মতামত

পাকিস্তান রাজনীতির গতিপথ

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

জি. কে. সাদিক

পাকিস্তানের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে পিটিআইয়ের (পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ) জয়কে পাকিস্তান তারুণ্যের জয় হিসেবে অভিহিত করা যায়। যারা ইমরান খানের (পিটিআইয়ের প্রধান) জয়ের মূলে সেনা সমর্থনের কথা বলছেন, তাদের কথাকে অর্ধসত্য বলা যায়। ২০১২ সালে পাকিস্তানে জনমত জরিপে ইমরান সেরা ব্যক্তি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পাকিস্তানে তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা বেশি। এবার নির্বাচনেও জয়ের পেছনে তাদের ভূমিকাই মুখ্য। পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৬৪ শতাংশ তরুণ। আর এই তরুণ ভোটারদের একচেটিয়া সমর্থন পেয়েছে পিটিআই। এখানে ইমরানকে জয়ী করতে পাকিস্তান সেনারা ছায়া হিসেবে কাজ করেছে বললে ভুল বলা হবে না। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব বিস্তার আগের চেয়ে অনেকাংশই কমেছে। ৭১ বছর স্বাধীনতার ইতিহাসে ২০১৩ সালের নির্বাচিত সরকারই প্রথম পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পেরেছে। যেটাকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটা দৃষ্টান্ত। এখানে একটা বিষয় সামনে আসে, পাকিস্তানে সেনাবাহিনী হয়তো সরাসরি ক্ষমতা কব্জা করবে না, কিন্তু তাদের ক্রীড়নক সরকার ছাড়া অন্য কাউকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে দেবে না।

২৭২টি আসনের মধ্যে পিটিআই ১১৭টি আসন পেয়েছে। পিএমএল-এন (পাকিস্তান মুসলিম লীগ নওয়াজ) পেয়েছে ৬৪টি আর পিপিপি (পাকিস্তান পিপলস পার্টি) পেয়েছে ৪৩টি আসন। এ ছাড়া আর কিছু ছোট দল অল্প কিছু আসন পেয়েছে। যদিও নির্বাচনে ইমরান খানকে জেতাতে সেনাবাহিনী প্রভাব খাটিয়েছে তার পরও এটা স্পষ্ট, দ্বিগুণসংখ্যক আসন লাভের জন্য শুধু সেনা সমর্থনই যথেষ্ট নয়। বরং এখানে পাকিস্তানের জনগণের রায়ও কাজ করেছে। ইমরান খানের জয় নিয়ে কথা বলতে গেলে গোড়ায় ফিরে যেতে হবে। এবারের নির্বাচনে ইমরানের জয়ের পেছনের বড় অবদান রেখেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান। ২০১০ সাল থেকেই পিএমএল-এন ও পিপিপির দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন ইমরান খান। যেটা তাকে তরুণ পাকিস্তানিদের মন জোগাতে ভালো ফল দিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য সেবা খাতে উন্নতি, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পতনরোধ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির (১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গরিবদের জন্য ৫০ লাখ বাড়ি নির্মাণ) প্রতিশ্রুতি ইমরান খানকে অন্যদের থেকে এগিয়ে দিয়েছে। পিএমএল-এন ও পিপিপির দুর্নীতি ও দীর্ঘ সময় শাসনের ফলে নানা অনাচার পাকিস্তানিদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। ইমরান খান পাকিস্তানিদের সামনে নতুন আলোর সন্ধান দিয়েছেন। রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থানকে পাকিস্তানিরাও স্বাগত জানিয়েছে। সেনাবাহিনীর পক্ষপাতের বিষয়টা সুবিধাবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সহজ হয়।

জেনারেল জিয়াউল হকের হাত ধরে ১৯৭৬ সালে প্রথম রাজনীতিতে আসেন নওয়াজ শরিফ। দীর্ঘ সময় সেনাবাহিনীর আজ্ঞাতে দেশ চালিয়েছেন। রাজনীতির ঝানু খেলোয়াড় হয়ে যখন সেনাবাহিনীকে পাশ কাটাতে শুরু করেছেন, তখন সেনাবাহিনী তাকে ছুড়ে ফেলেছে। বলা যায়, সেনাবাহিনী ছুড়ে ফেলার সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। কারণ পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির ঘটনার সত্যতা পেয়েই নওয়াজের বিচারিক শাস্তি হয়েছে। যদিও সেনাবাহিনী কর্তৃক বিচারব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আছে। তবে এটা চূড়ান্ত সত্য নয়। নওয়াজ শরিফ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিল এটা সত্য। সেনাবাহিনী নওয়াজ শরিফের বিচারের ফায়দাটা লুটেছে। পাকিস্তান রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ পুরনো বিষয়। নওয়াজের ক্ষেত্রেও মওকা বুঝে কাজটা করেছে সেনাবাহিনী। ইমরানের মাঠ ভালো; এ বিষয়টাও সেনাবাহিনী বুঝেছে। তাই জনসমর্থন নিয়ে যে ইমরান ক্ষমতায় আসতেন, তাকে একটু সহায়তার মাধ্যমে কিছু আসন বেশি পাইয়ে দেওয়ার কাজটি করে সখ্যতা জব্দ করেছে। যাতে অলিখিতভাবে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থাকে।

প্রাদেশিক পরিষদের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পিএমএল-এনের ঘাঁটি পাঞ্জাব প্রদেশে পিটিআই ভালো ফল পেয়েছে। যদি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপেরে বিষয়টা পুরো সত্য হতো, তাহলে সিন্ধুতে পিটিআই ভালো করত। পিপিপির ঘাঁটি সিন্ধুতে পিটিআই কিছুটা খারাপ অবস্থানে আছে। কিন্তু পিএমএল-এনের ঘাঁটিতে ঠিকই ভালো করেছে। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, নওয়াজের দুর্নীতি ইমরান খানের জন্য বড় একটা সুযোগ করে দিয়েছে। তেমনি বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুয়ান খাওয়াতেও পিটিআই তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। তাই এ জয়ের মূল নায়ক ইমরান খান নিজেই। নির্বাচনী প্রচারে ইমরান খান পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ ও বৃহৎ ধর্মীয় গোষ্ঠীর অনুভূতিকে ভাগে আনতে পেরেছিলেন। পীরজাদী বুশরার সঙ্গে বিয়েটা ইমরানের খানের জন্য ভালো ফলদায়ক হয়েছে। ভোটের রাজনীতিতে এটাকে আমরা ইমরানের এক ধরনের চাল বলতে পারি। পাকিস্তানে জনমতের ওপর পীরদের ও ইসলামী বিভিন্ন দলগুলোর বেশ প্রভাব আছে। ইমরান খান রাজনীতির বাইরে থাকা এই ধর্মীয়শক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন। বেশ কয়েকটা ডানপন্থি ইসলামী রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও সখ্য হয়েছিল। যেটাকে অনেকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে দীর্ঘ সময় পাকিস্তানে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে ইমরান খান ডানপন্থি দলগুলোর প্রভাব বুঝতে কিছুটা সক্ষম হয়ছিলেন। যেটা তাকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখে। তবে আমার মনে হয়, ইমরান এখন আর ডানপন্থিঘেঁষা হয়ে থাকবেন না। ব্যবহার শেষ। আমি এটা বলছি এ জন্য, নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর ইমরান খান যে ভাষণ দিয়েছেন, তার সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার সময় দেওয়া ভাষণের প্রভেদ অনেক। তাই ইমরানের এমন চৌকশতাকে নির্বাচনে জয়ের আরেক পদ্ধতি বলে মনে করা হচ্ছে।

এ নির্বাচনে পিটিআই বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে। কিন্তু এককভাবে সরকার গঠনে সমর্থ নয়। এককভাবে সরকার গঠনের জন্য ১৩৭টি আসন দরকার। পিটিআই পেয়েছে ১১৭টি। এখন ইমরান খানকে জোট সরকার গঠন করতে হবে। পিএমএল-এন সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান নেবে বলে জানিয়েছে দলটির বর্তমান সভাপতি শাহবাজ শরিফ। পিপিপি বা অন্য ক্ষুদ্র দলগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করা ছাড়া পিটিআইয়ের সামনে বিকল্প নেই। এতে একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট গঠিত হবে। যেটা সেনাবাহিনীর প্রয়োজন। এর আগে প্রধানমন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতা নেই ইমরান খানের। তাই অভিজ্ঞ কোনো দলের সঙ্গে সরকার গঠনই হবে সময়োচিত পদক্ষেপ। পিপিপির প্রধান বিলওয়াল ভুট্টো জোট সরকার গঠনে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছেন। এটা ইতিবাচক হবে মনে হচ্ছে ইমরান খানের জন্য। তবে সরকার গঠনই শেষ কথা নয়। কারণ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিসহ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টা সম্পূর্ণ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে জিম্মি। নওয়াজ শরিফ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চাওয়াতে সেনাবাহিনী তার ওপর নাখোশ হয়েছিল। ইমরান খান ইতোমধ্যে পাকিস্তান ভারত সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। যদি তিনি ভবিষ্যতে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কোনো প্রদক্ষেপ নেন, তাহলে সেনাবাহিনী সেটা কীভাবে নেবে তার ওপর নির্ভর করছে নবনির্বাচিত পিটিআইয়ের ভবিষ্যৎ। আর বিপৎসংকুল পরিস্থিতিতে জোট কতটা পক্ষশক্তি হিসেবে থাকবে, সেটাও দেখার বিষয়। তবে পাকিস্তান রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের ধরন পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে আমেরিকা কর্তৃক ‘আরব ইস্পিং প্রজেক্ট’ (২০০৮ সাল থেকে মুসলিম দেশগুলোয় গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে ভিন্নভাবে সরকার পতন বা নিজেদের অনুগত লিবারেল সরকার গঠন, সেটা সেনা অভ্যুত্থানের বাইরে) নেওয়া পড়ে। আগের মতো অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকার পরিবর্তন না করে কৌশলে কাজ করে। তাই জোট সরকারের ভবিষ্যৎ অনেকটা সেনাবাহিনীর কূটচালের হাতে জিম্মি থাকবে। তা ছাড়া পাকিস্তানের পতনশীল অর্থনীতিকে বাঁচাতে শুধু চীনের ওপর নির্ভরশীলতা যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতিতে অন্য দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কোন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে। যেটা পাকিস্তান সেনাদের নাখোশ হওয়ার কারণ হতে পারে। তাই ইমরান খান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তথা কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে যে কথা বলেছেন, তা রক্ষা করতে কতটা সমর্থ, সেটার ওপরও জোট সরকারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কারণ ইমরান খান যদি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারেন, সে ক্ষেত্রে জনরোষ দেখা দিতে পারে। সে সময় জোটে থেকে পিপিপি জনরোষের ভাগ কতটা নেবেন, তাও দেখার বিষয়। যদি পিপিপি অনুকূলে না থাকে, তাহলে ইমরান খানের জন্য পার্লামেন্টে অবস্থান করা কঠিন হবে। কারণ শক্তিশালী রাজনৈতিক দল পিএমএল-এন তার বিরোধী দল।

পাকিস্তানের রাজনীতির গতি বোঝা একটু কষ্টকর। কারণ দেশটি গণতান্ত্রিকচর্চার ক্ষেত্রে এখনো পুরোপুরি সামরিক হস্তক্ষেপমুক্ত নয়। অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদীদের হুমকি তো আছেই। সন্ত্রাসবাদে অর্থ জোগানদানের অভিযোগে পাকিস্তান কালো তালিকাভুক্ত হয়েছে। যদি এ অভিযোগ ভুল প্রমাণিত করতে না পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক সহায়তার ক্ষেত্রটি সংকোচিত হবে, যা পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। দেশ পরিচালনায় পূর্ব অভিজ্ঞতার অভাব, রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা, অনিশ্চিত জোট এবং শক্তিশালী বিরোধী দল সবকিছুর মোকাবিলা করে আগামীতে কতটা সফলতার পরিচয় দিতে পারে ইমরান খান, তাই এখন দেখার বিষয়। অনেক ভবিষ্যদ্বাণী তথা পরিস্থিতির বিশ্লেষণ আখেরে বাস্তবতার পাশ দিয়েও যেতে পারে না। তাই ঘোলাটে পাকিস্তান রাজনীতি নিয়ে যতই বিশ্লেষণ হোক, সময় বলে দেবে পিটিআইয়ের ভবিষ্যৎ কী হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

sadikiu099@gmail.com

"