন্ধত্বে ভুগছে। ইউরোপ এবং আমেরিকায় প্রতি লাখ অধিবাসীর মধ্যে ২০০ জন অন্ধত্বে ভুগছে, যা এশিয়া ও অফ্রিকায় ৮০০ জন থেকে এক হাজার জন বলে পরিলক্ষিত হয়। ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং থাইল্যান্ডে অন্ধত্বের প্রাদুর্ভাব ০.৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে অন্ধত্বজনিত রোগে ভোগে। যদিও জৈবিক কারণগুলো অন্ধত্ব ঘটানোর ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখে, তবু সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোর গুরুত্ব কম নয়। মোটামুটি অন্ধত্বের মূল কারণগুলো হচ্ছে, ছানি, ত্রুটিযুক্ত দৃষ্টিশক্তি, ক্ষীণদৃষ্টি, কর্ণিয়ার অসুখ, রোটিনার অসুখ, গ্লুকোমা, আঘাত, ইনফেকশন ও ডায়াবেটিস দৃষ্টিহীনতা। সদ্য প্রসূত শিশুর ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ে জন্মগত ত্রুটির কারণে, যেমনÑকেটারেক্ট, চোখের অপুষ্টিজনিত ক্ষয়, বুফথালমস। স্কুলে পূর্ব বয়সে জন্মগত ত্রুটি, কাঠামোগত ত্রুটি এবং আঘাতজনিত কারণ ছাড়াও বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধিতে।

এ ব্যাপারে বিশিষ্ট চক্ষুবিশেষজ্ঞ ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আনিসুর রহমান বলেছেন, ‘সামাজিক অসচেতনতার কারণে প্রতিদিন দেশে অন্ধত্ববরণ করছে হাজার হাজার শিশু। পুষ্টিহীনতা ও ছানিজনিত জটিলতায় দৃষ্টিহীন হচ্ছে শিশুরা। এ ছাড়া পথের ধারে কিংবা বস্তিগুলোয় অনেক অন্ধ শিশু রয়েছে। যাদের বেশির ভাগই সাধারণত ভিটামিন-এ-এর অভাবে অন্ধত্বের শিকার হয়। জন্মগত ছানি, কর্ণিয়া নষ্ট হয়ে যাওয়া, হাম ও মারাত্মক হাম, এমবাইওপিয়া, অলস চোখ এবং এসব কারণে শিশু অন্ধত্ববরণ করে। ধীরে ধীরে চোখে আবছা, কুয়াশা, ঝাপসা দেখলে কারো সহায়তা ছাড়া চলাফেরা না করতে পারা চোখের কালো মণি ধূসর, সাদা হয়ে যাওয়া ছানির লক্ষণ। আর এ ছানির একমাত্র চিকিৎসা অপারেশন। সময়মতো অপারেশন না করালে চোখ সম্পূর্ণরূপে অন্ধ হয়ে যেতে পারে। ওষুধ ব্যবহার করে তার কোনো ফল পাওয়া যায় না। শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ছানি অপারেশন করা হয়। অপরিণত নবজাতকের রেটিনার রক্তনালির অস্বাভাবিকতা তথা রোটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচুরিটির (আরওপি) কারণে দেশে ১০ শতাংশ শিশু অন্ধত্বের শিকার হয়।’

মানবদেহে চোখ একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কিন্তু এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ যথেষ্ট উদাসীন। কিছু চক্ষু রোগ আছে যেগুলো শিশুরা জন্ম থেকে বহন করে আর কিছু জন্মের পর সৃষ্টি হয়। যার মধ্যে অনেক রোগ রয়েছে, যা কিনা অভিভাবকরা একটু সতর্ক হলেই বা সময়মতো চিকিৎসা করালে চিরতরে অন্ধত্ব দূর হয়ে যায়। তাই জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই নজর রাখতে হবে শিশুর চোখে কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা। সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডাক্তার আলী আসগর মোড়লের মতে, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে কর্ণিয়াজনিত অন্ধের সংখ্যা ১০ লাখ। কেবল সচেতনার অভাবে এই অন্ধত্ব নির্মূল করা যাচ্ছে না। বিশ্বের উন্নত অনেক দেশে সচেতন মানুষ মরণোত্তর চক্ষুদানে এগিয়ে আসায় তাদের কর্ণিয়াজনিত অন্ধত্ব অনেকটা ঘুচে গেছে। দেশে সচেতনার অভাবে পর্যাপ্ত কর্ণিয়া না পাওয়ায় এই অন্ধত্ব বেড়েই চলছে। তবে ভিশন-২০২০ শীর্ষক বৈশ্বিক উদ্যোগে শামিল হয়েছে বাংলাদেশ। ‘দৃষ্টি সবার অধিকার’ সেøাগানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বাস্তবায়িত হচ্ছে ন্যাশনাল আই কেয়ার প্রকল্প। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ফ্রেড হলোÑফাউন্ডেশন এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা করছে। প্রকল্পের আওতায় প্রতি বছর ছানি অপারেশন এবং চিকিৎসাসেবা দিয়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার অন্ধরোগী চোখের আলো ফিরে পাচ্ছে। যার মধ্যে শিশুও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’

শিশু-কিশোরদের চোখের পীড়ার আরেকটি দিক হচ্ছে, বিশেষ করে শহরের অধিকাংশ শিশুদের ক্ষেত্রে টেলিভিশন বা কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন তাদের কাছে আকর্ষণীয় সামগ্রী। এসবের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণহীন পর্যায়ে চলে এসেছে। মা-বাবা বিশেষ করে চাকরীজীবীদের ক্ষেত্রে তা যে অনিবার্য বাস্তবতা। এসব যন্ত্র দর্শন বা ব্যবহারের কারণে শিশুরা নানা ধরনের দৃষ্টিজাত উপসর্গের শিকার হচ্ছে। টেলিভিশনে প্রচারিত কার্টুন দেখার ক্ষেত্রে শিশুদের অতিরিক্ত ঝোঁক থাকায় এসব উপসর্গ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবক চক্ষুবিশেজ্ঞদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলামের মতে, ‘চোখের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা থেকে মাথাব্যথা হয়ে থাকে। স্কুলগামী শিশুদের পড়াশোনার শুরুতে পাওয়ারের সমস্যা চোখের ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি করে। যেসব শিশু টেলিভিশন বা কম্পিউটার দেখে, চোখের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বিধায় সেই চাপ মস্তিষ্কে প্রতিফলিত হয়। মাথাব্যথা, অবসাদগ্রস্ততা ইত্যাদি উপসর্গে আক্রান্ত হয় শিশু।’

চোখ জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি অতিপ্রয়োজনীয় অঙ্গ। এই অমূল্যবান অঙ্গটি জীবনের প্রারম্ভে বিনষ্ট হয়ে গেলে শিশুর বেঁচে থাকার পুরো জীবনটাই বৃথা হয়ে যাবে। তাই প্রতিটি বাবা-মা অথবা অভিভাবকদের কর্তব্য, সচেতন হয়ে তাদের প্রিয় শিশুটিকে অন্ধত্বের হাত থেকে রক্ষা করা।

লেখক : বিশ্লেষক, গবেষক ও কলামিস্ট

 

"