বিশ্লেষণ

সবুজাভ অর্থনীতিতে বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

এস এম মুকুল

জীবন ধারণের জন্য বিশুদ্ধ অক্সিজেন বাতাসে ছেড়ে গাছপালা আমাদের বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। আপনি কি জানেন, একটি গাছ বছরজুড়ে ১০টি এয়ার কন্ডিশনারের সমপরিমাণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করে। ৬০ পাউন্ডের বেশি ক্ষতিকারক গ্যাস বাতাস থেকে শুষে নেয়। ৭৫০ গ্যালন বৃষ্টির পানি শোষণ করে। ১ হেক্টর এলাকার গাছপালা ৩ টন বায়ু গ্রহণ করে। ২ টন বিশুদ্ধ অক্সিজেন দেয়। এ কারণেই বৃক্ষ মানুষের বন্ধু। গাছপালা ও জঙ্গল পশু, পাখি, পোকা-মাকড় ও কীট-পতঙ্গের বসতবাড়ি। এরাও মানবজাতির জন্য প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় নিবেদিত। কাজেই কোনোভাবেই বৃক্ষরোপণকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মানবজীবনে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত গাছ আমাদের পরম সহযোগী ও সঙ্গী। ইসলামের দৃষ্টিতে বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সব সময়ই বৃক্ষরোপণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ, গাছের সঠিক পরিচর্যা ও যতœ করার উপদেশ দিতেন। সর্বসাধারণকে গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আমরা জানি, গাছ হচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইডের অন্যতম গ্রহীতা। ফলদ গাছের অধিক চারা রোপণে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে বৃক্ষ বিশেষত ফলদ বৃক্ষের চারা রোপণ অত্যন্ত অপরিহার্য। ফলদ বৃক্ষ রোপণে কেবল সম্পদই অর্জিত হয় না, পরিবেশে কার্বনের পরিমাণও হ্রাস করে। কারণ, ফলদ বৃক্ষ মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

জুলাই ও আগস্ট মাস গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময়। আগামী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে নিকটস্থ জেলা ও উপজেলার নার্সারি বা বৃক্ষমেলা থেকে চারা সংগ্রহ করে আপনিও ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা লাগান। সরকারের উদ্যোগে ব্যাপকভাবে গাছ লাগানোর সুযোগ রয়েছে প্রচুর। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, সরকারি অফিস, খাসজমি, রাস্তার দুই পাশে, নদীর দুই পারে, রেল সড়কের দুই পাশে এবং উপকূলীয় এলাকায় প্রচুর গাছ লাগানোর সুযোগ আছে। ক্যাম্পেইন প্রয়োজন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। শিক্ষার্থীদের জন্য নামমাত্র মূল্যে গাছের চারা বিতরণ করা যেতে পারে। বছরে তিনটি করে গাছ লাগালে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা জীবনেই এর সুফল ভোগ করবে। এই গাছ লাগানো তাদের শুধু ব্যক্তিগতভাবে লাভবান করবে না-পরিবেশ বাঁচাবে, প্রকৃতিপ্রেমী হয়ে উঠবে তারা। এ ক্ষেত্রে চীনের উদ্যোগটি অনুসরণীয় হতে পারে। গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে ধারণা নিতে এবং জীবনযাত্রার পার্থক্য অনুধাবনের জন্য চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চংকিং শহর কর্তৃপক্ষ শহরের শিক্ষার্থীদের গ্রামে পাঠায়। গ্রামে অবস্থানের সময় প্রায় সাড়ে সাত লাখ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককেই ১০০টি করে চারা গাছ রোপণ করতে হয়। তাদের ধারণা-এই শিক্ষার্থীদের জীবনবোধ হবে মানবীয়, প্রজন্মগত ও ভৌগোলিক দূরত্ব কমানো সম্ভব হবে। হাওরে পানিসহিষ্ণু হিজল ও করচগাছ লাগিয়ে বাগ বা জঙ্গল তৈরি করা যেতে পারে। দেশের মহাসড়কে, রেল সড়কের দুই পাশে প্রচুর গাছ লাগানোর সুযোগ রয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সব সিটি করপোরেশন, পৌর শহর, উপজেলা বা থানাপর্যায়ে শহরের ভেতরে রাস্তার মাঝখানে ডালপালা কম হয়, উঁচু ও দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগালে পাঁচ বছরে আমাদের শহরগুলোও সবুজ হয়ে উঠবে।

কথায় আছে-গাছ সব মানুষকে ছায়া দেয়, এমনকি কাঠুরেকেও। গাছের শীতল ছায়া আর নির্মল বাতাস পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রেখেছে। নির্বিঘেœ সেই জীবন সহায়ক গাছ কেটে পৃথিবীকে মরুময় করে তুলছি আমরাই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জিডিপিতে গাছের অবদান-সংক্রান্ত সমীক্ষা অনুযায়ী পরিবার পর্যায়ে অর্থাৎ বাড়ির আশপাশে যে গাছপালা লাগানো হয়, তা থেকে অর্থনীতিতে গড়ে ১২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন হয়। জানলে অবাক হবেনÑদেশের ২০ লাখ ৫৯ হাজার ৬০৮টি পরিবার শুধু গাছ লাগিয়ে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। বিবিএসের সমীক্ষায় আরো বলা হয়, পরিবার পর্যায়ে রোপণকৃত গাছপালার মধ্যে শুধু বসতবাড়ির আশপাশেই ৫৪ শতাংশ গাছ লাগানো হয়। বিভিন্ন জাতের গাছ থেকে প্রতি বছর গড়ে ১৬ কোটি ৭৪ লাখ ঘনফুট কাঠ উৎপাদন হয়। এ কাঠের আর্থিক মূল্য প্রায় ৬ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলনেও বৃক্ষ উৎপাটনের মহোৎসব চলে। খুব বলতে ইচ্ছা করে, রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যদি দলের সদস্য-কর্মীদের প্রতি বছর তিনটি করে গাছ লাগাতে বাধ্য করত, তাহলে ভেবে দেখুন ৩০ বছরের একজন কর্মীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে অন্তত ৯০টি গাছ লাগানো সম্ভব হতো। এভাবে লাখো লাখো কর্মী গাছ লাগালে সবুজে ভরে উঠত বাংলাদেশ। রাজনৈতিক দলগুলো কত ধরনের কর্মসূচিই তো বাস্তবায়ন করে। তারা চাইলে প্রতি বছর ‘সবুজের অভিযান’ নামে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করতে পারেন। এতে কর্মী-সদস্যদের নেতিবাচক কর্মপ্রবণতা কমবে, দেশের জন্য উপকার হবে। আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এমন একটি পরিবেশবান্ধব রাজনৈতিক কর্মসূচি তো নিতেই পারেন। গাছপালা কেটে উজাড় করে ফেলার কারণে পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া ও ঋতুবদলে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। ষড়ঋতুর বাংলাদেশ আর নেই। এখন শীতে শীত নেই, বর্ষায় বৃষ্টি নেই, শরতে বসন্তে নেই ঋতুর আবেশ। তাই বাঁচতে হলে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে আগে।

আমরা জানি, সবুজ বনায়নের ফলে পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, জীবজন্তুর অভয়াশ্রম সৃষ্টি হয়। আর ফুল, ফল, শীতল ছায়া আর নির্মল বাতাস তো পাচ্ছিই। সঙ্গে পাচ্ছি জ্বালানি কাঠ, আসবাবপত্রের কাঠ এবং আর্থিক সাপোর্ট। সুতরাং এই পরম বন্ধুকে জেনে শুনে ধ্বংস করা মানব জীবনের জন্যই হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে হতাশার মধ্যেও আশার খবর হলোÑটিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার নারিকেল বাড়িয়া ইউনিয়নের পশ্চিমা গ্রামের মফিজুর রহমান মফিজ কোটি টাকার মালিক। ১৯৭৯ সালে তিনি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বন বিভাগের উদ্যোগে যশোর কালেক্টরেট চত্বরে শিক্ষার্থীদের বৃক্ষমেলা থেকে মাত্র দশ পয়সা করে একটি গাছ কেনার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তার জমানো টিফিনের এক শ টাকায় এক হাজার মেহগনি গাছের চারা বাড়ি নিয়ে যায়। তার কা- দেখে পরিবারসহ পাড়া-প্রতিবেশীরা পাগলামি বলে হেসেই উড়িয়ে দেন। তবে মফিজ মোটেও দমেননি। প্রায় ১৮ বিঘা জমিতে মফিজ এভাবেই প্রতি বছর আম, কাঁঠাল, জাম, সেগুন, শাল ও মেহগনি গাছ লাগিয়ে যান। একসময় তার বাগান ভরে উঠে শত শত আম, জাম, কাঁঠাল, কয়েক হাজার মেহগনি এবং সেগুনগাছে। ২০০৭ সালে এক প্রতিবেদনে জানা যায়, তার বাগানে ২ হাজার মেহগনি গাছ, যার বাজার মূল্য ১৫ হাজার টাকা হিসেবে তার ৩ কোটি টাকা আয় হয়। ভাবা যায়, টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে গাছ কেনায় সেদিনের হাস্যরসিকদের কাছে মফিজ এখন আদর্শ বৃক্ষপ্রেমিক। তার সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকা সবাই কমবেশি গাছ লাগাচ্ছেন যার বাজার মূল্য ১০০ কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে এ রকম একজন করে মফিজ থাকলে সবুজে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হতে খুব বেশি সময় লাগবে কি!

এবার শুনুন ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জের বৃক্ষপ্রেমিক আলাউল হক অলির সবুজ ভুবনের গল্প। এই বৃক্ষপ্রেমিকের নেশায় পেশায় জড়িয়ে আছে গাছ। প্রায় ৬০ বিঘা জায়গাজুড়ে বিশাল এলাকায় তার বৃক্ষ উদ্যান। অলি দেশ ও বিদেশ থেকে নানা প্রজাতির ফলদ, বনজ আর ঔষধি বৃক্ষ সংগ্রহ করেছেন। তার উদ্যানে আছেÑ দেশিজাতের দারুচিনি, তেজপাতা, আমরা, খয়ের, হরীতকী, গোলমরিচ, চন্দন, কাঠবাদাম, কাউফল, পেস্তা, চালতা, আতা, লুকলুকি, সফেদা, জলপাই, আমলকী, জাম্বুরাসহ বিদেশি জাতের বেদানা, কফি, রিটা, লবঙ্গ ও মাল্টাসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। এই উদ্যান যেন পাখি, মৌমাছি আর প্রজাপতির এক বিচিত্র অভয়ারণ্য ভুবন। এখানে নাকি প্রায় হাজার দুয়েক বুনো কবুতর বাস করে নির্ভয়ে। তার সঙ্গে আছে পেঁচা, চড়–ই, ফিঙে, কোকিল, চিল, বকসহ কত রকমের পাখি। অলি আবার ওদের খাদ্য আর নিরাপত্তার বিষয়ে খুবই যতœশীল। ওরা যেন তার মেহমান। তাই বাসা বাঁধার সুবিধার্থে তিনি গাছের উঁচু ডালে মাটির হাঁড়ি-পাতিল বেঁধে রাখেন। তা ছাড়া এত বড় উদ্যানের খাবার তো ফ্রি-ই থাকছে। আলাউল অলি রকমারি গাছের চারা বিনামূল্যে বিতরণ করেন আত্মীয়স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে। একজন অলির একান্ত চেষ্টায় গড়ে ওঠা উদ্যান হতে পারে আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস।

লেখক : কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

writetomukul36@gmail.com

"