পর্যালোচনা

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং...

প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার বিরাট চ্যালেঞ্জ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যেখানে বছরে মাথাপিছু যথাক্রমে ১৭ ও ৭ দশমিক ১ টন কার্বন নিঃসরণ করে, সেখানে বাংলাদেশ বছরে মাথাপিছু গড়ে দশমিক ৪ টন কার্বন নিঃসরণ করে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি ও দুর্দশার শিকার হতে হচ্ছে বাংলাদেশ ও তার জনগণকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। দেশের হাওর অঞ্চলে অসময়ে বন্যা দেখা দিচ্ছে। তাই এই দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হবে সময়ের একমাত্র দাবি। হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধ সংস্কারে নতুন কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় কি না, তাও ভেবে দেখা দরকার।

ইন্টারন্যাশনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের হিসেবে, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ছয় বছরে বাংলাদেশের ৫৭ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, ১. প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর পরপর বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ ভূখ- বন্যায় ডুবে যাবে। এতে ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি গরিব মানুষের ঘরবাড়ি বিনষ্ট হবে। তাপমাত্রা আড়াই ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বন্যাপ্লাবিত এলাকার পরিমাণ ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ২. ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে বাংলাদেশের ৩৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষের ঘরবাড়ি ডুবে যায়। ওই ঝড়ের ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ২০৫০ সালের মধ্যে এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে তিন মিটার উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস উপকূলে আঘাত হানবে। ৩. ২০৮০ সালের মধ্যে উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ৪০ শতাংশ ফসলি জমি হারিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ২ কোটি মানুষ ঘরবাড়ি হারাচ্ছে, যার ৭০ ভাগই হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিনিয়োগ বাড়াতে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমান সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তি, কম গ্রিন হাউস গ্যাস ও কার্বন নিঃসরণ হয়, এমন শক্তির উৎস উদ্ভাবনসহ সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে এবং কৃষি গবেষণায় আরো বেশি বিনিয়োগ করার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপের (পিপিপি) ওপরও জোর দেওয়া হয়। দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটামুটি ভালো। তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে ভালো। তার কারণ অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের জিডিপির গ্রোথ বেশি। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেহেতু বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলো যতেষ্ট ঝুঁকির সম্মুখীন, তাই এসব ঝুঁকি কমানো এবং তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরই বেশি জোর দিতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করতে না পারলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উন্নয়শীল দেশগুলো তাদের জিডিপির ৫ শতাংশ হারাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশগুলোর নীতি প্রণয়নে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার যে ১৭টি অভীষ্ট রয়েছে, তার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন ও অসমতা দূরীকরণÑএ দুই অভীষ্টকে মোকাবিলা করতে হবে একসঙ্গে। জাতিসংঘের বিশ্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক জরিপ প্রতিবেদনে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। যতই দিন যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১৯৮৫-৯৪ সাল পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয়েছে ৬৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ২০০৫-১৪ সাল পর্যন্ত গড় ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৪ বিলিয়ন ডলার। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বাড়ছে। এতে উপকূলীয় এলাকার মানুষ তাদের সহায়-সম্পদ হারাচ্ছে। জমির ফসল বিনষ্ট হচ্ছে। শুধু উপকূলীয় এলাকাতেই নয়; দুই বছর ধরে জলাবায়ু পরিবর্তনের ফলে অকালে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে হাওর, চরাঞ্চল ও নিচুবিল এলাকার রাস্তাঘাট ও পাকা বোরো ধান তলিয়ে যাচ্ছে পানির নিচে। এসব কারণে উপকূল, হাওর ও চর এলাকার মানুষ দরিদ্র থেকে দরিদ্র হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ নদীভাঙনও তীব্র আকার ধারণ করছে। এসব কারণে অনেকে নিজের বাপ-দাদার ভিটামাটি ও বাড়িঘর হারিয়ে রাজধানীর বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে ধনী আর দরিদ্রের মধ্যে বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি হচ্ছে। ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ৬৪৬৭টি জলবায়ু সংশ্লিষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। তাতে প্রাণ গেছে প্রায় ৬ লাখ মানুষের। এর বাইরে ৪২০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জলবায়ু পরিববর্তনজনিত ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় আগামী এক যুগে ১৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্লাইমেট-স্মার্ট বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশে, যা টাকার অঙ্কে ১৪ লাখ ২৭ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। চলতি ২০১৮ সাল থেকে ২০৩০ সালে এ বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। ‘দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু বিনিয়োগ সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে আইএফসি এমন আভাস দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বিরাট বিনিয়োগ হবে পরিবহন, পরিবেশবান্ধব আবাসন, নগরে পানি সরবরাহ, কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় ঝুঁকি সূচকে বিশ্বের শীর্ষ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর এ ঝুঁকি কমাতে সরকার ইতোমধ্যে ২০০-এর বেশি আইন ও ধারা তৈরি করেছে। আইএফসি বলছে, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকৃষ্ট বেশ কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এরই মধ্যে অন্যতম হলো, স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জোগান ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ঋণ প্রদানে ব্যাংকগুলোকে আশ্বস্ত করতে প্রদর্শনী প্রকল্প পরিচালনা করতে হবে। ভূমি ক্রয়-প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প জনপ্রিয়করণসহ পরিবেশবান্ধব নতুন ভবন তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করা। আইএফসির প্রতিবেদন মতে, সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হবে পরিবেশবান্ধব সবুজ আবাসনে। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে ১১৮ বিলিয়ন ডলার। এ জন্য বার্ষিক ৫০ লাখ বাসস্থানের চাহিদার বিপরীতে নগরে ৫ লাখ ও গ্রামে ৩৫ লাখ বাড়ি তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। আবাসনের পর সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হবে পরিবহন অবকাঠামো খাতে। এ খাতে ২৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। মূলত বহুমুখী গণপরিবহনকে গুরুত্ব দিয়ে খাতটিতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নগরের সুপেয় পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে এ খাতে ১৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখছে আইএফসি। এ ক্ষেত্রে পানিসম্পৃক্ত অবকাঠামো ও পানি ব্যবস্থাপনা প্রাধান্য পাবে। আইএফসির মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ হবে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। নগরের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আগামী এক যুগে বিনিয়োগ হবে ৪ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সাল নাগাদ নগরের ৮০ শতাংশ কঠিন বর্জ্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অপসারণেই এ বিনিয়োগের লক্ষ্য।

লেখক : কৃষিবিদ ও গবেষক

netairoy18@yahoo.com

"