মতামত

ঘরের প্রদীপ থেকেই

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

আল ফাতাহ মামুন

পৃথিবীতে যতগুলো প্রধান ধর্ম আছে, ইসলাম তার মধ্যে প্রাচীন। এই প্রাচীন ধর্মটি নতুন প্রাণ পেয়েছে মুহাম্মদ (সা.)-এর মতো প্রাণময় মানুষের ছোঁয়া পেয়ে। আল্লাহ তায়ালা তার মনোনীত ধর্মকে মনোনীত বান্দার মাধ্যমে নতুন আঙ্গীকে যুগোপযোগী করে মানুষের কল্যাণ-মুক্তি ও শান্তির জন্য নির্ধারণ করেছেন। এ হিসেবে ইসলামকে অন্যান্য ধর্মের তুলনায় নতুন বলা চলে। অন্য সব প্রধান ধর্মের তুলনায় ইসলামের বয়স অনেক কম। মাত্র দেড় হাজার বছর। ইহুদি, খ্রিস্টান এবং হিন্দুধর্মের ইতিহাস অনেক পুরনো। ধর্ম বিশ্লেষকরা বলছেন, সময়ের ধারাবাহিকতায় ইসলাম এখন চরম কঠিন সময় পার করছে। এমন সমস্যা অন্য ধর্মগুলোও পেরিয়ে এসেছে। কোনো কোনো ধর্ম এ সমস্যা কাটিয়ে উঠছে। কিন্তু ইসলাম ও মুসলমনারা কেন যেন এ সমস্যাটির দিকে মনোযোগ না দিয়ে বরং সমস্যাটিকে আরো বাড়িয়ে তুলছেন।

পবিত্র কোরআন ইসলাম ধর্মের সংবিধান। রাসুল (সা.) এ সংবিধানের ভাষ্যকার। তিনি নিজেও আইনপ্রণেতা। কোরআন এবং রাসুল (সা.)-এর জীবনের কোনো একটি ক্ষুদ্রতম অংশ দিয়েও কেউ প্রমাণ করতে পারবে না, ইসলাম ধর্মে দলাদলি, বিভেদ, অনৈক্যের সুযোগ আছে। কোরআন স্পষ্ট বলছে, ‘ওয়াতাছিমু বিহাবলিল্লাহি জামিআ ওয়ালা তাফাররাকু। হে ইসলাম সংঘের সদস্যরা! তোমরা ঐকবদ্ধ হয়ে আমার রশি আঁকড়ে থাকো। কখনো বিভেদ করো না।’ আফসোস! কীভাবে যেন অন্য সব ধর্মের মতো আমাদের ধর্মেও দলাদলি-ফেরকা-মাজহাবের উদ্ভব হয়ে গেছে। কীভাবে যেন আমরা পীর, দল, তরিকার পরিচয়কে নিজেদের সঙ্গে জুড়ে নিয়েছি। নিজেদের মতো করে জামা, টুপি, পাগড়ি বানিয়ে অন্য সবার থেকে নিজেদের আলাদা করে ফেলেছি। প্রত্যেক পীরের আলাদা টুপি। প্রত্যেক দলের আলাদা স্টাইল। প্রতিটি মাজহাবের আলাদা নাম, পরিচয়, বৈশিষ্ট্য করে আমরা একে ইসলামের লেবাস পরিয়ে রেখেছি। কিন্তু কেউ এটি ভাবছে না-যে নামেই হোক আর যেভাবেই হোক, দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়া কোনোভাবেই ইসলামের সৌন্দর্যের সঙ্গে মানানসই নয়।

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্ররা এসে তাদের ধর্মের নামে দলাদলি ভাঙার জন্য কলম ধরেছেন। এরও আগে খ্রিস্টানরা তাদের ধর্মের ফাটল জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এমনিভাবে সব ধর্মাবলম্বীই তাদের ধর্মকে ভাগ হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করছেন। আফসোস! শুধু আমরাই আমাদের ধর্মে নিত্যনতুন দল-মত তৈরি করে যাচ্ছি। এক-দুজন স্কলার যদি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান করেন, আমরা তাদের কাফের-ফাসেক-মুনাফেক বলে মানুষকে তাদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখি।

দরদি পাঠক! ধর্মভাবুক সৈয়দ রশীদ আহমদ জৈনপুরী (রহ.) এসব বিষয় নিয়ে খুব ভাবতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, এসব দলাদলি বাদ দিয়ে মোহাম্মাদি দলে ধর্মের নাও ভেড়ানোই মুসলমানদের অন্যতম প্রধান কাজ। আমরা সবাই মোহাম্মদি মুসলমান। আমাদের আল্লাহ এক, নবী এক, কোরআন এক, কাবা এক, ধর্ম এক। আমাদের দল, মাজহাব বা তরিকাও এক। সেটি হলো মোহাম্মাদি তরিকা। ইকবালের কবিতা পাঠ করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা যে মৃত আত্মার জাতিতে পরিণত হয়েছে, তার জন্য আমেরিকা দায়ী নয়। ইসরায়েল দায়ী নয়। ইহুদি-খ্রিস্টান কেউ দায়ী নয়। দায়ী আমরা নিজেরাই। কবি আল্লামা ইকবাল বলেছেন, ‘ইস ঘরকো আগ লাগ গয়ি ঘরকে চিরাগ সে।’ অর্থ : এ ঘরে আগুন লেগেছে, ঘরের প্রদীপ থেকেই।

বড় আফসোসের সুরে জৈনপুরী বলেছেন, আমাদের দুর্ভাগ্যের জন্য যদি আমরা দায়ী না হই, তাহলে কেন আমরা নিজেদের মোহাম্মাদি সিলসিলার বলে পরিচয় দিতে পারছি না? হে আল্লাহ! পৃথিবীর সব মুসলমানকে আপনি এক হয়ে আপনার কোরআনকে আঁকড়ে থাকার তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

"