মতামত

তীর্থভূমিতে জাতীয় মন্দির

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

ফনিন্দ্র সরকার

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ। বাসন্তী পূজার অষ্টমী তিথিতে ব্রহ্মপুত্র নদে হিন্দু ধর্মীয় অনুসারী-ভক্তরা পাপমোচনের লক্ষ্যে স্নানকার্যাদি সম্পাদন করেন। নির্দিষ্ট অষ্টমী তিথির ব্যপ্তিকালে স্নান সমাপনের রীতি চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার কোলঘেঁষে বন্দর থানার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদ মেঘনায় মিলিত হয়। ব্রহ্মপুত্র তিব্বতের মানস সরোবর থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের আসাম প্রদেশের ওপর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর প্রধান ধারাটি জামালপুর পশ্চিম প্রান্ত ঘেঁষে যমুনা নামে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। অন্য ধারাটি পুরনো ব্রহ্মপুত্র নামে ময়মনসিংহ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করে মেঘনায় মিলিত হয়। প্রাকৃতিকভাবে এ পরিচয় হলেও এর আধ্যাত্মিক একটা পরিচয় রয়েছে, যা এখন লাঙ্গলবন্দ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে মহাতীর্থে রূপান্তর হয়েছে।

সনাতন ধর্মের পৌরাণিক কাহিনির আলোকে লাঙ্গলবন্দের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণটি হচ্ছেÑঋষি জমদগ্নি ও রেনুকা দম্পতির ছোট ছেলে পরশুরাম অবতার হিসেবে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। নানা কারণে জমদগ্নি তার স্ত্রীকে সন্দেহ করেন। এ অবস্থায় ছেলেদের এমনকি তার একান্ত শিষ্য বিষ্ণু শর্মাকে স্ত্রী রেনুকা দেবীর হত্যার আদেশ দেন। এমন নিষ্ঠুর হত্যার আদেশ পালনে সবাই অস্বীকার করলেও ছোট ছেলে পরশুরাম পিতৃ আদেশ পালন করতে কুঠার আঘাতে দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে মাকে হত্যা করে। বাবার আদেশ পালনে মহাপুণ্যের কাজ হলেও মাতৃহত্যার অপরাধে মহাপাপের ফলে কুঠার লেগে থাকে হাতে। উল্লেখ্য, পরশুরাম মাকে হত্যা করে দারুণ বিচলিত হয়ে ওঠেন। বাবা তাকে সান্ত¦না দেন। অমরত্ব বরও দেন। পরশুরামের সন্তুষ্টির জন্য আরো বর দিতে চান জমদগ্নি। পরশুরাম তখন মায়ের প্রাণ ফিরে পাওয়ার বর দাবি করলে সেটিও দেন। সে বরে মা রেনুকা দেবী জীবিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু কুঠার তার হাতে লেগে থাকে। বাবা তাকে বিভিন্ন তীর্থ ভ্রমণের নির্দেশ দেন। পরশুরাম ভারতবর্ষের বিভিন্ন তীর্থস্থান পরিভ্রমণ করতে থাকেন। কিন্তু কুঠার হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। অবশেষে একদিন ব্রহ্মদেশে সংকট গিরির গুহায় প্রবেশ করেন। সেখানে ব্রহ্মকু-ের জলে অবগাহন করার সঙ্গে সঙ্গে কুঠার খসে যায় হাত থেকে। ব্রহ্মকু-ের পবিত্র জলের স্পর্শে কুঠার খসে গেলে তিনি পাপমুক্ত হন। পরশুরাম ভাবেন, ‘এটাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম তীর্থ’। কিন্তু এই তীর্থ লুক্কায়িত আছে গুহার ভেতর। এ রকম তীর্থ এভাবে লুক্কায়িত থাকলে পৃথিবীর পাপী মানুষ মুক্তির উপায় খুঁজে পাবে না। তিনি আবদ্ধ জলরাশিকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ব্রহ্মকু-কে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে মহাভাগ, বলো তুমি কে? এখানে আবদ্ধ কেন? ব্রহ্মকু- বলেন, ‘আমি ব্রহ্মার নন্দন আমি ব্রহ্মপুত্র। অভিশাপে নদরূপে আটকে আছি পর্বতের পাষাণ পাত্রে। এই পাত্র বিদীর্ণ করে বের হতে পারছি না।’ পরশুরাম কুঠার আঘাতে পর্বতগাত্র বিদীর্ণ করে ব্রহ্মপুত্রকে ব্রহ্মকু- থেকে মুক্তি দিলেন। জলাধার সৃষ্টি হলো। পরশুরাম ভাবলেন পর্বতগিরি থেকে এই পবিত্র জলধারাকে সমতল ভূমিতে নিয়ে আসা উচিত। তিনি কৃষকের লাঙ্গল সংগ্রহ করেন। সমতল ভূমিতে লাঙলের ফলায় মাটি ভেদ করে ব্রহ্মপুত্রকে নিয়ে আসতে থাকেন। এভাবে লাঙ্গল চষতে চষতে ক্লান্ত হয়ে লাঙ্গল চাষা বন্ধ করেন এক জায়গায়। সেই জায়গাটি নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁ উপজেলা ও বন্দর থানার সীমান্তে। সেই থেকেই নামকরণ হয় লাঙ্গলবন্দ। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে প্রতিষ্ঠিত হয় মহাতীর্থ। ব্রহ্মপুত্রের এই জল হয়ে উঠে মহাপবিত্র বস্তু। কার্যত ব্রহ্মপুত্রকে ঘিরেই লাঙ্গলবন্দ মহাতীর্থের খ্যাতি অর্জন করে বিশ্বজুড়ে। ধর্ম হচ্ছে আধ্যাত্মিক বিষয়। মানুষের মনের একান্ত বিশ্বাসের জায়গা থেকেই ধর্মের মূল চেতনার বিস্মরণ ঘটে।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র সবিচালয় থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে লাঙ্গলবন্দের অবস্থান। ব্রহ্মপুত্র নদের সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকা নিয়ে লাঙ্গলবন্দের তীর্থ ক্ষেত্রটির অবস্থান। নদের পশ্চিম পারে অনেকগুলো মন্দির রয়েছে। তীর্থস্থানের এই সাড়ে তিন কিলোমিটার জমি একসময় সাতজন জমিদারের মালিকানাধীন ছিল। লাঙ্গলবন্দের উত্তর প্রান্তে রয়েছে ললিত সাধুর মন্দির, দক্ষিণে চৌধুরীপাড়ার কালীমন্দিরের গোসাই বাড়ির কালীমন্দির। স্বামী দ্বিগবিজয় ব্রহ্মচারীর আশ্রম, যা প্রেমতলা নামে পরিচিত। রয়েছে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মন্দির, রক্ষাকালী মন্দির, জয়কালী মন্দির, অন্নপূন্যা মন্দির, পাষাণ কালীমন্দির, শ্মশান কালীমন্দির। রয়েছে প্রায় চৌদ্দটি ঘাট। পুণ্যার্থীরা এসব ঘাটে স্নান করেন। লাঙ্গলবন্দের যে ব্রহ্মপুত্র এটি আদি ব্রহ্মপুত্র। একসময় এই ব্রহ্মপুত্র বিশাল প্রমত্ত স্রোতধারার মহানদ হিসেবে খ্যাত ছিল। প্রাকৃতিক নানা বিপর্যয় সেই সঙ্গে মানুষের বীভৎস আচরণে এর রূপ বদলে যেতে যেতে একটি ক্ষদ্রাকৃতি নদে রূপান্তর হয়েছে। নদের অবস্থা যাই থাক, মহাতীর্থের ভাবগাম্ভীর্য এবং এর মহিমা অক্ষুণœ রয়েছে। ধর্মীয় ঐতিহ্যের গৌরবও অটুট রয়েছে। অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের এক অনন্য সাক্ষী হিসেবে লাঙ্গলবন্দ গৌরবের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।

পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে মুক্তি অর্জন করে ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের গৌরব অর্জন করেছি। মুক্তিযুদ্ধে সব সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। আমাদের মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসাম্প্রদায়িক চেতনায় পুরো বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর নামের জাদুতেই অভিন্ন দৃষ্টিতে দেশটি স্বাধীন হয়। সেই প্রিয় বাংলাদেশ সবার। ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবারÑএই নীতিতে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। গত ২৫ মার্চ মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ গিয়েছিলাম। ভক্তবৃন্দের পদচারণে মুখরিত ছিল দুদিন। অষ্টমীর তিথির ব্যপ্তি ছিল প্রায় দুদিন। দুদিনব্যাপী পুণ্যস্নানের দৃশ্যটি মনে রাখার মতো। সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মেলাঙ্গনে নানা রঙের দোকান পশরায় কেনাকাটার ধুমধামও চোখে পড়ার মতো। প্রতি বছরের মতো স্নান উৎসব কমিটির আলোচনা চলছিল দীর্ঘ সময়। আলোচনা সভায় স্নান উৎসবের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন বিভিন্ন বক্তা। পুণ্যার্থীদের সুবিধা-অসুবিধা নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের নেতা বাবু পরিতোষ কান্তি সাহা লাঙ্গলবন্দে একটি জাতীয় মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন। জানা গেছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লাঙ্গলবন্দ সংস্কারের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন।

লাঙ্গলবন্দে জাতীয় মন্দির প্রতিষ্ঠার যে দাবি উঠেছে, তার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। বাংলাদেশে একটি জাতীয় মসজিদ রয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মন্দির থাকলেও কোনো জাতীয় মন্দির নেই। বিভিন্ন মন্দির নানাভাবে নানা চক্র দ্বারা আবৃত। একটা জাতীয় মন্দির প্রতিষ্ঠিত হলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হতো সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। জাতীয় মন্দিরটি থাকত সেন্ট্রাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে। ঢাকায় ঢাকেশ্বরী কালীমন্দির বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান মন্দির হলেও জাতীয় মন্দির নয়। ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে ঘিরে কেন্দ্রীয় পূজা উদ্যাপন পরিষদ গঠিত হয়েছে। সারা দেশের পূজা পরিষদ আছে। জেলা ও থানায় পূজা পরিষদের নেতারা স্থানীয়ভাবে পূজা অর্চনার শৃঙ্খলা বিধানে ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন জেলার পূজা উদ্যাপন পরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে কেন্দ্রীয় পূজা পরিষদ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের কেন্দ্রীয় পূজা পরিষদের নেতারা কেবল নেতৃত্ব দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন সর্বক্ষণ। আজ যখন লাঙ্গলবন্দে জাতীয় মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে, এ দাবির সমর্থনে কেন্দ্রীয় পূজা পরিষদের নেতারা থেকেছেন নিশ্চুপ। এর মূল কারণ হচ্ছে, জাতীয় মন্দির প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের খবরদারি থাকবে না। বিষয়গুলো সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। এদিকে পূজা পরিষদের যে সংগঠনটি আছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো গঠনতন্ত্রও নেই। রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নেতৃত্বের আসন দখল করে আসছে দীর্ঘদিন। আজ দখল প্রক্রিয়া থেকে সরে এসে সবাইকে লাঙ্গলবন্দ জাতীয় মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবিকে সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধ হওয়া খুবই জরুরি। সম্প্রতি তার ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে। মন্দিরের জায়গা বেদখল হয়ে যাচ্ছে, শ্মশানের জায়গা বেদখল হচ্ছে। মন্দির শ্মশানকে কেন্দ্র করে কারো কারো ব্যক্তি সম্পত্তি বেহাত হচ্ছে। কতিপয় হিন্দু নেতার যোগসাজশে মন্দিরের পাশে হিন্দু সম্পত্তি থাকলে তা মন্দিরের সম্পত্তি হিসেবে প্রথমে দখল নেওয়া হয় পরে দুষ্ট চক্রের ফাঁদে তা বেহাত হয় এবং মন্দিরের অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যায়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ লক্ষ্মী নারায়ণ আখরার প্রায় ১৬০ শতাংশ জায়গা, যা জিওস পুকুর নামে খ্যাত ছিল, তা বেদখল হয়ে গেছে। দেবত্তোর সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও কুচক্রীরা ব্যক্তি মালিকানার সম্পত্তি দেখিয়ে বেহাত করেছে। একসময় স্বচ্ছ জলধারার একটি দিঘি হিসেবে জিউস পুকুরের পরিচিত ছিল। ময়লা-আবর্জনা ফেলে দিঘির জল নষ্ট করা হয়েছে। এখন পুকুরটি ভরাট প্রক্রিয়া চলছে। ব্যক্তি মালিকানার পুকুরের জল নষ্ট করার নৈতিক অধিকার না থাকলেও, সেটি করা হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই দেশে এমন অবস্থা কারো কাম্য হতে পারে না। নারায়ণগঞ্জের পাগলায়, পাগলনাথের একটি মন্দির আছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের প্রধান সড়কের পাশে বিশাল একটি মার্কেট আছে, যে মার্কেটের মালিকানা সম্পূর্ণ ওই মন্দিরের। মার্কেট থেকে বড় অঙ্কের টাকা ভাড়া বাবদ উত্তোলন হলেও তার যথাযথ হিসাব নেই। এসব বিভাজন মন্দিরকেন্দ্রিক নেতৃত্বের কোন্দল কোনো কিছুই থাকত না, যদি একটি জাতীয় মন্দির প্রতিষ্ঠা করা যেত। জাতীয় মন্দির প্রতিষ্ঠিত হলে সারা দেশে মন্দিরের জায়গা কেউ দখল করার সাহস পেত না। লাঙ্গলবন্দে জাতীয় মন্দিরের দাবিকে আরো জোরালো করে আদায়ের ব্যবস্থা করাই হিন্দু নেতাদের প্রধান দায়িত্ব।

লেখক : বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

phani.sarker@gmail.com

"