আন্তর্জাতিক

অভিবাসী সংকটে বিভক্ত ইউরোপ

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

আমরা বিশ্বায়নের কথা বলি। আমরা মানবাধিকারের কথা বলি। আমরা প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার কথা বলি। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য রাষ্ট্র বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে তার জীবনের পথকে করে তোলে কণ্টকাকীর্ণ। ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশী নিমজ্জিত মানুষগুলো কিংবা সাগরতীরে পৌঁছা অসহায় মানুষগুলোর প্রতি যে আচরণ আমরা লক্ষ করছি, তাতে কোনো বিবেকবান মানুষ আতঙ্কিত ও মর্মাহত না হয়ে পারে না। অভিবাসনের বিষয়টি নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে সাময়িকভাবে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দীর্ঘমেয়াদে অভিবাসনের বিষয়টি থেকে যাচ্ছে উপেক্ষিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপ স্বল্পমূল্যে অভিবাসী শ্রমিকদের কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক মন্দাকে কাটিয়ে উঠেছিল। তবে ইউরোপে শ্রমিক অভিবাসনবিরোধী মনোভাব জোরদার হয় একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। ইউরোপে অভিবাসনবিরোধী পক্ষরা বলছেন, অভিবাসীরা পুরো ইউরোপজুড়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জনসংখ্যায় বেশ জোরেশোরেই প্রভাব ফেলছে এবং নির্বাচনী ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামকে পরিণত হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ইউরোপের চালিকাশক্তির চাবিকাঠি চলে যাবে অভিবাসীদের হাতে। ব্যাপকসংখ্যক অভিবাসী ইউরোপে প্রবেশ ও প্রবেশের চেষ্টা সেখানে ইতোমধ্যে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরেই ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ধারীদের’ স্বর্গরাজ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। গত ২০-৩০ বছরে হাজার হাজার শরণার্থী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে সেখানে বসবাস করে আসছেন এবং সেখানকার নাগরিকত্বও অর্জন করেছেন। ইউরোপের নাগরিকরা, বিশেষ করে জার্মানি কিংবা স্ক্যান্ডেনেভিয়ান রাষ্ট্রগুলো বরাবরই শরণার্থীদের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল ছিল। ফলে আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে এরা এসব দেশে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিলেন। ফলে এসব দেশ রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য একটি স্বর্গরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। মানব পাচারকারীরা এটিকেই ব্যবহার করেছিল এবং তারা এ সুযোগটি গ্রহণ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা থেকে মানব পাচারের উদ্যোগ নেয়। কয়েক মাস আগে আমরা ভারত মহাসাগরে অভিবাসন সংকটের যে চিত্রগুলো প্রত্যক্ষ করা যায়, তা আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। এক কথায় সেগুলোকে মানবিক বলা যায়। বাংলাদেশ, মিয়ানমারসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে দলে দলে মানুষ নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে অনেকের মৃত্যু হয়েছে। আবার মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পৌঁছার পরও জীবন দিতে হয়েছে অনেককে। এ অভিবাসন সংকটের মধ্যে এক ধরনের অমানবিকতা, এক ধরনের নিষ্ঠুরতা কাজ করেছে। এ দুটি দেশে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বেশ কিছু গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে, যা এ সংকটের তীব্রতা ও গভীরতা আমাদের সামনে তুলে ধরে। এটা সত্য, ইউরোপে এই অভিবাসী সমস্যা কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়। বরং সমস্যাটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশের। তাই এর সমাধান ইউরোপীয় ইউনিয়নকেই খুঁজে বের করতে হবে।

ইতোমধ্যে জার্মানির উদ্যোগে বলকান রাষ্ট্রগুলোর একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল অংশ নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাইÑকী করে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ করা যায়। কিন্তু ভিয়েনা সম্মেলনে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। জার্মানি চাচ্ছে ঐক্যবদ্ধভাবে ইইউর এ সমস্যা মোকাবিলা করতে। কিন্তু স্পষ্টতই ইইউর নেতাদের মধ্যে বিভক্তি আছে। অভিবাসন অতি প্রাচীন একটি বাস্তবতা। শত শত বছর ধরে মানুষ বিভিন্ন কারণে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে, এক রাষ্ট্র থেকে আরেক রাষ্ট্রে গমন করেছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছে, নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে, নতুন পরিচয় সৃষ্টি করেছেÑযে কারণে বর্তমান বিশ্বে প্রায় ২৫ কোটি অভিবাসী মানুষ বসবাস করছে। এ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অন্যতম গন্তব্য হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারপরই ইউরোপ, এমনকি মধ্যপ্রাচ্য। আমরা জানি, বহুকাল ধরে অনেক দেশকে অভিবাসী রাষ্ট্র হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তো বলেইছিলেন, আমেরিকার শক্তি হচ্ছে অভিবাসন। এ ধরনের একটি পটভূমি থাকা সত্ত্বেও মানুষ যখন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অন্য কোনো দেশ বা সমাজে ছুটে যেতে চায়, তখন তার প্রতি করা হচ্ছে অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ। এ মর্মান্তিক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এখন আমরা ভূমধ্যসাগরে প্রত্যক্ষ করছি একই ধরনের ঘটনা। হাজার হাজার বিপন্ন মানুষ নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে হাঙ্গেরির মধ্য দিয়ে জার্মানিসহ ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোয় প্রবেশ করছে বা প্রবেশের চেষ্টা করছে। এদের অধিকাংশই আসছে সিরিয়া থেকে। আফগানিস্তান, ইরাকসহ যেসব দেশে সংঘাত চলছে অথবা বিরাজ করছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সেসব দেশ থেকেও আসছে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা।

ইইউ যে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, তাও কোনো দিক থেকে দীর্ঘমেয়াদি মনে করার সুযোগ নেই। তাই ইইউর উচিত হবে একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসননীতি গ্রহণ করা। ইউরোপের উচিত হবে ভূমধ্যসাগরীয় মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে একটি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে অবৈধ মানব পাচারকে রোধ করা। ভূমধ্যসাগরীয় তথা বিভিন্ন সংকটে অভিবাসীরা যাতে মৌলিক এবং মানবিক অধিকার পেতে পারে এবং যথাসম্ভব তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে ‘মেয়ার নস্ট্রাম’-এর মতো অভিযানগুলোকে এবং জোটের সীমান্ত সংস্থা ফ্রনটেক্সকে আরো শক্তিশালী ও আধুনিক করতে হবে। চার, ইউরোপকে একটি আইনগত সর্বজনীন অভিবাসন রুট নির্ধারণ করতে হবে, যাতে অবৈধ উপায়ে অভিবাসীদের অনুপ্রবেশ রোধ করা যায়। পাঁচ, ইউরোপকে এমন একটি অভিবাসননীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা ইউএনএইচসিআর ও মানব নিরাপত্তা অ্যাপ্রোচের মূল বিষয়গুলোকে ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে ‘ডাবলিন সিস্টেম’-এর কাঠামোগত পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি (অভিবাসী ইউরোপের যে দেশে প্রথমে প্রবেশ করবে, সে দেশের শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হবে)। সম্প্রতি বিবিসির এক সমীক্ষায় বলা হয়, ইউরোপের সব দেশেরই জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। জনসংখ্যা স্থিতি রাখতে যেখানে প্রতি মহিলার ন্যূনতম গড়ে ২ দশমিক একজন সন্তান জন্মদান দরকার, সেখানে ইউরোপে গড়ে তা ১ দশমিক ৫ জন। এ ক্ষেত্রে আয়ারল্যান্ড ১ দশমিক ৯৯ নিয়ে তালিকার শীর্ষে আর ১ দশমিক ২৯ নিয়ে গ্রিস সর্বনিম্নে অবস্থান করছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা কমপক্ষে স্থিতি রাখার জন্য প্রচেষ্টার অন্ত নেই। কিন্তু বাস্তব কোনো পদক্ষেপই খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না বলে রাজনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বেশ চিন্তিত।

বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ব্যবস্থা কিংবা সরকার পরিবর্তন অথবা নিরাপত্তার নামে নানা পক্ষ-বিপক্ষ সৃষ্টি করে চরম সংকট সৃষ্টি করছে। এসব দেশের মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে পাড়ি জমাচ্ছে বিভিন্ন দেশে। এ পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমানে বিরাজমান অনিয়মিত অভিবাসন সংকটকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্বে মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ মানুষ ভোগ করছে ৮০ শতাংশ সম্পদ! এতেই বোঝা যায় পৃথিবীতে কী চরম বৈষম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করছে মানুষ। এ পরিস্থিতির সঙ্গেও অভিবাসন সংকটের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে মানুষ যখন তার নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধ জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিবাসী হিসেবে আশ্রয় পাওয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে, সেটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তার সমাধানে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার উদ্যোগ নেওয়াই সমীচীন। পাশাপাশি বিদ্যমান অভিবাসীদের প্রতি ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে যে ধরনের নেতিবাচক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হচ্ছে এবং রাজনীতির মূলধারায় অভিবাসনবিরোধী এজেন্ডা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, তা শুধু অনিয়মিত অভিবাসন সংকটকেই ত্বরান্বিত করছে না, যারা যুগ যুগ ধরে আত্মপরিচয় নিয়ে ওই সব দেশে বসবাস করছে, তাদের জীবনেও নেমে আসছে অস্থিরতা। কাজেই বিশ্ব অভিবাসন বিষয়টিকে ক্ষুদ্র জাতীয় স্বার্থে কিংবা তথাকথিত নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে বিবেচনা করা চলবে না। তাদের প্রতি মানবিক ও সংবেদনশীল হতে হবে। তা না হলে এটি সবার সমস্যা হিসেবে বারবার আবির্ভূত হয়ে বর্তমান সভ্যতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর স্ববিরোধী আচরণ পরিহার করা অতি জরুরি। কারণ মানুষের জীবন বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সংবেদনশীল ও সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।

লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com

"