বিশ্লেষণ

নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

সাধন সরকার

রাজধানীসহ সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। রাজধানীতে চলন্ত বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। প্রতিদিন সম্ভাবনাময় ও স্বপ্নের অনেক জীবন সড়ক দুর্ঘটনার বলি হচ্ছে। তথ্য মতে, সড়কে দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটছে। যানবাহন চলাচলে ন্যূনতম শৃঙ্খলা থাকলে কোনো সভ্য দেশের পরিবহন খাতে এই বিশৃঙ্খল অবস্থা চলতে পারে না। ঢাকা মহানগরীতে চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বহু দিন ধরে চলে আসছে। রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে চালকদের বেপরোয়া যানবাহন চালানো। এ ছাড়া রয়েছে চালকদের নিয়ম-কানুন মানাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনীহা, গাফিলতি ও অন্যায় করে চালকদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি। রাজধানীর গণপরিবহনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালকের সংখ্যা অগণিত। এদের বিরুদ্ধে কেন নিয়মিত অভিযান চালানো হয় না? হাজার হাজার ফিটনেস সনদবিহীন যান ও লাখ লাখ লাইসেন্সবিহীন চালকের জন্য সড়ক নিরাপদ হচ্ছে না। প্রশ্ন জাগে আর কত প্রাণ সড়ক দুর্ঘটনার বলি হলে সড়কে প্রাণহানির অবসান হবে? স্টিয়ারিং হাতে চালকদের বেপরোয়া মনোভাব কবে বন্ধ হবে? সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ হোক তা কারোরই কাম্য নয়। কিন্তু সেই অবরোধের পেছনে সঠিক কারণটি দূর করতে হবে। কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে সড়কব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সড়ক নিরাপদ রাখতে হয়। দুঃখের বিষয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এ খাতটিকে যতটা জনগুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে দেখা হয়, আমাদের দেশে সেভাবে দেখা হয় না। বিশেষ করে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও চালকের আইন মানার বিষয়টি এখনো অবহেলায় রয়ে গেছে। ‘বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি’ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট’র (এআরআই) তথ্য মতে, গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ২৫ হাজার ১২০ জন। এ সময়ে আহত হয়েছে প্রায় ৬৩ হাজার জন। শুধু ২০১৭ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৩৯৭ জন। অতিসম্প্রতি ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৮৬০টি দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৬২ জন নিহত হয়েছে। বুয়েটের এক জরিপ বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশেরই কারণ চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতি। সড়ক দুর্ঘটনায় বছরের পর বছর ধরে মৃত্যুর এ মিছিল চলতেই আছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কারণে অনেক পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির পাশাপাশি সার্বিক অর্থনীতিরও ক্ষতি হচ্ছে। এক তথ্য মতে, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতির পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ শতাংশের সমান।

জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুসারে, ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, কোনো খাতে অনিয়ম ও অন্যায় যদি নিয়ম হয়ে যায়, সে খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কি সম্ভব? প্রশ্ন হলো, সড়ক পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য কেন হবে? ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে শুরু করে রুট পারমিট পর্যন্ত সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। সরকার অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। পরিবহন খাতেও সঠিক তদারকি, মনোযোগ ও আন্তরিকতা দেখালে এ খাতটি সঠিক পথে ফিরে আসবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন। পরিবহন কর্তাব্যক্তিসহ সংশ্লিষ্ট চালকরা এই নির্দেশনা মেনে চললে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে। দুর্ঘটনা বন্ধে প্রতিটি স্কুল-কলেজের সামনে গতিরোধক থাকা দরকার। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে স্কুল-কলেজভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু করতে হবে। পুরো সড়ক ব্যবস্থাপনায় সৎ, যোগ্য ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বসাতে হবে। রাজধানীসহ সারা দেশে আরো বেশি সরকারি আধুনিক গণপরিবহন চালু করা হলে বেসরকারি খাতের দৌরাত্ম্য কমে আসবে। রাজধানী ঢাকায় বাস চালাতে চালকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা ও ধৈর্য কাম্য। কেননা রাজধানীর বেশির ভাগ রাস্তা বেশ ছোট এবং যানজটে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকতে হয়। এখানে হঠাৎ বেপরোয়া মনোভাব দেখানো মানে জীবন নিয়ে খেলা করার শামিল। তাই সড়কে হত্যা বন্ধে দক্ষ চালকের বিকল্প নেই। সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি যেহেতু জাতীয়, সেহেতু ট্রাফিক নিয়মকানুন এবং সরকারের নির্দেশনা মানতে পরিবহন মালিক ও চালকদের বাধ্য করতে হবে। সরকারিভাবেও চালকদের দু-এক দিনের ছোট প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। সরকারের পক্ষে সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট পরিবহন কোম্পানির মাধ্যমেও এটা করা যেতে পারে। সড়কে গণহত্যা বন্ধে বিভিন্ন দেশের মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ ও একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটির সংস্কার এখন সময়ের দাবি। সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টেনে ধরতে কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে-১. চালকদের বেপরোয়া মনোভাব ও গতি রুখতে তাদের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। ২. চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের পরই কেবল ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে হবে। ৩. সড়কে পুলিশ ও মোবাইল কোর্টকে আরো সক্রিয় করতে হবে। ৪. বিভিন্ন কোম্পানি না রেখে একটি রুট একটি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। ৫. এ খাতে সব ধরনের অবৈধ বাণিজ্য বন্ধসহ জনসাধারণকেও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। মনে রাখা দরকার, একটি সড়ক দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। এ খাতটিকে মানবিক উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষসহ সরকারকে কার্যকর সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadonsarker2005@gmail.com

"