পর্যালোচনা

শিক্ষকদের জন্য বিসিএস

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

শরীফুর রহমান

বাংলাদশে সবচেয়ে বৃহত্তম পেশা হলো শিক্ষকতা পেশা। যাকে সবচেয়ে সম্মানজনক পেশা হিসেবেও মনে করা হয়। কিন্তু শিক্ষা নিয়ে সরকারের স্বচ্ছ বা নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা না থাকায় এ পেশাাটি সর্ববৃহৎ ও খামখেয়ালি পেশায় রূপান্তরিত হয়েছে। তবে, তাদের বেতন-ভাতায় অসংগতি থাকায় তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত। এখানে কেউ সরকারি তথা, বিসিএস দিয়ে নিয়োগ পাওয়া, কেউ আবার, এমপিওভুক্ত, কেউ নন-এমপিও, এমপিও হওয়ার আশায় প্রহর গুনছে, আবার কেউ কেউ বিভিন্ন ব্যক্তি কিংবা সংস্থা, কোম্পানি, ট্রাস্ট, কিংবা প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন সংগঠনের উৎপত্তি হয়েছে আর এসব সংগঠন সরকারের কাছে একেক সময় একেক দাবি নিয়ে হাজির হচ্ছে। সম্প্রতিও বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের বিভিন্ন দাবিনামা নিয়ে রাজপথে বিক্ষোভ-সমাবেশ, অনশন, ঘেরাও কর্মসূচি লক্ষ করা গেছে। তাদের একটি সংগঠন চাচ্ছেÑসদ্য আত্তীকরণ হওয়া কলেজগুলোর শিক্ষকরা ক্যাডারভুক্ত হোক। আবার বিসিএস শিক্ষা সমিতির পক্ষ থেকে সেøাগান জারি করা হয়েছে, নো-বিসিএস, নো-ক্যাডার! অর্থাৎ তারা বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে আত্তীকৃত কলেজশিক্ষকদের তাদের সমপর্যায়ে নিতে চায় না। আরেকটি গ্রুপ চাচ্ছে, বিদ্যমান সব এমপিওভুক্ত কলেজকে জাতীয়করণ করা হোক। আরেকটি গ্রুপ চাচ্ছে, নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্ত করা হোক। ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষক সংগঠনগুলো চাচ্ছে, তাদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলের মতো সব সুযোগ-সুবিধা দিক। আবার অনার্স-মাস্টার্স পাঠদানকারী সব শিক্ষকই বর্তমানে নন-এমপিও, তাই তারা চাচ্ছেন তাদের সব শিক্ষককে এমপিওভুক্তের আওতায় নিয়ে আসা হোক। সর্বশেষ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষকরা কলেজেই যেতে পারেন না। অন্য শিক্ষকরা তাদের শিক্ষক হিসেবে মনে করেন না বলে অর্থাৎ তাদের প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকার থেকে কোনো ভাতা না পাওয়ায় তারাও সরকারের কাছে এর প্রতিকার চান।

এখান থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় কী ধরনের অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা কিংবা অরাজকতা বিরাজ করছে। এই বিশৃঙ্খল কিংবা অস্থিতিশীল পরিবেশের মূলে রয়েছে আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা। মূলত, সরকারের শিক্ষা নিয়ে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় বিষয়টি আজকের পর্যায়ে এসে গেছে। সরকার তার দেশের নাগরিকদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করবে এবং সরকারই শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন পলিসি তার মতো করে বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু ব্যক্তি তার মান ও সুনামের জন্য বা রাজনৈতিক কারণে কিংবা শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করার নিমিত্তে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যাপকহারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়ার সময় সরকারি যে বিধি রয়েছে, তা আমলে নেওয়া হয়নি। একবারে হলফ করেই বলতে পারি, সরকারি নীতিমালা মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়া হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আজকের সংখ্যার চেয়ে অর্ধেক থাকত, এমনিক সরকারের আর্থিক জোগান অর্ধেকের চেয়ে কমে আসত। একই সঙ্গে শিক্ষা নিয়ে যে অব্যবস্থাপনা কিংবা অরাজকতা আজকের বাংলাদেশে বিদ্যমান, তা কখনোই সৃষ্টি হতো না। এই অস্থিতিশীল পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন করে। সেখানে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল গঠন করার প্রস্তাবনা দিয়ে এ অস্থিতিশীল পরিবেশের সাময়িক সমাধানের চেষ্টা করা হয় কিন্তু বিসিএস ক্যাডারদের আপত্তিতে এটা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। তাদের যুক্তি বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা সরকারি চাকরিজীবীদের মতোই যখন যে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে, তখন সেই আলোকে তারাও তা গ্রহণ করবে। এখানে শিক্ষকদের পৃথক বেতন স্কেল করা হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে বিসিএস শিক্ষকরা একীভূত হতে চায় না। সরকার পরে শিক্ষার মান উন্নয়নে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কম খরচে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগের লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সরকারি স্কুল ও কলেজ জাতীয়করণের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এতে প্রায় ২৮৫টি কলেজকে জাতীয়করণের জন্য মনোনীতও করা হয় এবং নিয়ম অনুসারে জাতীয়কৃত এসব শিক্ষক শিক্ষা ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা কিন্তু সরকারি এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার সমিতি। তাদের দাবি, দেশে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি কলেজ রয়েছে কিন্তু সরকার ঘোষিত ২৮৫টি কলেজকে জাতীয়করণ করা হলে তাতে শুধু ৫-৭ শতাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থী উপকৃত হবেন। আর শুধু ৫-৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে এলে কী ধরনের ফল আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সর্বমহলে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকার জাতীয়করণের জন্য যে তালিকা প্রণয়ন করেছেন তা নিয়ে, কোনো নীতিমালা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো যোগ্যতা ছাড়াই কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় কলেজগুলোকে জাতীয়করণের জন্য মনোনীত করায় তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগÑএকই যোগ্যতায়, একই মানদ-ে প্রত্যেক কলেজগুলোয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও কেন শুধু উপজেলা সদরে অবস্থানের কারণে এসব কলেজ জাতীয়করণ করা হচ্ছে? এর দ্বারা কী সমতা, ন্যায্যতা কিংবা নৈতিকতার ন্যায্যতার বিরুদ্ধে অবস্থান হলো না? এমন তো রয়েছে, যেসব কলেজকে জাতীয়করণ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশ শিক্ষক ক্যাডার কিংবা নন-ক্যাডার হওয়ার ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। তবে তাদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিবে সরকার? অন্যভাবে বলা চলে, জাতীযকরণের জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া এসব কলেজের শিক্ষকদের চেয়ে অন্য কলেজের শিক্ষকদের পারদর্শিতা কিংবা যোগ্যতা আরো বেশি আছে। তবে কেন এসব যোগ্য শিক্ষককে অবমূল্যায়ন করে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা হবে?

বিসিএস শিক্ষক সমিতি ইতোমধ্যে নো-বিসিএস, নো-ক্যাডার সেøাগান ধরেছে, তাদের এ সেøাগান একেবারে অযৌক্তিক তা নয়। বরং মর্যাদার স্বার্থে তাদের সেই সেøাগান অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। সরকার নীতিমালা ছাড়া কেবল উপজেলা সদরের অবস্থানকে চিহ্নিত করে জাতীয়করণের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে অযোগ্য শিক্ষকরা বিসিএস শিক্ষা সমিতিতে ঢুকে পড়লে পরে বিভিন্ন অপেশাদারি ও বিব্রতকর কার্যক্রম চোখে পড়তে পারে। তাই বিসিএস শিক্ষা সমিতি তাদের ক্যাডারভুক্ত না করে নন-ক্যাডার হিসেবে ঘোষণা করার জোর দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, আত্তীকৃত কলেজগুলোয় বিসিএসের মাধ্যমে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কথা সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আবার এসব জাতীয়কৃত কলেজগুলোর শিক্ষকরা বদলির সুযোগ পাবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সুতারং, দেখা গেল, শুধু জাতীয়করণ বিষয়টি নিয়েই চারটি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এক, বিসিএস শিক্ষা সমিতির সেøাগান। দুই, আত্তীকৃত শিক্ষকরা ক্যাডারভুক্ত হওয়ার বিভিন্ন যুক্তি। তিন, একই প্রতিষ্ঠানে বদলির সুযোগ পাওয়া না পাওয়ার বৈষম্য, ক্যাডার, নন-ক্যাডার সমস্যা। চার, জাতীয়করণের জন্য মনোনীত না হওয়া দেশের ৯৫ শতাংশ শিক্ষকদের দাবি সমগ্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের আন্দোলন।

উপরোক্ত চারটি সমস্যা সমাধানের জন্য একটি বিসিএস-ই যথেষ্ট। যার নাম হতে পারে বিসিএস ফর একজিসটেন্স টিচার! অর্থাৎ বিদ্যমান শিক্ষকদের জন্য বিসিএস। ফলে সবাইকে একই বৃত্তে এনে সমতা সৃষ্টি করতে, জাতীয়করণ নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ লাগবেÑএমনকি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আন্দোলন প্রশমিত করতে সর্বোপরি, নো-বিসিএস, নো-ক্যাডার সেøাগানকে জয় করতে হলে দেশের বিভিন্ন কলেজে কর্মরত শিক্ষকদের নিয়ে একটি বিসিএসের আয়োজন করলে উপরোক্ত সব সংকট দূর করা সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে একধাপ এগিয়ে যাবে। যার রূপরেখাটা হবে জাতীয়করণের অপেক্ষায় থাকায় ২৮৩টি কলেজসহ আরো ২০-২৫টি কলেজকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে এসে সেসব কলেজের মোট বিষয় ও পদসংখ্যা নির্ধারণ করে দেশের এমপিওভুক্ত নন-এমপিওভুক্ত সব কর্মরত শিক্ষককে বিসিএসে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া। একই সঙ্গে নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হওয়ার ২-৩ বছর পর যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা অনুসারে সহকারী, সহযোগী অধ্যাপক প্রভৃতিতে সরকারি বিদ্যমান নিয়ম অনুসারে পদোন্নতি দেওয়া যেতে পারে। এর ফলে দেশের সরকারি সব কলেজের জন্য একই নীতিমালা প্রণীত হওয়ার সুযোগ পাবে। তবে যারা এই বিসিএসে আসার যোগ্যতা অর্জন পারবে না, তারা বর্তমানে তাদের অবস্থানে বহাল থাকবে, তবে শিক্ষক এমপিওভুক্ত হলে নিয়মে তাদের কর্মজীবন অতিবাহিত করবে। সে ক্ষেত্রে কারো কোনো ক্ষোভ থাকবে বলে মনে হয় না।

লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও বিশ্লেষক

adil_jnu@yahoo.com

"