পর্যালোচনা

জনসংখ্যাভারে নিমজ্জিত পৃথিবী

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

অলোক আচার্য্য

প্রতি বছর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করা হয়। আমাদের এই বিশাল পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭০০ কোটি ছাড়িয়েছে। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা হবে ৯৮০ কোটি। বলা যায়, একটা বিশাল জনসংখ্যা নিয়ে ধরণী এগিয়ে চলেছে। আর এই জনসংখ্যার বোঝা ক্রমাগত হারে বেড়েই চলেছে। যদিও বিশ্বে এমন দেশও আছে, যেখানে জন্মহার এবং মৃত্যুহার সমান। অর্থাৎ জিরো পপুলেশন কান্ট্রি। তবে এর সংখ্যা হাতে গোনা। অন্য দেশগুলোয় কমবেশি বিভিন্ন হারে জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে। পৃথিবীর অন্যান্য মহাদেশের তুলনায় এশিয়া মহাদেশে জনসংখ্যার পরিমাণ বেশি। পাশের দেশ ভারত এবং চীনে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ বসবাস করে। বিভিন্ন মাধ্যমে পড়ে জানতে পেরেছি, ভারতের জনসংখ্যা খুব দ্রুতই চীনকে অতিক্রম করবে বা কাছাকাছি পৌঁছাবে। আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশও জনসংখ্যার অবস্থানগত দিক দিয়ে জনবহুল দেশের কাতারে অবস্থান করছে এবং ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী হিসেবে আমাদের তিলোত্তমা নগরী ঢাকার নাম কয়েকটি শহরের পরেই শোনা যায়। বহু দিন ধরেই এ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে যে, এ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে উন্নয়ন কার্যক্রম কতটা ফলপ্রসূ হবে। তাই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমিয়ে আনার পাশাপাশি জন্ম ও মৃত্যুহারে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ছোট দেশটিতে এখন জনস্রোতের প্রতিযোগিতা। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৪ সালে দেশে প্রথম আদমশুমারি বা জনগণনা করা হয়। সে সময় এ দেশে ৭.৬৪ কোটি মানুষ ছিল। এরপর ১৯৮১ সালে আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়। তারপর থেকে প্রতি দশ বছর পরপর আদমশুমারি করা হয়ে থাকে। ২০০১ সালের আদমশুমারি থেকে দেখা যায় এ দেশের জনসংখ্যা ১২.৯৩ কোটি। অর্থাৎ ১৯৭৪ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ২৭ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে ৫.২৮ কোটি। এ সময় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১.৪৮। ২০০৭ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, তখন জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ৬ লাখ এবং বৃদ্ধির হার ১.৪১ ভাগ।

ক্রমবর্ধমান এই জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার সুদূর অতীতে এত ছিল না। যেমন : ১৮৬০ সালে বাংলাদেশ ভূখ-ে জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২ কোটি। ১৯৪১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪.২০ কোটি। অর্থাৎ ৮০ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে মাত্র ২ কোটি। আবার ১৯৬১ সালে জনসংখ্যা ছিল ৫.৫২ কোটি এবং ১৯৯১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১.১৫ কোটিতে। এর মানে দাঁড়ায় এই ৩০ বছরেই বেড়েছে দ্বিগুণ। জনসংখ্যার বিচারে আমাদের দেশ অষ্টম স্থানে রয়েছে। তবে অষ্টম বা নবম যাই হোক, স্থানের তুলনায় আমাদের জনসংখ্যা যে অনেক বেশি এ নিয়ে দ্বিমত করার কিছু নেই। প্রতি বছর এ দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে ২৫ লাখ করে (কোথাও কোথাও ২০ লাখ বলা হয়েছে)। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী বিশ বা ত্রিশ বছরে আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ে নানা প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করতে হবে তাতে সন্দেহ নেই। কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে উন্নয়ন এবং জীবনমানের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। অর্থাৎ জনসংখ্যা এবং উন্নয়ন সম্পর্কিত একটি বিষয়। স্বাধীনতা পরপর এ দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। তারপর থেকে বেড়ে চলা জনসংখ্যার জন্য, তাদের স্থান সংকুলান করার জন্য একের পর এক আবাস গড়ে উঠেছে। যার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ফসলি জমি। যেখান থেকে আমাদের অন্নের ব্যবস্থা হয়। তার মানে হলো জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জমির পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। প্রতি বছরই এ জমির পরিমাণ কমছে। এর জন্য বনজঙ্গল কেটে সাফ করা হচ্ছে। উজাড় হচ্ছে বনভূমি। ভারসাম্য হারাচ্ছে প্রকৃতি।

ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর দিকে তাকালে চোখে পড়ে মানুষের অবস্থা। রাস্তা, ফুটপাত, অলিগলি পার্ক যে যেখানে যেভাবে পারছে মাথা গোঁজার চেষ্টা করছে। সবার একটু ঠাঁই চাই। বর্ধমান জনসংখ্যার পাশাপাশি গ্রাম থেকে শহরমুখী স্রোত বাড়ছে। ফলে গ্রাম এবং শহরে জনসংখ্যার হিসাবে ব্যাপক ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রভাব ফেলছে চাকরির বাজারে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ বেকারত্বের বোঝা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দিনের পর দিন চাকরির বাজারে ছোটাছুটি করে চাকরি না পেয়ে তাদের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে হতাশা। আর হতাশা থেকে তাদের কর্মশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। নেশায় আসক্ত হচ্ছে। মাদকাসক্ত একজন ব্যক্তি সমাজের জন্য এবং পরিবারের জন্য বোঝা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। জনসংখ্যা দেশের সম্পদ না বোঝা এ বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হয়ে আসছে। প্রতিটি মানুষই একেকটি সম্পদ। তার সামর্থ্য আছে এবং সে দেশের জন্য কিছু করতে পারে। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই সেই স্পৃহা আছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশ পায় না। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব প্রতিভা থাকে। তার স্বীয় যোগ্যতা থাকে। দরকার শুধু প্রকাশ করার উপযুক্ত পরিবেশ এবং সহযোগিতা। কোনো মানুষই অবহেলার নয়। তাকে দিয়ে, তার সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। কারণ হতাশায় ভুগতে থাকা একটি মানুষকে দিয়ে কিছু করানো যত কঠিন, ঠিক ততটাই সহজ একজন উৎফুল্ল মনের মানুষকে দিয়ে করানো। প্রতিটি হাত যেন দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে দেশে কারিগরি শিক্ষার দিকে আরো গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাই, সেখানে শিক্ষার হার শতভাগ বা কাছাকাছি। আমাদের দেশের জনগোষ্ঠীর বড় অংশই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। আবার অনেকেই প্রাথমিক থেকেই ঝরে পড়ছে। শিশু অবস্থাতেই জীবিকার প্রয়োজনে নিয়োজিত হচ্ছে হার ভাঙা খাটুনিতে। দেশের প্রতিটি নাগরিককে শিক্ষার আলোর নিচে আনতে হবে। গ্রামাঞ্চল, হাওর এলাকা, শহুরে বস্তিতে থাকা মানুষের মধ্যেই অনেকেই শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ অবশ্য দরিদ্রতা। দরিদ্রতা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। তবে এর থেকে মুক্তি পেতে গেলেও দরকার শিক্ষার।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি কাজের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি, আবাদি জমি রক্ষা, পুকুর ডোবা ভরাট থেকে বিরত থাকাসহ নানা পদক্ষেপ নিতে না পারলে সমাজে নানা প্রতিবন্ধকতা আসবে, যা আমাদের দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করবে। তাই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণই আজ সময়ের অন্যতম প্রধান দাবিতে পরিণত হয়েছে। কার্যক্রমকে সফল করতে হলে সবার মধ্যে চাই সচেতনতা। ১৫-১৬ কোটি মানুষের এই দেশে ইতোমধ্যেই জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত কারণে নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাল্যবিবাহ রোধ করা জরুরি। যদিও অনেক গ্রামাঞ্চলে এই বিষয়টি আশঙ্কাজনক হারেই হয়ে চলেছে। মাঝেমধ্যে পত্রপত্রিকায় এসব বিয়ে ঠেকানোর নানা খবর চোখে পড়লেও এর বড় অংশটিই আড়ালে থেকে যায়। প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সঠিক ধারণা সুদূর গ্রামপর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। কারণ কুসংস্কার এবং অজ্ঞানতা থেকে বের করতে না পারলে স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

"