বিশ্লেষণ

পাহাড়ধসে মৃত্যু

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার সদর ও লামা উপজেলায় পাহাড়ধসে চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একই পরিবারের তিন সদস্য রয়েছেন। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা প্রতি বছরই ঘটছে। গত বছরের ১৩ জুন পাহাড়ধসে বান্দরবানে ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটে। এ বছরও মৃত্যুর অনাকাক্সিক্ষত হাতছানি এ পর্যন্ত বান্দরবানেই ১৫ জনের জীবন কেড়ে নিয়েছে। ১২ জুন জেলার নানিয়ারচরে পাহাড়ধসে ১১ জনের মৃত্যু হয়।

টানা বর্ষণে বান্দরবানের লামা উপজেলায় মঙ্গলবার পাহাড়ধসের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের কলাইয়াপাড়ায় মাঈনউদ্দিনের বসতঘরের ওপর পাহাড় ধসে পড়লে ঘটনাস্থলেই তার ছেলে হানিফ, হানিফের স্ত্রী রেজিয়া ও মেয়ে হানিফা প্রাণ হারান। পরিবারের অন্য সদস্যরা বাইরে থাকায় রক্ষা পান। এর দুই দিন আগে বান্দরবান শহরের কালাইঘাটা এলাকার বড়–য়াপাড়ায় পাহাড়ধসে প্রতিমা রানী দাস নামের এক গৃহবধূ প্রাণ হারান। পাহাড়ধসের ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে যারা বসবাস করছেন, তাদের নিরাপদ এলাকায় সরে যাওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

পাহাড়ধসে প্রতি বছরই বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে পার্বত্য এলাকায়। চলতি বছর পাহাড় কেটে যেখানে-সেখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করায় ধসের হুমকি বৃদ্ধি পেয়েছে। পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকা-ের কারণে। পার্বত্য এলাকায় পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি তৈরি ও পাহাড়ে গাছপালা নিধনের মচ্ছব চলছে বছরের পর বছর ধরে। স্বভাবতই প্রকৃতিও এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিচ্ছে। পাহাড়ের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ক্ষুণœ হওয়ার কারণেই ঘটছে পাহাড়ধসের একের পর এক ঘটনা। মানুষের প্রাণহানিও নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের ট্র্যাজেডি এড়াতে পাহাড় কাটা ও গাছপালা নিধন বন্ধে প্রশাসনকে শক্ত হতে হবে। পাহাড়ের ওপর, পাদদেশে এবং কোলঘেঁষে যারা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে, তাদের নিরাপদস্থানে সরিয়ে নিতে হবে। নির্মম হলেও সত্য, হতদরিদ্ররাই পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাস করতে বাধ্য হয়। তাদের অন্য কোথাও যাওয়ার উপায়ও দৃশ্যত নেই। যে কারণে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার উপদেশ দেওয়ার বদলে তাদের জন্য নিরাপদ বাসস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি পাহাড়ের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ক্ষুণœকারী সব ধরনের কর্মকা- কঠোরভাবে রোধ করতে হবে।

একটি লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, পাহাড় ধসে প্রাণহানি-ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে প্রশাসনের কিছু তৎপরতা দেখা গেলেও পাহাড়ধস ঠেকানোর ব্যাপারে কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই। শুধু প্রাকৃতিক কারণেই পাহাড়ধসে পড়ছে তা কিন্তু নয়। নিয়ন্ত্রণহীন পাহাড় কাটা, পাহাড়ে স্থাপনা নির্মাণসহ আরো কিছু অপরিণামদর্শী মনুষ্য তৎপরতার পরিণামে ধসে পড়ছে পাহাড়। বর্ষায় প্রাণহানি ছাড়াও পরিবেশ-প্রকৃতিতে এর ভয়ংকর বিরূপ প্রভাব নিয়ে কারো কোনো চিন্তা আছে বলে মনে হচ্ছে না।

পরিবেশবাদী সংস্থা বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের প্রায় ৭০ হাজার মানুষের জীবন পাহাড়ধসের কারণে হুমকির সম্মুখীন। সাউথ এশিয়া ডিজাস্টার রিপোর্ট ২০০৭-এ বলা হয়, সারা বিশ্বে যত

পাহাড়ধস হয়, তার সর্বাধিক ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ হয় দক্ষিণ এশিয়ায়। এরপর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ২৩.৯ শতাংশ ও পূর্ব এশিয়া ২২.৩ শতাংশ। ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের (ইউনেপে) আরেক তথ্য মতে, পাহাড়ধসসহ কতিপয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের সবচেয়ে ‘অরক্ষিত’ (ভালনারেবল) দেশটির নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা’ নামে চিহ্নিত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি বছর এসব দুর্যোগে এ দেশের কিছু নির্দিষ্ট অংশের মানুষের জীবন ল-ভ- হয়ে যায়।

নির্বিচারে পাহাড়-টিলা কাটা, বৃক্ষনিধন, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, মাইন বিস্ফোরণ প্রভৃতি কারণে মূলত পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। তবে সবচেয়ে বেশি হয় ভূমিদস্যুদের নির্বিচার ও অবৈধ পাহাড় কাটার ফলে, যা কিনা বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইনটির ৬-খ ধারায় পাহাড় কাটায় বাধানিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়া ‘ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করা যাবে না।’ অন্যথা তাকে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদন্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা অর্থদ- বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে হবে। পরিতাপের বিষয় হলো, ১৯৯৫ সালের মূল আইনে ওই বাধানিষেধ ছিল না। ১৫ বছর পর ২০১০ সালের সংশোধনীতে বিধানটি সংযুক্ত হয়।

পাহাড় কেটে চলছে প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রির রমরমা বাণিজ্য। দীর্ঘকাল ধরে পাহাড় কাটা, স্থাপনা নির্মাণ, পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা গাছপালা উজাড়ের ফলে পাহাড়ের অবশিষ্ট মাটি আলগা হয়ে যায়। যার ফলে বৃষ্টি হলে পাহাড়ের গা বেয়ে তীব্র বেগে নেমে আসা ঢল আলগা মাটি ধুয়ে নিয়ে নিচে নামতে থাকে। পাহাড় হয়ে পড়ে দুর্বল, জীর্ণশীর্ণ। ঘটে পাহাড়ধস। মারা যায় পাহাড়ের ঢালে বস্তিতে বাস করা নিম্ন আয়ের হতদরিদ্র, ছিন্নমূল মানুষ। শুধু বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের ঢালের বসতি উচ্ছেদের ব্যবস্থা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, পাহাড়ধস ঠেকানোরও উদ্যোগ নিতে হবে। বন্ধ করতে হবে পাহাড় কাটা, পাহাড়ের বৃক্ষ উজাড়, উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ।

লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই

"