পর্যালোচনা

বিশ্বকাপ ফুটবল ও বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

সফিউল্লাহ আনসারী

চলছে বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ-২০১৮। বিশ্বজুড়েই চলছে ফুটবল উন্মাদনা। পৃথিবীর সব দেশেই ফুটবল জ্বরে ভোগছে ফুটবলপ্রেমীরা। আমাদের বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের আনাচে-কানাচে, দোকান-পশারি, হাটবাজার, স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি, ঘরে-বাইরে সর্বত্রই বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনা। নিজের পছন্দের দলকে সাপোর্ট করে কেউবা বাজি ধরতেও দ্বিধা করছে না। সারা দেশে সমর্থকদের প্রিয় দলের পতাকায় ছেয়ে গেছে পাড়া-মহল্লা, সড়ক-মহাসড়ক, বাড়ির ছাদ এমনকি গাড়িতেও উড়ছে প্রিয় দলের পতাকা।

এ দেশের মানুষ ফুটবলপ্রেমী। বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ছাড়াও স্পেন, জার্মানি, ইতালি, ইংল্যান্ডের সমর্থকদের উন্মাদনা শহর-গ্রামে সমানতালে উৎসবের আমেজ ছড়িয়েছে। প্রিয় দলের পতাকা, জার্সি, আর পাড়া-মহল্লায় ছোটখাটো আয়োজনে চলছে জমজমাট ফুটবল প্রতিযোগিতাও। প্রিয় দলের খেলার তারিখে বিশাল প্যান্ডেলে বড় পর্দায় খেলা দেখার বিশাল আয়োজনে খাবার-দাবারের ব্যবস্থা চোখে পড়ার মতোই। সারা রাত জেগে খেলা দেখার উন্মাদনা ফুটবল ছাড়া যেন অসম্ভব। দেশজুড়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বাড়াবাড়িতে ঘটছে মারামারির মতো ঘটনা। অতিরিক্ত পাগলামীতে নিজের দল হেরে যাওয়ায় আত্মহত্যার ঘটনা আমরা পত্রিকায় পড়েছি। বিশ্বকাপকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠছে ফ্যান ক্লাব, সমর্থক গোষ্ঠী, যার ব্যানারে মোটর শোভাযাত্রাসহ নানা আয়োজন বাঙালির ফুটবল প্রেমেরই পরিচয় বহন করে।

অনেক এলাকায় নিজের বাড়ি, প্রতিষ্ঠান প্রিয় দলের সমর্থনে রং দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাড়াবাড়িতে অঘটন আমাদের আনন্দের সঙ্গে বেদনাকেও বাড়ায়। তবে চলতি বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে সবচেয়ে বেশি মাতামাতি ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। নিজের সমর্থিত দেশ ও দল এবং প্রিয় খেলোয়াড় নিয়ে বাগ্যুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ে ওসব দেশের খেলার চমকে দেওয়া বিভিন্ন তথ্য দিয়ে হেনস্তাসহ নানা ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতাও চলে। অথচ এসব কিছুই সমর্থনপ্রাপ্ত দেশ বা দেশের খেলোয়াড়রা জানেন না। আর মেসি-নেইমার কিংবা রোনালদোর তা জানার প্রশ্নই আসে না। অথচ এদের নিয়ে কতই না মাতামাতি! তবে এসবের পেছনে একটিই কারণ, বাঙালির ফুটবল নিয়ে পাগলামি। ফুটবলে পাগলামি থাকলেও মূলত ক্রিকেট তাদের অস্তিত্ব।

একসময় বাংলাদেশে জমজমাট খেলার আসর মানেই ছিল ফুটবল। কিন্তু সে অবস্থা এখন আর নেই। বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালীন সময়ে অবস্থার খানিকটা উত্তরণ ঘটলেও, খেলা শেষ হওয়ার পরপরই সে উন্মাদনা হ্রাস পায়। বরং ক্রিকেটের দাপটে ফুটবলের সে অবস্থা আর নেই বললেই চলে। শুধু শহর নয়, গ্রামগঞ্জের ছোট-বড় পাড়া-মহল্লায়ও আজ ক্রিকেট উন্মাদনা, অথচ একসময় ফুটবলই ছিল ওদের পায়ে পায়ে। এ বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় দেশেই ক্রিকেটের রাজত্ব। তবে গর্বের বিষয়, দক্ষিণ এশিয়া থেকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ। আরো গর্বের খবর, আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের মেয়েদের গৌরবদীপ্ত অর্জন।

আমাদের গ্রামীণ আয়োজনে ফুটবল খেলায় এখনো দর্শকের বিপুল সমারোহ আর অংশগ্রহণ লক্ষ করা যায়। ফুটবলমোদীদের পদচারণে ক্ষুদ্র আয়োজনও উচ্ছ্বাসে বাঁধ ভাঙে। বিশ্বকাপে বিপুল উৎসাহী দর্শক পাওয়া গেলেও, উল্টোদিকে দর্শক খরায় ভুগছে বাংলাদেশের ফুটবল। এমনটি প্রায়ই শোনা গেলেও দর্শক মাঠে টানতে উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না! ক্রিকেট খুব বেশি দিন হয়নি আমাদের দেশে মাঠ দখল করেছে, তারপর বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের নতুন পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করেছে এ খেলা। বাংলার দামাল ছেলেরা ফুটবলে খুব একটা নাম না করতে পারলেও ক্রিকেটে পেরেছে, এটা নিঃসন্দেহে গর্বের ও আনন্দের। ফুটবলের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্র পরির্বতন করে আজ ক্রিকেটে বেড়েছে ক্রীড়ামোদীর জোঁক। তাই বলে ফুটবলকে ভুলে থাকলে চলবে না। একসময় দেশের আনাচে-কানাচে দেখা যেত ছেলে-বুড়োর ফুটবল নিয়ে ব্যস্ততা। বর্ষা মৌসুম ছাড়া দেশে ফুটবল চর্চা নেই বললেই চলে। মনে হয় ফুটবল অনেকটা বাণিজ্যিক বা সরকারি উদ্যোগে শহরকেন্দ্রিক গ-িবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপক চর্চা না থাকায় ফুটবলের মান নষ্ট হচ্ছে বাংলাদেশের ক্লাবগুলোয়ও। যে কারণে ফুটবল মাঠে দর্শক উপস্থিতি কম। আজকে শুধু ক্রিকেট নয়, ফুটবল নিয়েও আমাদের ব্যাপক উদ্যোগী ও উৎসাহী হতে হবে। এ ছাড়া আমাদের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডুসহ অনেক খেলারই বেহাল দশা। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, স্থানীয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক উৎসাহ ও আয়োজনে অনীহা।

ফুটবল খেলা কোন দেশে কখন প্রথম চালু হয় সে সম্বন্ধে ঐতিহাসিকরা একমত নন। কেউ বলেন চীন, কেউ গ্রিস, কেউ রোম, কেউবা ইংল্যান্ডকে ফুটবল খেলার আবিষ্কারক মনে করে। তবে রোমানরাই ফুটবল খেলাকে ইউরোপের সঙ্গে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেয় এবং এ খেলার বিস্তৃৃতি ও জনপ্রিয়তা দান করে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ফুটবল ইংল্যান্ডে প্রবেশ করার পর থেকে এর প্রচার, প্রসার ও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ১৮৪৮ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রথম ফুটবলের জন্য আইন-কানুন প্রণয়ন করেন। পরবর্তীকালে এর আরো পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন ঘটে এবং ফুটবলের জন্য একটি পরিপূর্ণ নীতিমালা তৈরি হয়। তাই ইংল্যান্ডকে আধুনিক ফুটবলের জনক বলা হয়। তারাই ফুটবলকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয় এবং জনপ্রিয় করে তোলে। ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে পৃথিবীতে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়ে। ১৯০৪ সালের ২১ মে প্যারিসে ইউরোপের ৭টি দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল দ্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ফিফা) গঠিত হয়। ১৯৩০ সালে আয়োজন করা হয় বিশ্বকাপ ফুটবলের। উরুগুয়ে প্রথম বিশ্বকাপের শিরোপা জয় করে।

খেলাধুলা মানুষের শরীর ও মন দুটোকেই উজ্জীবিত রাখে, রাখে উৎফুল্ল। কিন্তু বর্তমানে মাঠনির্ভরতা কমে খেলা এখন গেম নামে মোবাইল, কম্পিউটার আর ইন্টারনেটে বন্দি হয়ে যাচ্ছে। যদিও আশা জাগিয়ে রাখছে ক্রিকেট। শুধু দেশের মাঠে নয়, বিদেশেও আমাদের টাইগাররা জয়ের ধারাবাহিকতায় বয়ে আনছে গর্ব করার মতো সুনাম। আমরা ফুটবলপাগল জাতি হিসেবে ক্রিকেটের সুনামের পাশাপাশি ফুটবল খেলায়ও বিশ্বের মধ্যে সুনাম বয়ে আনতে হবে। শুধু কথায় নয় কাজে প্রমাণ রেখে ফুটবলের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনা সময়ের অনিবার্য দাবি।

ক্রিকেটের পাশাপাশি সর্বসাধারণের প্রিয় খেলা, বিশ্বের জনপ্রিয় খেলা ফুটবলকেও বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের পাশাপাশি সামাজিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। শুধু বাফুফে নয়, ফুটবলকে উজ্জীবিত রাখতে আমাদের স্কুল-কলেজে সেই আগের মতো আয়োজন অব্যাহত রাখা দরকার। ফুটবলের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে আমাদের শুধু বিশ্বকাপ উন্মাদনায়ই নয়, বছরজুড়ে এ খেলার প্রতি টান, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা নিয়ে চেষ্টা চালাতে হবে। আমরা চাই বিশ্বকাপে ভিনদেশি দল আর খেলোয়াড় নয় আমাদের বাংলাদেশ ও আমাদের খেলোয়াড়দের নিয়ে আমরা মাতামাতি করব। আমার দেশে শুধুই পতাকা উড়বে লাল সবুজের, অন্য দেশের নয়। জয় হোক ফুটবলের, জয় হোক বাংলাদেশের।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

shofiullahansari@gmail.com

"