বিশ্লেষণ

সমাজ গঠনে কাঙাল হরিনাথ

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

ইমাম মেহেদী

উনিশ শতকের বাঙালি পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। তিনি ১৮৩৩ সালে (তৎকালীন নদীয়া জেলার কুমারখালি মহকুমার) বর্তমানে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার কুন্ডুপাড়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন। নিবিড় চিত্তে তিনি ছিলেন একাধারে সম্পাদক-সাংবাদিক, সাহিত্যিক, গীতিকার, নারী শিক্ষার অগ্রদূত, গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ও সমাজ সংস্কারক। পিতার নাম হলধর মজুমদার। মাতার নাম কমলমণি দেবী। শিশুকালেই পিতা-মাতাকে হারিয়ে দরিদ্রতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছে তাকে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না হলেও প্রকৃত শিক্ষা তিনি দরিদ্রতার মাঝেই অর্জন করেছিলেন। নীল কুঠিতে চাকরি, মহাজনের গদিতে খাতা লেখাসহ জীবীকার তাগিদে ছুটেছেন দিনের পর দিন। কিন্তু দারিদ্র তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি।

কাঙাল হরিনাথকে জানতে হলে তার জীবনী, কর্ম ও সাহিত্যের পুনর্পাঠ আমাদের জন্য জরুরি। কাঙালের রচিত গান সমকালীন সংগীতে বিলুপ্তির পথে। মৃত্যুর পরপরই তার সৃষ্টি-কৃষ্টি দিনে দিনে তৈজস্বতা হারিয়েছে। আজকের এই একবিংশ শতাব্দিতে আমরা যা পারিনি, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার উনিশ শতকে তা পেরেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনীতি, অর্থনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যে দুর্নীতির চালচিত্র, তা কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের সাংবাদিকতার লেখনির সম্পূর্ণ ভিন্ন। আধুনিক সমাজ পরিবর্তনে, শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও নারী শিক্ষা এবং সংবাদপত্রের পথপ্রদর্শক হিসেবে আমরা তাকে দেখতে পাই। তার ক্ষুরধার লেখনি ও সত্যপ্রকাশে আপসহীন সংবাদপত্রের কাছে বর্তমানে সংবাদপত্র কখনো কখনো প্রশ্নবিদ্ধ।

তৎকালীন সময়ে কুমারখালি শহরে বসে যে আধুনিক চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তা ইতিহাসের পাতায় উপেক্ষতি। তিনি আধুনিক সংবাদপত্র বা গ্রামীণ সাংবাদিকতার প্রতিষ্ঠাতা। ১৮৫৪ সালে ১৩ জানুয়ারি কাঙাল হরিনাথ মজুমদার কুমারখালিতে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে অবৈতনিক শিক্ষকতার মধ্যে দিয়ে শিক্ষিত জাতি গড়ার প্রত্যয় ঘটান। আজ আমরা নারী শিক্ষা, নারী আন্দোলন, নারী জাগরণের যে কথা বলিÑ হরিনাথ মজুমদার তা ভেবেছিলেন প্রায় ১৬৫ বছর আগে। সমাজে তখন তিনি নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা লক্ষ্য করেছিলেন। এ কারণে ১৮৬৩ সালে নিজ উদ্যোগে কুমারখালিতে মেয়েদের জন্য বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। সেটিই এখন দেড়শ বছরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ।

১৮৫৭ সালে ২১ অক্টোবর কলকাতা থেকে প্রকাশিত কবি ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ এ ‘টাকা’ শিরোনামে একটি লেখার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। কবি ঈশ্বর গুপ্তের সহমর্মিতা ও সহযোগিতায় কাঙাল হরিনাথ অতি অল্পসময়ে লেখক হয়ে ওঠেন। ১৮৫৯ সালে তিনি প্রথম ‘বিজয় বসন্ত’ গ্রন্থ রচনা করেন। অতি অল্পসময়ে সুখ্যাতি অজর্ন করেন। ‘বিজয় বসন্ত’ উপন্যাস প্রসঙ্গে সেই সময় শিবনাথ শাস্ত্রী তার ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন- “কুমারখালীর হরিনাথ মজুমদারের প্রনীত ‘বিজয় বসন্ত’ ও টেকচাঁদ ঠাকুরের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বাংলার প্রথম উপন্যাস।” ১৮৬৩ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতার গিরিশ চন্দ্র বিদ্যারতœ মুদ্রাযন্ত্র থেকে প্রথম মাসিক ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশ করেন। যদিও ১৮৫৭ সাল থেকেই তিনি হাতে লেখা ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশ করে আসছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় তখনকার নীলকরদের অত্যাচার এর বিরুদ্ধে সংবাদ ছাপা হতো। এর কারণে পাঠক সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

১৮৭৩ সালে অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এর সহযোগিতায় মথুরনাথ মৈত্রের নামানুসারে কুমারখালিতে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার মথুরানাথ মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করেন, যা বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাসে ‘এম এন প্রেস’ নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে কুমারখালি থেকে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ মাসিক, পাক্ষিক ও সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হতে থাকে। রাজশাহীর রানী স্বর্ণকুমারী দেবীর আর্থিক সহায়তায় প্রায় ১৮ বছর পত্রিকাটি প্রকাশের পর আর্থিক এবং সরকারের মুদ্রণ শাসন ব্যবস্থার কারণে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

কাঙাল হরিনাথ মুজমদার তার দিনলিপিতে লিখেছেন, ‘আমি সম্পাদক, আমি পত্রিকা বিলিকারক, আদায়কারী, পত্রলেখক ও সংসারের কর্তা।’ কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের গ্রামবার্ত্তাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সময়ে কুমারখালি ও কুষ্টিয়া এবং নদীয়া ব্যাপক শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে। একটি সাহিত্যিক পরিসর গড়ে ওঠে। অক্ষয় কুমার মৈত্রয় (১৮৬১-১৯৩০), রায় বাহাদুর জলধর সেন (১৮৬০-১৯৩৯), দীনেন্দ কুমার রায় (১৮৬৯-১৯৪৩), মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১) ও শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব (১৮৬০-১৯১৩) ছিলেন সেই পরিসরের প্রাণপুরুষ।

বহুমুখী প্রতিভার এই শিল্পী বাউল গান রচনাতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের গান সম্পর্কে শ্রী সুকুমার সেন বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের আগে বাউল গান যাহাকে ইংরাজীতে ‘ঠড়মঁব’ গান বলে তাহা কাঙাল হরিনাথই সৃষ্টি করেছিলেন।’ উক্তিটি এখানে যথাযথ। কারণ রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪২) জমিদারি, সাহিত্যসাধনা সাঁইজি লালন ও কাঙাল হরিনাথ মজুমদার পরবর্তী সময়ে। কারণ রবীন্দ্রনাথের জমিদারি সূত্রে শিলাইদহে আবির্ভাব ১৮৯০ সালে। অন্যদিকে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার দেহত্যাগ করেন ১৮৯৬ সালে। সাঁইজি লালনও দেহত্যাগ করেন ১৮৯০ সালে। সাঁইজি লালন এবং হরিনাথ মজুমদারের সংগীত ও সাহিত্য সাধনার সময়কাল রবীন্দ্রনাথের সদ্য অতীত।

কাঙাল হরিনাথ মজুমদার তার জীবদ্দশায় অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সাহিত্য রচনা করেছেন। তার রচিত মোট গ্রন্থসংখ্যা ২৪টি। এর মধ্যে মুদ্রিত গ্রন্থ ১৮টি। বিজয় বসন্ত (১৮৬৯), পদ্য পুন্ডরীক (১৮৬২), চারু চরিত্র (১৮৬৩), কবিতা কৌমুদী, (১৮৬৬), বিজয়া (১৮৬৯), কবি কল্প (১৮৭০), অক্রর সংবাদ নাটিকা (১৮৭৩), সাবিত্রী নাটিকা (১৮৭৪), চিত্ত চপলা (১৮৭৬), একলব্যের অধ্যবসায়, ভাবোচ্ছাস, ব্রক্ষ্মন্ড বেদ (প্রথম থেকে ষষ্ঠ খ-), কাঙাল ফিকির চাঁদ ফকিরের গীতাবলি (১৮৮৭ ও ১৮৯৩), কৃষ্ণকালী লীলা (১৮৯২), অধ্যাত্মা আগমনি (পুস্তিকা), আগমনী, মাতৃমহিমা (১৮৯৭), শ্রী কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম, আনন্দময়ী মায়ের আগমনী (পুস্তিকা)। অপ্রকাশিত গ্রন্থ প্রেম-প্রমীলা, মানুষ, জটিল কিশোর, শুম্ভ-নিশুম্ভ বধ ও অশোক।

অন্যদিকে সাঁইজি লালন (১৭৭৪-১৮৯০) ও কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-১৮৯৬) জন্ম ও ভৌগলিক সীমারেখায় দুজনেই অভিন্ন উর্বর ভূমির সহোদর। আঞ্চলিক দূরত্ব ও চালচলনে একই বলয়ে হওয়ার কারণে চিন্তা চেতনায় ও জয়গানে দুজনেই ছিলেন অভিন্ন। একজন তার মুক্ত চিন্তা বুদ্ধি দিয়ে আধ্যাত্মিক জীবন দর্শন করেছেন বাউল গানের মধ্যে দিয়ে। অন্যজন তার ক্ষুরধার লেখনি দিয়ে। হরিনাথের গান, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সংবাদপত্রে তৎকালীন সময়ের কুষ্টিয়া ও কুমারখালির প্রেক্ষাপটই ছিল মুখ্য। দরিদ্র থাকা সত্ত্বেও সাঁইজি লালন গড়ে তুলেছিলেন সব ধর্মের মানুষ নিয়ে এক অভিন্ন মানবজাতি। আর পাশাপাশি কুন্ডুপাড়াতে বসে সাহিত্য ও সংবাদপত্র, গান এবং সমাজ সংস্কারের জয়গান করতেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। অপরদিকে সাঁইজি লালন ও কাঙাল হরিনাথের গানের প্রেরণাতেই অক্ষয় কুমার মৈত্রের (১৮৬১-১৯৩০) মাথায় প্রথম বাউলের দল গঠনের চিন্তা আসে। পরবর্তীতে কাঙাল হরিনাথের শিষ্যদল তা বাস্তবতায় রূপ দেয় ‘ফিকির চাঁদ’ নামে।

অধিকার আদায় ও সত্য প্রকাশে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ ও কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের রয়েছে বলিষ্ঠ ভূমিকা। গ্রামবার্ত্তা পত্রিকায় তৎকালীন সময়ে ‘গরু চোর ম্যাজিস্ট্রেট’ শিরোনামে সংবাদ ছাপা হওয়ার পরে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা পত্রিকা সম্বন্ধে তৎকালীন পাবনা জেলার ম্যাজিস্ট্রেট (সে সময় কুমারখালি ছিলো পাবনা জেলার মহকুমা) মি. হামফ্রে তার চিঠিতে কাঙাল হরিনাথ বরাবর চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘মি. এডিটর আমি তোমাকে ভয় করি না বটে, তবে তোমার লেখনি পড়ে অনেক কুকর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি।’

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে হরিনাথ মজুমদার এর মাতৃভাষা ও স্বদেশ প্রেম লক্ষ্য করা অত্যন্ত দৃঢ় ভাবে। ‘যতদিন বঙ্গসন্তান মাতৃভাষা উপেক্ষা করিয়া পরভাষার পক্ষপাতী থাকিবেন, যতদিন মাতৃভাষা ঘৃণা করিয়া বৈদেশিক অনুশীলনে সময় ক্ষেপন করিবেন, ততদিন বঙ্গের উন্নতির আশা আমরা করি না, ততদিন জাতীয় উন্নতির কোনো সম্ভাবনা দেখি না। যাহাতে দেশে মাতৃভাষার চর্চা দিন দিন বৃদ্ধি পায়, যাহাতে মাতৃভাষা আদরের সামগ্রী, যতেœর ধন বলিয়া লোকের প্রতীতি জন্মে, যাহাতে সকলে বদ্ধপরিকর হইয়া মাতৃভাষার দীনবেশ ঘুচাইতে সমর্থ হন, বিধি রতেœ মাতৃভাষাকে অলঙ্কৃত করিতে কৃতসংকল্প হন, সে বিষয়ে চেষ্টা করা প্রত্যেক বঙ্গসন্তানের অবশ্য কর্তব্য কর্ম। (তথ্য সূত্র : কাঙাল হরিনাথ মজুমদার স্মারক গ্রন্থ, সম্পাদনা- ড. আবুল আহসান চৌধুরী)।’ সমকালীন সংবাদপত্র, নারী শিক্ষা, সমাজ সংস্কার, বাউল গান ও নির্ভীক সাংবাদিকতায় কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ছিলেন আধুনিক সমাজ বিনির্মাণের পথপ্রদর্শক। তার ক্ষুরধার লেখনি, বাউল গান ও গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা হোক আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য চেতনার ধারক-বাহক এবং প্রেরণার মাইলফলক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যমকর্মী

"